ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

জীবনকে শোকগাঁথা দিয়ে নয়, জীবনকে যৌবনের উচ্ছলতায় যে শিল্পী নিরন্তর ছবি এঁকেছেন তিনি হচ্ছেন সুলতান । অসাধারন দেশ বরেন্য বাঙালী এই চিত্রশিল্পী বেঁচে ছিলেন যতদিন যাপন করেছেন অনন্য এক জীবন। তাঁর বৈচিত্রময় জীবনযাপন, জীবন জিজ্ঞাসা অনেকের কাছে থেকে গেছে রহস্যময়তার জালে। আমৃত্যু তিনি হয়ে উঠেছিলেন জীবিত কিংবদন্তী। পরান বাউল এই প্রতিভাধর শিল্পী সেই ছোটবেলায় ঘর ছেড়েছিলেন পথের টানে। জন্মগত প্রতিভা ছবি আঁকাকে সম্বল করে যত্রতত্র ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। জীবনের ছবি আঁকতে যেয়ে মানুষের সাথে মিশেছেন প্রগাঢ় ভাবে। সুলতান ইউরোপ ও ভারতবর্ষসহ বিভিন্ন জায়গায় ছবি এঁকেছেন। তাঁর প্রদর্শিত ছবি প্রশংসিত হয়েছে। এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে লন্ডনের আর্ট গ্যালারীতে দালি,পিকাসো,পলক্লী এবং ব্রাকের ছবির পাশাপাশি তাঁর ছবি তিনি প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি আমেরিকার নিউইয়র্ক, বোস্টন,ওয়াশিংটন ও শিকাগোতে চিত্র প্রদর্শনী এবং আর্টের উপর সেখানকার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গুরুত্বপুর্ন বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। ইউরোপে যাওয়ার আগে তিনি কাশ্মীর,লাহোর,সিমলা,করাচিতে তাঁর ছবি প্রদর্শন করেন। কাশ্মীরি উপজাতি ও সেখানকার নিসর্গেও ছবি এঁকেছেন তিনি অসংখ্য। সুলতানের তখনকার ছবিতে ভ্যানগগীয় চিত্র ধারার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। বিদেশী শিল্পী রুবেন্স,এদুয়ার মানে,দেগা,পল সেজান,দালির ছবির সাথে সুলতানের ছবির অনেক যোগসূত্র অর্থাৎ সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন’ দেশী বিদেশী কোন একক ধারার অসুসারী সুলতান ছিলেন না।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে তাঁর ছবির মূখ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশ কিন’ শিল্পরীতি ছিল পুরোপুরি ইউরোপিয়ান ধাঁচের। এই অদ্ভুত উত্তরণের জন্য একমাত্র সুলতানই এই উপমহাদেশের চিত্রকলার ঐতিহ্যকে ভৌগলিক বাতাবরণ থেকে মুক্ত করার সফল দাবিদার। সুলতান যদি চাইতেন তাহলে তিনি অনন্য এক শিল্পধারা তৈরী করতেন পারতেন। তিনি পঞ্চাশের দশকে ছবি আঁকার সময় রঙ নিয়ে প্রচুর গবেষনা করেছিলেন। তার জলরঙে সফট টোনে আঁকা বাংলার প্যানোরোমা গুলোতে উঠে এসেছে শ্যামলীমা চিত্র এবং মানুষের দেহাবয়ব। এই পেশীবহুল মানুষগুলোই এক সময় ল্যান্ডস্কেপের পরিবর্তে হয়ে গেল ছবির কর্মনায়ক। বাংলার গ্রামীন জীবনের ছাপ সুলতানের ছবিতে চরম ভাবে দেখতে পাওয়া যায় ।

বিশ্ব পরিক্রমনের পর যান্ত্রিকতাকে পাশ কাটিয়ে তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে গ্রাম্য-ছায়া সুনিবিড় জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন,গৌরব আর ক্ষমতা অর্জনের মোহকে সুলতান অনেক আগেই জয় করেছিলেন। বাইরের আরোপিত কোন শর্ত মেনে না নিয়ে নিজের শর্তেই জীবন-যাপন এবং শিল্প সাধনা করেছেন তিনি। দুই বাংলার চিত্র শিল্পীদের মধ্যে সুলতান অকৃত্রিম ভাবে বাঙালী শিল্প চেতনা ধরে রেখে একটার পর একটা ছবি এঁকেছেন আর শ্যামলী বাংলার জল-হাওয়ায় বাঁচতে চেয়েছেন। প্রচার বিমূখ অথচ কর্মমূখর এই শিল্পী তথাকথিত পুঁজিবাদী ধনিক ভদ্রলোকের মুখ কথনই আঁকতে চাইতেন না। তিনি বলতেন সম্পদশালীরা শিল্পকে শাসন করে বটে তবু তারা রক্ত পিয়াসী ও হিংস্র জানোয়ারের চেয়ে ঘৃণিত। হত দরিদ্র মানুষের ছবি আঁকতে যেয়ে তাদের লড়ে যাওয়ার মানসিকতাকে তিনি অন্তদৃষ্টিতে দেখে অভিভূত হয়েছেন বারবার। শৈশব থেকে দারিদ্র তাঁকে ধাওয়া করেছিল পাগলা ঘোড়ার মতন। নিস্কৃতি পাননি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। মানুষের অনাদরে অবহেলা নির্যাতনের ভিতরেই তিনি শিল্পচর্চা করেছেন।

