ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আমাদের এলাকা বিখ্যাত। বিখ্যাত থেকে আরেকটু বিখ্যাত হল। এবারের কারণ, মামলা। টিয়া নিয়ে মামলা। টিয়ার নাম মিঠু। এই মিঠুকে নিয়েই হচ্ছে তুলকালামা।মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামে একটি টিয়ার মালিকানার দাবি গ্রাম আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই পক্ষই পাখিটির মালিকানা নিয়ে অনড় অবস্থানে থাকায় রায় দেওয়া নিয়ে খানিকটা বিপাকে পড়েছেন আমঝুপি ইউনিয়ন পরিষদ গ্রাম আদালতের বিচারক ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম।

অভিযোগকারী আমঝুপি কারিগরপাড়ার জাহান আলী (৪৯)। তিনি ২০০০ সালে বাচ্চা অবস্থায় টিয়াটি সংগ্রহ করে পোষেন। এর নাম দেন মিঠু। তাঁদের সন্তান না থাকায় পাখিটি সন্তানতুল্য হয়ে ওঠে। ২০১০ সালের আগস্ট মাসে ঝড়ের দিনে পাখিটি নিখোঁজ হয়। দুই মাস আগে তিনি জানতে পারেন, পাখিটি আমঝুপি মসজিদপাড়ার আহম্মদ আলীর বাড়িতে আছে। তিনি পাখিটিকে নিজের পোষা বলে দাবি করে সেটি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে সাত হাজার টাকা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু আহম্মদ আলী পাখিটি না দেওয়ায় তিনি গ্রাম আদালতে মামলা করেন।

অন্যদিকে আহম্মদ আলীর দাবি করে বসেন পাখিটি আমাদের। গ্রাম আদালতে মামলা হয়েছে, হোক। প্রয়োজনে পাল্টা মামলা করব। হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে যাব। তবু টিয়া দেব না।’ তাঁর স্ত্রী ফাতেমা খাতুনের (৪০) দাবি, তিনি চার বছর ধরে পাখিটি পুষছেন। পাখিটিকে তিনিই কথা বলা শিখিয়েছেন। বর্তমানে টিয়াটি মামলার বিবাদী আহম্মদ আলীর দখলে আছে। তিনি বলেন, মামলার তিনটি ধার্য দিন গেছে। দুই পক্ষই পাখির মালিকানার দাবিতে অনড়। এবার তিনি পাখিসহ দুই পক্ষকে আদালতে হাজির হতে নোটিশ দেবেন। আদালতে ইউনিয়নের বিশষ্টি ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তাদের মতামত নিয়ে পাখিটির মালিকানার রায় দেওয়া হবে।

ঘটনা শেষ পর্যন্ত কি হয় তা নিয়ে চলছে টান টান উত্তেজনা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল…ঘটনা শুধু মিঠু নামের টিয়া নিয়েই নয়..এর আগে ‘মৌসুমি’ নামের একটি রাজহাঁসের মামলা হয়েছিল। ১২ বছর ধরে সেই মামলা এখনো চলছে…কোনো পক্ষই নিষ্পত্তি করতে রাজী নয়। মামলা…মামলা খেলতে গিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেছে কিন্তু কারও দাবি কেউ ছাড়েনি। কারণ, ব্যক্তিগত ইমেজ..সমাজে কেউ হেরে যেতে চায়না। গ্রামটির এই বিষয়টির পুরোনো ঐতিহ্য রয়েছে। এর আগে জমি নিয়ে মামলা..পাল্টা মামলা লড়াইয়ে অনেকেই নিঃস্ব পর্যন্ত হয়েছে। আদালতের মারপ্যাঁচ বোঝে না এমন কিছু ব্যক্তিও যেকোনো বিষয় নিয়ে মারামারি- মামলা করে বসে। এ প্রসঙ্গে খুব প্রচলিত একটি কথা চালু আছে। আর তা হচ্ছে- ‘হ্যালো হ্যালো উহাদের ট্যাকাগুলা ক্যামনে ফেলো’। এ কথাটি উত্স হচ্ছে-এক অশিক্ষিত লোক মামলা নিয়ে আদালতে গিয়ে কাউকে মোবাইলে কথা বলতে দেখে। মামলায় হারার পর সে অভিযোগ আর দুঃখ নিয়ে এই কথাটি বলেছিল। আসলে গ্রামের মানুষগুলো খুবই সহজ সরল কিন্তু নিজেদের সম্মানের দিক থেকে একটুকুও ছাড় দিতে রাজি নয়। এর ইতিহাস রয়েছে। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ ভারত থেকে উঠে আসা। এখানে বেশ কিছু গোষ্ঠী ও সমাজের মধ্যে পার্থক্যই এর কারণ। তবে গ্রামের ভালোর পক্ষে আবার সবাই এক। কিন্তু বর্তমানে কিছু স্বার্থন্বেষী মহলের ইন্ধনে গ্রামের সহজসরল মানুষগুলোর মধ্যে মামলা-মামলা আরো বেড়ে গেছে।

আমঝুপি নীলকুঠি গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো ঐতিহ্য। আমঝুপি যাওয়ার পথে রাস্তায় অসংখ্য বড় বড় প্রাচীন গাছ ছিল। কিন্তু এলাকার কিছু স্বার্থন্বেষী মহল গাছগুলো কেটে নিজেদের পকেটে পুরেছে। বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। একসময় পুরো গ্রামে এতো বেশি টিয়া আর অতিথি পাখিসহ প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ছিল যে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো দায়। কিন্তু গ্রামে এখন টিয়া নিয়ে মামলা দেখে কষ্ট হয়…গাছগুলো না কাটলে টিয়া নিয়ে মামলা হত না। আমার নিজেরও একসময় একটা টিয়া ছিল। গ্রামের লম্বা নারকেল গাছে উঠে টিয়া পাড়ার কথা আজ মনে পড়ে গেল………………….