ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

এক বন্ধু আমাকে খুব খেপাত। বলত আমি নাকি একটা পাগল বৈ কিছুই না। আমি কেনো কবিতা লিখি কিংবা কবিতা পড়ি কিংবা কবিতা ভালোবাসি এসবে তার মারাত্মক অনীহা। আমি একটা ভ্যাগাবন্ড। মেরুদণ্ডহীন প্রাণী। পাগল-ছাগল ছাড়া কিছুই না। আমার ভবিষ্যত অন্ধকার। একেবারে ঘোর অমানিশার কবলে পড়ে আছে। আমি আমার নিজের পায়ে নিজের তৈরী করা কুড়াল মারছি। এরকম বহু কিছু বলে শেষ পর্যন্ত সে আমাকে বলা যায় ত্যাজ্য-ই করে যায়। আমি ভালোবাসি পৃথিবীর রঙ, অপার বিস্ময়। আমি ভালোবাসি জ্যোৎস্নার গলে পড়া মোহন মখমল স্পর্শ; ভালোবাসি রৌদ্রের ঝিলিক। আমি ভালোবাসি ঘোর অমানিশার কবলে রাতের একটু একটু করে ক্ষয়ে যাওয়া দেখতে; ভালোবাসি বয়ে যাওয়া নদীর নিরন্তর বহতা। আমি কি আর বন্ধু শোকে কাঁদব? বন্ধু শোকে কাঁদার মত সময় কোথায় আমার। আমি তো পাগল কবিতার প্রেমে…

একদিন অফিসে বসে বৃষ্টি দেখছিলাম। এক কলিগ কাম বন্ধু বলল_ বৃষ্টি দেখে কি কবিতা লিখতে মন চাচ্ছে নাকি? হেসে দিলাম। গবেটটা একটা আস্ত গবেট। বললাম; – না। কবিতা লিখে বৃষ্টি ঝরাতে হয়। বৃষ্টি দেখে দেখে কবিতা লিখতে হবে কেনো? কবিতা কি মুখস্ত করা জিনিস বা প্রিয় কোন গানের শেখা লাইন যে বৃষ্টি দেখলেই মনে পড়ে যাবে আর লিখে ফেলব। কবিতা লিখে বৃষ্টি ঝরাতে পারে যে; সেই তো কবি। সেই তো স্বার্থক কবি। কবিতা বৃষ্টি হয়ে ঝরবে; পাঠক কবিতা পড়ে বৃষ্টি ঝরার জাদুবাস্তবতার টের পাবেন; তবেই না কবিতা। কবিতা বৃষ্টি দেখলে আসে না; মনে যখন বৃষ্টির রঙ লাগে তখন কবিতা আসে। মনে বৃষ্টির রঙ লাগে কখন, সে কেবল কবি জানে। অথবা বলা যায় কবিও জানে না কখন কোন ঘোরে মনে লাগে দোলা কবিতা লেখার। শুনে আমাকে বলল_লোকটা সুবিধের নয়। অথবা পাগল ছাগল একটা। আমি খুব হেসেছিলাম সেদিনও। পাগল ছাগলও এই দেশে কবি হয়!

এক কাজিন আমাকে ব্যঙ্গ করে বলে মেন্টাল। একদিন ফেসবুকে চ্যাট করার সময় আমাকে নানা উপদেশ দিলো; এগুলো ভালো কাজ নয়। এগুলো বাদ দিয়ে কাজে মনোযোগী হ। বললাম_ আমি তো কাজই করি সারাদিন। আটটা পাঁচটা অফিস করি। প্রতিদিনই অফিস করতে হয়। বললো; এগুলো মানসিক বিকারগ্রস্তদের কাজ। আমিও বলে দিলাম; তা ঠিক। আমি ও একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ। তোর যদি খুব আফসোস হয় তবে আমাকে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বাদ দিয়ে দিস; চাইলে জীবন থেকেও। বললো_ তুই তোর কাজিনকে এভাবে বলতে পারিস। কেনো নয়; বললাম। যে আমার লেখালেখিকে চরম ব্যাঙ্গ করতে পারে; তাকে আমি এইটুকু উদারতা দেখাতে পারি না! কে জানে ওদের উদারতা, প্রজ্ঞা আর বোধেরা কতটা শানিত।

যে কবিতা পড়ে না সে জীবন বুঝে না। যে কবিতা বুঝে না সে একটা অরসিক, অরসজ্ঞ জীবন যাপন করে। একটা আলুনি জীবনের বোঝা বয়ে যায় নিরন্তর। যে বোধ, যে প্রজ্ঞাময় বোধশক্তি দিয়ে কবিতার শরীর নির্মান হয়; সেটা বুঝতে গেলে নিজের মেধা ও মননকে একটু হলেও শানিত করা দরকার। জীবনের পরতে পরতে যে হাহাকার, যে সুখোষ্ণ সময়ের দীর্ঘশ্বাস, যে পেলব অনুভূতি সকল; সেগুলো ই কবিতা। কবিতার আলাদা কোন মানে নেই। যে জীবন বোঝে সে কবিতা বুঝবেই। কবিতা আর জীবন পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে যেন মিতালী উৎসবে যাচ্ছে প্রাণের সখারা। কবিতার জমিনে যে সীমাহীন বোধ; যে আকাঙ্খার বিস্তার তা জীবনেরই ব্যাপ্ত কিংবা সুপ্ত রূপ। তাই প্রতিটি কবিতাই জীবনের কথা বলে। অমল ধবল স্বপ্নের কথা বলে। কেউ কেউ বলেন; গানেও তো সেটা হয়। হ্যাঁ হয়। গানেও হয়। তবে সেটা কবিতার মত নয়। বিশেষত যেসব গানে ধামাকা ধামাকা হিপহপের মাত করা চারপাশ সেগুলোতে অবশ্যই নয়। জীবনমুখী যেসব গান জীবনকে টানে তা অনেকটা কবিতার মতই। কিন্তু কবিতা নয় পুরোটা কখনো। গানে বিভিন্ন উপাদান একাকার করে তবেই একটা ফর্মে দাঁড় করাতে হয়। জীবন সেখানেও আছে। হয়তো কবিতার সমানই আছে। কিন্তু বাদ্যযন্ত্রের যাতনায় সেটা আর নিখাদ জীবন থাকে না। হয়ে উঠে জীবনের কেয়টিক কোন মুহূর্তমাত্র। অথবা কোন কোন কাল একাকার করে ভাসিয়ে দিতে আসে যে উচ্ছাস সেটা। কিংবা বিশেষ কোন মুহূর্তে নিজেকে সঁপে দেয়ার একটা অদ্ভূত কায়দা। ভাবের যে গান, মরমী গান, গজল, এবং আরো আরো যা জীবন-যাপনের গান আছে সেখানেও জীবন আছে। বহুলাংশেই আছে। কিন্তু ঐ যে নানা অনুসঙ্গ নানাভাবে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। যে কারণে গানের জীবন আর কবিতার জীবনে বিস্তর ফারাক।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যে পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং পরিমার্জন তা নানাভাবে নানা ভঙ্গিমায় কবিতায় উঠে আসে। কোন অনুসঙ্গ ছাড়াই। কোন বাহানার তোয়াক্কা না করেই। তারুণ্যের দীপ্ত পদচারনায় যে মুখরতা, হতাশায় জর্জরিত যে মানবমন, সে একান্তে নিজেকে কবিতার দরবারে সঁপে দেয়। তাই যুগে যুগে একজন রবীন্দ্রনাথ, একজন জীবনানন্দ গণমানুষের আরাধ্য হয়ে উঠেন।