সুলতান তুলির আচড়ে জীবনের জন্য শব্দবিহীন কবিতা লিখেছেন একটার পর একটা। প্রতিবাদী ছবি এঁকেছেন এই সুন্দর জীবনের নিদারুন অবহেলা থেকে। একবার নড়াইলে তিনি বাউল বেশে অনাহারে ঘুরতে ঘুরতে গার্লস স্কুলের দেয়ালে লাল ইটের টুকরো নিয়ে নেশায় বুদ হয়ে ছবি আঁকছিলেন। বিষয় ছিল ন্যুড ফিগার। একান্ত নিমগ্ন হয়ে ছবি আঁকছিলেন তিনি। অভিভাবক মহল সুলতানের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করল। গ্রেফতার করা হলো সুলতানকে। মারধর করা হলো তাকে। ভাবতে অবাক লাগে বিখ্যাত এই শিল্পীর এই দুরবস্থার । তিনি তখন পুলিশ অফিসারকে শুদ্ধ ইংরেজীতে চিৎকার করে প্রশ্ন করেছিলেন,যদি ছবি আঁকা আর নেশা করার অপরাধে আমাকে তোমরা এভাবে মারতে পারো – তবে আমি এস,এম সুলতান কতদিন না খেয়ে থেকেছি আমাকে ধরে এনে খাওয়ার ব্যবস’া করে দাওনি কেন ? নেশা করলে যদি শাস্তি দেওয়ার ব্যবসা থাকে তাহলে না খেয়ে থাকলে খাবার দেওয়ার ব্যবস’া করতে হবে। একটা না পারলে আর একটারও দরকার নেই। তিনি আবেগরুদ্ধ কন্ঠে বলেছিলেন, আজ থেকে সব বন্ধ করে দাও তোমরা। চিরকুমার সুলতান তখন গৈরিক শাড়ি পড়ে বৈষ্ণব লীলার আধ্যত্ম রসে মগ্ন থাকতেন। কসমিক রিয়েলিটি খুঁজতে যেয়ে নেশা করেছেন আর রক্ত নেশা ছবি আঁকার মাঝে সত্য খুঁজেছেন নিরন্তর। সুলতান এক সময় সুন্দর বাঁশী বাজাতেন। কখন কিভাবে বাশের বাঁশী হয়ে গেল হাতের তুলি আর বাংলার নিম্ন শ্রেণীর সাধারণ মানুষগুলো হয়ে গেল তাঁর ছবির মূখ্য বিষয়। তাঁর এই স্বপ্নের মানুষগুলোকে তিনি বরাবরই অমিত শক্তিশালী আর স্বাস’্যবান মনে করতেন। অধিকাংশ সময় তিনি এই সমস্ত ছবিকে স্বাপ্নিক আঁকা ছবি মনে করতেন না । তাঁর ছবিতে বাংলার কৃষককে তিনি বাংলার ভূমিজ বলিষ্ট শ্রমিক হিসাবে দেখতেন। নির্মোহ ঋৃষি বাউল এই শিল্পীর গ্রামীন মানব মানবী ছিল যৌবনরস পুষ্ট। একথা অনস্বীকার্য একমাত্র সুলতানই তার তুলিতে দক্ষিণ বঙ্গের লোকায়ত জীবনের সুখ-দু:খের স্বার্থক রূপকার । তাঁর ছবির ভেতরে আছে মায়াবী এক নেশা, পাখির কলতান,ঋতু বৈচিত্র, মাটির গন্ধ,কৃষকের গায়ে জমে উঠা স্বেদবিন্দু, কৃষাণীর স্বপ্ন সাধের আপন ঝলক-তাঁর ছবিতেই দেখা যায়। পেশীবহুল মেদহীন,অমিত শক্তিতে দৃপ্ত দুর্ণিবার মানুষকে আঁকতে যেয়ে সুলতান বারবার এ দেহে বসত করা আদিম মনের বলিষ্ট স্বপ্ন খুঁজে ফিরেছেন। আর এখানেই তাঁর ছবির মূল বিস্ময় ধরা পড়ে। সুলতানের ছবি হঠাৎ দেখলে মনে হয় বাস্তববাদের ছবি। কিন’ গভীর নিবিষ্ট মনে দেখলে দেখা যায় গ্রাম্য জীবন ভিত্তিক এই সব ছবির নারী পুরুষের মুখে এক বিরল বিস্ময় লুকিয়ে আছে এবং চারপাশে ছড়িয়ে আছে স্বর্গীয় বিভা। তখন কিন’ সুলতানের ছবিকে আর রিয়েলিজমের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। সুলতানের এই অলৌকিক শিল্প সৃষ্টি আমাদের কাছে লৌকিক ধারায় আবিষ্ট এক আবহ তৈরী করে।

