ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

পরীক্ষার দিন বৃষ্টি হচ্ছিল। অনেক বাবা-মা ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে। জানতাম ভিড় হবে, জ্যাম লাগবে। তাই সময়ের অনেক আগেই বাসা থেকে বের হয়েছি। এক্সাম সেন্টারে পৌঁছেছিও অনেক আগে। কিন্তু আমাদের আগেই আরও অনেকে এসে পড়েছে। গেটের বাইরে বড় বোনের সাথে ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ধীরে ধীরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছিল। বৃষ্টির জন্য সময়ের আগেই গেট থেকে সবাইকে এক এক করে ঢোকার সুযোগ দিচ্ছিল। আব্বু-আম্মুর সাথে ফোনে কথা বলে ঢুকে পড়লাম ভেতরে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানতাম সিট দোতালায় পড়েছে। কত নাম্বার রুম তাও জানতাম। জানতাম অপেক্ষা করতে হবে। তাই রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়ছিলাম আর পরিচিত কোন মুখ দেখব তার ক্ষীণ আশা নিয়ে অন্যদের ঢোকার দৃশ্য দেখছিলাম। এক দুই জন আসলো, তারা আমাকে চেনে। একই কোচিং এ ক্লাস করেছি আমরা। তারও বেশ খানিকক্ষণ পর পরিচিত মুখ দেখলাম। একসাথে ক্লাসও করেছি ভর্তি পরীক্ষার আগে।

পরীক্ষার আগে স্বাভাবিক কুশল চলে না। পরীক্ষার কথার সাথে অন্য কথাও শুনলাম কিন্তু বিশ্বাস করলাম না।

পরীক্ষা দিলাম। সম্পূর্ণ পরীক্ষার সময় ওই খবর আমাকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াল। ইনভিজিলেটর আগেই সাবধান করে দিয়েছেন কোনও ডিভাইস সঙ্গে রাখা যাবে না। কান খোলা রাখতে হবে। ভুল করলে নতুন কোনও উত্তরপত্র দেয়া যাবে না, দেখাদেখি করা যাবে না।

ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়া যাবে না এমন কোনও কথা ইনভিজিলেটর বলেননি। ভর্তি নির্দেশিকার কোনও অংশে এরকম কথা কোন কথা অবশ্য ছিল না। আমি আশাও করিনি। আমি এটাও আশা করিনি যে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয় যাবার পরেও নতুন করে পরীক্ষা নেয়া হবে। নতুন পরীক্ষা হবে, নতুন প্রশ্নপত্র হবে আবার নতুন করে প্রশ্ন ফাঁস হবে। আবার পরীক্ষা হলে আবার এই চক্র চলবে। এত ঝামেলার দরকার কি? তারচেয়ে ফাঁস করা প্রশ্নেই পরীক্ষা হোক।

ভর্তি পরীক্ষার দিন বিকাল পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁসের খবর আমি বিশ্বাস করিনি। ফেক নিউজের যুগে সব কথা বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু যখন বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করা শুরু করেছিল তখন আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর বার বার প্রার্থনা করেছি যাতে নতুন করে আবার এই পরীক্ষা নেয়া হয়।

আমি ফি বছর ভর্তি পরীক্ষা দেই না বলে প্রতি বছর আমার এই রকম প্রার্থনা করার সময়, সুযোগ ও চিন্তা-ভাবনা করার কোন দরকার ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাকে এর আগেও একই রকম প্রার্থনা ও উদ্বিগ্নতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।

আমার বয়স যখন ১০ ঠিক সেই সময়েই সারা বাংলাদেশে পঞ্চম শ্রেণিতে সবার সমাপনী পরীক্ষাতে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়। বছরের শুরুর বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন হঠাৎ বছরের মাঝামাঝি আসতে না আসতেই পরিণত হল পরীক্ষার মহাযুদ্ধে। ছয়টি বিষয়ের পরীক্ষা তিন দিনের ভিতরে নেয়া হবে। পরীক্ষার আগে থেকেই শিক্ষা-পদ্ধতি পরিবর্তন হবে এমন খবর সবার মুখে মুখে। এই একটা পরীক্ষার পরেই নতুন শিক্ষা-পদ্ধতি আসবে। আমাদেরকে নতুন পদ্ধতিতে সবকিছু শেখান হবে, এই খবর শুনে আনন্দ কোথায় রাখব?

আমাদের পাঞ্জেরী, ক্যাপ্টেন, শিওর সাকসেস, ক্লাস ওয়ান এইসব গাইড ঘেঁটে কোথায় বড় আর সুন্দর ভাষায় প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর লেখা আছে তা মুখস্থ করে লিখতে হবে না। বাংলা কবিতার দশ-বিশ লাইন দাঁড়ি-কমাসহ মুখস্থ করে লিখতে হবে না। কবিতা গুলোর প্রতিটা লাইনের ব্যাখ্যা মুখস্থ করতে হবে না। শূন্যস্থান পূরণে বই থেকে সরাসরি শব্দ না লিখলেও স্যার-ম্যাডামরা কেটে দেবে না। এসব ভেবে মনে হয়েছিল এরচেয়ে বেশি আর কিছুই চাই না।

