ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

মুখে হালকা দাড়ি, মাঁথায় ময়লা টুপি, গাঁয়ে থাকতো লম্বা ময়লা পাঞ্জাবি, পড়নে থাকতো ময়লা লুঙ্গি, একটা লোক প্রায় বাড়িতে আসতো, দেখা যেত তিনি সেদিন আসতেন যে দিন বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হতো ! তিনি আসতেন ভাত খেয়ে যর্থারীতি আবার চলে যেতেন, তিনি কোন কথা বলতেন না কারন তিনি বোবা, কথা বলতে পারতেন না ! তিনি কথা বলতে পারতেন না বলে সবাই তাকে একটু বেশিই আদর-যত্ন করতো ।  একদিন জানা গেল তিনি লিখতে পারেন , তার নাম ঠিকানা জানতে চাওয়া হলে তিনি তা মাটিতে লিখে দিলেন এবং তার লেখা অনেক সুন্দর বলে মনে হলো ! এ ভাবে চলতে থাকলো অনেক দিন । হঠাৎ একদিন আমি রায়পুর বাজারে (আমার এলাকার বাজার) তাকে দেখলাম আমার বয়সী কিংবা আমার চেয়ে ছোট হবে একটা ছেলেকে অশ্লীল গালি দিচ্ছে এবং ছেলেটি ও প্রতি উওরে তাকে অশ্লীল গালি দিচ্ছে! আমিতো আবাক ! কিছু দিন পর তাকে বাড়ির সামনে দেখতে পেয়ে আমি তার কাছে জানতে চাইলাম আপনি তো কথা বলতে পারেন তবে বোবার অভিনয় করেন কেন ? তিনি তেড়ে আসলেন মারার জন্য ……. ।

বাড়িতে একটা ফকির আসতো প্রায় সময় , এসেই চিৎকার করে বলতো আমার মেয়ের বিয়ে জামাইকে বিশ হাজার টাকা দিতে হবে আমি গরীব মানুষ কোন জায়গা জমি নাই, এই বয়সে কোন প্রকার কাজ-কর্ম করতে পারি না অনেক কষ্টে আমি বার হাজার টাকার মতো যোগাড় করেছি এখন আপনারাই আমার ভরসা, আপনারা অনেক নামি-দামি বাড়ির লোক। এই এলাকায় আপনাগো মতো নামি-দামি বাড়ী আর নাই আপনারা দয়া করে আমার মেয়ের বিয়েতে সাহায্য করেন। আল্লাহ আপনাগো দিছে, আল্লাহ আপনাগোরে আরও দিবো । একদিন তার কাছে আমি জানতে চাইলাম , মুরুব্বী আপনার মেয়ে কয়জন ? তিনি কিছু না ভেবে দ্রুত উওর দিলেন, কেন ? একজন বাবা! তখন তার কাছে আবার জানতে চাইলাম, আপনার এই মেয়ের কি প্রতি মাসে একবার করে বিয়ে হয় ? আপনি তো প্রতি মাসে এসেই একই কথা বলেন!

রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসার (আমার এলাকার মাদ্রাসা) সামনে একটা দোকান ছিল দোকানের সাথেই তিনি আখ (ইক্ষু) সাজিয়ে রাখতেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। একদিন ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় কি মনে করে একটা আখের দাম জানতে চাইলাম। তখন তিনি আমাকে বাধ্য করলেন ঐ আখটা কিনতে। শুধু আখ না, আমি টাকার নোট দিলে বাকী টাকা ফেরত না দিয়ে অন্যান্য পন্য নিতে বাধ্য করলেন! পরে জানতে পারলাম তিনি ছোটদের সাথে এ রকমই করেন!!

আমি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা কেন্দ্র রায়পুর এল এম উচ্চ বিদ্যালয়। আমি যখন পরীক্ষার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হতাম তখন প্রতিদিনই একজন রিক্সাওয়ালাকেই দেখতাম এবং তার রিক্সা করেই পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতাম। একদিন রিক্সাওয়ালা এবং আমার- দু’জনের একজনের কাছেও ভাংতি ছিল না। তখন তাকে টাকার নোটটা দিয়ে বললাম, সমস্যা নাই কালকে দেখা হবে। কিন্তু দুঃখজনক তার সাথে আর দেখা হয়নি !

চট্রগ্রামের আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড় দিয়ে এইচএসবি ব্যাংকে যাচ্ছিলাম, পথেমধ্যে বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক জুব্বা পড়া সাদা লম্বা দাড়ি সুন্দর চেহেরা দেখে মনে হলো নিখাদ ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে দিলেন সারা দিন কিছু খাননি এবং বাড়িতে যেতে পারছেন না; সব ছিনতাই হয়ে গেছে! আমি জানতে চাইলাম কত লাগবে, বললো ২০০ টাকা ! আমি তাকে ৩০০ টাকা দিলাম ! এইচএসবি ব্যাংকে কাজ শেষে যখন মোড়ে ফিরে আসলাম তখন দেখলাম তিনি তখনও দাঁড়িয়ে এবং লোকজনকে একই কথা বলে টাকা নিচ্ছেন!

একজন লোক বাড়িতে প্রায় এসে চিৎকার করে বলতেন, কাগজ কিনি, বই কিনি, লোহা কিনি, বতল কিনি, সিসি কিনি। বাড়ির প্রায় সবাই তার কাছে পুরাতন জিনিষপএ বিক্রি করতে দেখতাম । একদিন তার কাছ থেকেই জানতে পারলাম তার ছেলে ঢাকায় জগ্নাথ কলেজে পড়ে! অনেকদিন পর তার সাথে আবার দেখা হলো। তার চলতে-ফিরতে অনেক কষ্ট হয় মনে হলো। তার কাছে জানতে চাইলাম, তার ছেলের কি খবর? তিনি জানালেন বেকার! অন্য কাজ করতে লজ্জা পায়, কারন এম এ পাশ ! তাই বৃদ্ধ বয়সে এসে ও তিনি চিৎকার করে বলেন, কাগজ কিনি, বই কিনি, লোহা কিনি, বতল কিনি, সিসি কিনি ! কারন তিনি প্রতারনা জানেন না !
বুঝলাম সমাজে এখনও ভালো লোক আছে তবে সংখ্যাটা কম!