সুলতান তাঁর ছবিতে খেটে খাওয়া মানুষের তন্ময়তা আঁকতে যেয়ে মানুষের শরীর মনের যে অনবদ্য কোরিওগ্রাফী ব্যালে নৃত্যের জন্ম দিয়েছেন ,তা দেখলে প্রাণের ভিতর এক অবাক করা চঞ্চলতা সৃষ্টি হয় । তাঁর ছবির আঙ্গিকগত দিক দিয়ে তিনি নি:সন্দেহে রিয়েলিস্ট কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট গবেষনার অবকাশ আছে। ছবিতে যে রঙ তিনি ব্যবহার করতেন তা ছিল এক্সপ্রেসনিস্ট ধারার কাছাকাছি। কিন’ ছবির পুরো কাঠামো ছিল পোস্ট ইমপ্রেসনিস্ট ধারায় উজ্জিবিত। বৈচিত্রময় জীবনের অধিকারী এই গুণী শিল্পীকে ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় ম্যান অব এশিয়া সম্মানে অভিষিক্ত করে এবং বাংলাদেশ সরকার তাঁকে আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্স হিসাবে ভূষিত করে। স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা এই শিল্পী অনাদর, অবহেলা আর দারিদ্রের করালগ্রাসে নিগৃহীত হয়েছেন বারবার তবুও তিনি আপন উদ্দামে ছবি এঁকেছেন। প্রথাবদ্ধ ধর্মীয় অনুভূতি নয়, আধ্যাত্বিক দার্শনিকতা ও উদারনৈতিক ভাবাদর্শ,বৈষ্ণব,বাউল,সুফী মতবাদের অদ্ভুত এক সফল সংমিশ্রনে মিস্ট্রিসিজমের নির্যাস ছিল তার চালচলনে এবং কথাবার্তায়। যা কোন প্রাতিষ্ঠানিক পূঁথিগত বিদ্যায় তাকে অর্জন করতে হয়নি। যার সফল প্রয়োগ তাঁর ব্যাক্তি জীবন এবং ছবির উপর পড়েছিল দারুন ভাবে। সুলতানের ছবি এবং তাঁর জীবনের বৈপরিত্য তাকে বারবার আলোচিত করেছিল। সুলতান তার জনপ্রিয়তাকে গ্রহণ না করে নিভৃতে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেকে প্রকাশ করেছেন আর অর্থবিত্তের কাঙালীপনাকে পাস কাটিয়ে মনের খোরাক মেটাতে যেয়ে অক্লান্ত ভাবে ছবি এঁকেছেন। মন মন্দিরকে তুষ্ট করতে কখন যে শরীরে জ্বরা বাসা বেধেছিল টেরই পাননি তিনি। দিক-বিদিক ছুটে বেড়ানো এই বাউল শিল্পী হৃদয়মূখী হলেন যেন সেই কবিতার মতো ‘সব পাখি ঘিরে আসে-েসব নদী-ফুরায় এ জীবনরে সব লেনদেন’ জাগতিক সব লেনদেন চুকিয়ে ফেলতে আত্বচিন্তায় বিভোর হয়ে সুলতান ছবি একেছিলেন জ্বরাগ্রস্ত শরীর নিয়েই।

নশ্বর দেহ একদিন ছাড়তে হয়,মনের খাদ্য অন্বেষণে ছুটতে হয় মহাকালের পরিক্রমায়। এস,এম সুলতান নামধারী অনন্য প্রতিভাধর এই ঋৃষিতূল্য মানুষটি শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিশ্রুতিবান তুলি দিয়ে গিয়েছেন আবহমান বাংলার নতুন প্রজন্মের শিশু ও নবীন চিত্রকরদের হাতে। এদের মাঝেই সুলতানের ছবি বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।

বাদল খন্দকার
কলাম লেখক/মানবাধিকার কর্মী
Programme Assitant, Legal
Bangladesh Legal Aid and Services Trust (BLAST)
YMCA Development Center (3rd floor),
1/1, Pioneer Road, Kakrail, Dhaka-1000
T +880(2) 8313689; 9349125
M +88 01715-220220
F +880 (2) 9347107
E badal@blast.org.bd,
W www.blast.org.bd