সমাপনী পরীক্ষার পরের দিন সব কয়টি প্রথম-সারির খবরের কাগজে এই পরীক্ষার খবর ছাপা হল। প্রায় নয় বছর পরে ওই পত্রিকাগুলোর সরাসরি খবর মনে নেই কিন্তু মনে আছে তাদের প্রকাশিত খবরের টুকরো টুকরো অংশ। “ছোটদের এস,এস,সি”। “শিক্ষাব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন”। আগের বৃত্তি পরীক্ষায় শুধু মেধাবীরা অংশ নিত ফলে “ছোট বয়সেই একটা বিভাজন তৈরি হত” কিন্তু এখন সমাপনী পরীক্ষার ফলে ‘সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত হল’।

কিন্তু কেউ দেখল না সমাপনী পরীক্ষার ফলে ১ম, ২য়, ৩য় ডিভিশন ঠিকই তৈরি হয়ে গেল। ১৭ লাখ শিক্ষার্থীর একাংশ প্রথম সারির ছাত্র আর বাকিরা ২য় বা ৩য়। এর চেয়ে বড় প্রহসন কোথাও হয়েছে কিনা কে জানে। এর পরপরই ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরিচয় সৃজনশীলের সাথে। এরপর তিন বছর পার হতে না হতেই নতুন করে জেএসসি পরীক্ষা। কিন্তু ততদিনে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীর পানি অনেক গড়িয়ে গেছে।

২০১৪ সালের এইচএসসি এরপর কোন পরীক্ষাই আর পরীক্ষা থাকলো না। প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস পরীক্ষাগুলোকে ছেলেখেলায় পরিণত করল। আগেও প্রশ্ন ফাঁস হত। জানতাম। কিন্তু এই প্রথমবার নিজের চোখের সামনে সবাইকে নির্লজ্জের মতো প্রশ্ন পেয়ে পরীক্ষা দিতে দেখলাম। দেখলাম পরীক্ষার্থীদের রাত জেগে ফেসবুক গ্রুপ থেকে প্রশ্ন সলভ করে পরীক্ষা দেয়া।

দুঃস্বপ্নের বছর ছিল ২০১৪। এসএসসি বাদে এইচএসসি, জেএসসি, আর পিইসি পরীক্ষারও প্রশ্ন ফাঁসের খবর এলো সেবার। হইচই হল। আশ্বাস এলো। কোথা থেকে জানি প্রশ্ন ফাঁসের লাগাম টেনে ধরা হল। কিন্তু পরীক্ষার আগেই পেয়ে যাওয়া প্রশ্নের প্রলোভন থামল না।

পরীক্ষার সময় এলেই প্রশ্ন ফাঁসের রব যেভাবে উঠে আবার সেই ভাবেই মিইয়ে যায়। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস আবারো পুরাতন দানবটাকে জাগিয়ে তুলল।

ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়া স্ক্রিনশট যাদের ছিল তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা আমি জানি না। কিন্তু এই ঘটনার পরে সবাই আগের থেকেও সিরিয়াস হয়ে পড়ল। এরপর ২০১৬ গেল। কলঙ্কমুক্ত ভাবে মোটেও যায়নি এই বছর। ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম শেষ হয়ে গেল। কিন্তু খবরের কাগজের কোনা, মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল এইবারও নাকি প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭ সাল। চ্যানেল ২৪ এর সৌজন্যে আমরা সবাই দেখেছি কি হয়েছে এই বছর।

যে বছরে সবচেয়ে বেশি কাড়াকাড়ি আরোপ করা হয়েছে সেই বছরই যদি এতো সংখ্যায় পরীক্ষার্থী প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় তাহলে এর আগের বছর গুলোর কোথা চিন্তা করলে তো গাঁ শিউরে ওঠে। টেলিভিশনের পর্দায় আমরা দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পূর্বের কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি। দেখেছি কিভাবে প্রশ্নফাসকারী সিন্ডিকেট তাদের ব্যবসা চালায়। দেখেছি যারা প্রশ্ন বেচাকেনার সাথে জড়িত তারা সাধারণ ছাত্র। তারা কেউ প্রশ্ন ফাঁস করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে নয়তো মেধার জোরে উচ্চশিক্ষার স্তরে ঢুকে এই জগতে পদার্পণ করেছে।

টেলিভিশনের পর্দায় যখন এই ক্ষণজন্মা কারিগরদের দেখছিলাম একটা বিষয় প্রথমে আমাকে খুবই অবাক করে। সাধারণ সাংবাদিকতার নিয়মের লঙ্ঘন করে যখন প্রশ্ন ফাঁস কারিগরদের মুখের ছবি সরাসরি প্রকাশ করে দেয়া হয়েছিল, তখন আমি অবাক হয়েছিলাম।

কিন্তু পরিবর্তন দরকার। যেখানে স্বাভাবিক সাংবাদিকতা খাটে না সেখানে দরকার সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার সাংবাদিকতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর সাংবাদিকদের উদ্যোগে প্রশ্ন ফাঁসের হোতাদের মুখোশ উন্মোচন হবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু মেধাতালিকায় আত্মগোপনে থাকা নাম না জানা অপরাধীদের কি হবে?

শেষ কথাটা বলি,

কিছুদিন আগে বেসামরিক বিমান চলাচল বিষয়ক একটি আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে বিমান উড্ডয়ন-কালে কোন ব্যক্তি যদি বাধার সৃষ্টি করে তবে তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাজা ভোগ করতে হবে।

খুবই স্বাভাবিক। যদি কেউ বিমান উড্ডয়নের সময় বাধা দেয় তাহলে যাত্রীদের জীবন বিপন্ন হবে। তাহলে আমার প্রশ্ন, শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা অপরাধীদের সাজা কি শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

বি: দ্র: লেখাটি পূর্বে একটি সামজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে- লেখক।