ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বর্তমান বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এর আগের লেখাতে ‘রাজনীতির দেউলিয়াপনা’ নামে একটা লেখা লিখেছিলাম। সেই লেখাকে স্বার্থক করতেই কিনা কে জানে এর পরবর্তিতে কিছু কর্মকান্ড আমাদেরকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এদেশের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। গত ৮ ই জানুয়ারি বৃহষ্পতিবার বিএনপির অবরুদ্ধ গুলসান কার্যলয় থেকে একটা আনুষ্ঠানিক সংবাদ প্রচার করা হয় যে ভারতের বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ্ খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছেন এবং তার স্বাস্থ্যর খোজ খবর নিয়েছেন। খবরটা স্বাভাবিক ভাবেই নিলাম কারন অবরুদ্ধ একজন নেতার খবর যে কেউ নিতে পারে। কিন্তু অস্বাভাবিকতা শুরু হল এরপর থেকে। পরদিন আওয়ামিলীগের পক্ষ থেকে বলা হল, এ খবর সঠিক নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে অমিত শাহ্ এর বরাত দিয়ে জানানো হয় খবরটি ভিত্তিহিন, অমিত শাহ্ খালেদা জিয়াকে কোন ফোন করেন নি। যদিও বিএনপি বলতে থাকে যে ঘটনাটি ১০০% সঠিক। সবকিছু মিলিয় ব্যাপারটা রহস্যময় হয়ে ওঠে। একই সময়ে বিএনপির পক্ষে ৬ জন মার্কিন কংগ্রেসম্যানের একটি বিবৃতিও প্রচারিত হয়। কিন্তু পরে কংগ্রেসম্যানদের পক্ষ থেকে খবরটিও অস্বীকার করা হয়।এর ফলে এটা প্রমানিত হয় যে বিবৃতিটি ভুয়া ছিল। আর টেলিফোনের ব্যপারেও এ পর্যন্ত যা
খবর মিলেছে তাতে এটাও আপাতত মিথ্যা বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। যদি তাই হয় তাহলে দল হিসাবে বিএনপি এবং তার নেতৃত্বের অবস্থানটা কোথায় দাড়ালো? বিশেষ করে নৈতিকতার দিক দিয়ে। এখানে স্বাভাবিক ভাবেই একটা প্রশ্ন এসে যায় তা হল কেন একটা বিদেশী রাষ্টের একজন দলিয় প্রধানের একটা সামান্য ফোনকল এতটা গুরুত্বপুর্ন হয়ে উঠবে? কেন ফোন না করলেও প্রচার করতে হবে ফোন করেছে? এর উত্তর আমাদের মত সাধারন লোকের কাছে জানা না থাকলেও এটা অন্তত বুঝা যায় যে জনগনের উপর বিএনপির কোন আস্থা নেই অথবা তারা মনে করে এই আন্দোলনে জনগন তাদের পাশে নেই। যার ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা বিদেশী রাষ্টের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মজার ব্যপার হচ্ছে যারা আজ ভারতের একটু সহানুভুতি পাওয়ার জন্য এমন কাঙ্গালীপনা করছে তারা সারাজীবন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আওয়ামীলিগকে ভারতের দালাল হিসেবে আখ্যাইত করেছে এবং সবসময় জনগনের মাঝে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট উস্কে দেওয়ার চেষটা করেছে। কিন্তু আজ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই সেন্টিমেন্ট জনগনকে আর খাওয়াতে না পেরে এখন ভারতের বন্ধু হতে চাইছে। এমনকি মিথ্যার আশ্রয় নিতেও কুন্ঠাবোধ করছেনা। রাজনৈতিক দেউলিয়ত্বের এর চেয়ে বড় উদাহরন আর কি হতে পারে?

তবে বিএনপির দেউলিয়াপনার এটাই প্রথম উদাহরন নয়। আমরা এটা দেখেছি ভারতের গত লোকসভা নির্বাচনের সময়ও। সে সময়ে বিএনপির নেতা-নেত্রিদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হলে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া শুধু সময়ের ব্যপার হবে। যেন বিজেপি কোলে করে তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। তারা এটা নিয়ে এমন মাতামাতি করছিল যে আওয়ামীলিগ নেতাকর্মিদের মাঝেও সন্দেহ ঢুকে গিয়েছিল যে এমন কিছু আদৌ হবে কিনা। যাই হোক যা হওয়ার তাই হল। অর্থাৎ কিছুই ঘটল না। তাহলে বিএনপি কেন প্রত্যাশা করেছিলো ভারতের নির্বাচনের ফলাফল তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথকে সুগম করবে? তাদের এই ধরনের চিন্তাধারা আসলে তাদের মধ্যে বিরাজমান হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। এটা হল ক্ষমতা দখল করতে না পারার হতাশা, সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলনে ব্যর্থতার হতাশা। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটা তো সত্য যে সাধারন জনগনের সম্পৃক্তা ছাড়া কোন আন্দোলনই সফল হয় না।

তবে মিথ্যাচারের ক্ষেত্রে শুধু বিএনপি নয়, সরকার বা আওয়ামীলিগও খুব একটা পিছিয়ে নেই। যেমন আমরা দেখতে পেয়েছি গত ৪ই জানুয়ারি বিএনপি নেত্রীকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করা হল অথচ সরকারের তরফ থেকে বলা হল অবরুদ্ধ করা হয় নি। প্রধানমন্ত্রী বললেন, বিরোধী নেতাকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। খালেদা জিয়া নাকি সরকারের কাছে চিঠি দিয়ে নিরাপত্তা চেয়েছেন তাই সরকার নিরাপত্তা দিচ্ছে। আমরা জানি শেখ হাসিনার রসবোধ ভালো। তাই উনি তার প্রতিদ্বন্ধিকে নিয়ে তামাসা করতেই পারেন। তবে এই ধরনের কথাবার্তা শুধু বিদ্বেষই তৈরি করতে পারে আর কিছু না। প্রধানমন্ত্রীর রসিকতায় উৎসাহিত হয়েই কিনা জানিনা, তার একজন মন্ত্রী আরো এক ধাপ এগিয়ে বললেন, ব্যরিকেড দেওয়া বালু আর ইটের ট্রাক আসলে উনার বাড়ী মেরামতের জন্য আনা হয়েছে। তিনি হয়ত এইসব বলে প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী খুশি হয়েছেন কিনা জানি না কিন্তু আমরা সাধারন জনগন খুশি হইনি। প্রধানমন্ত্রীকে যদি কেউ প্রশ্ন করে যে বিএনপি যদি কখনো ক্ষমতায় যায় এবং ওনাকেও যদি এভাবে নিরাপত্তা দিতে চায় তাহলে উনি কি বলবেন? তবে উনাকে এই প্রশ্ন করার সৎ সাহস কারো আছে বলে মনে হয় না।

এই দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের একটা সূদীর্ঘ ইতিহাস আছে। এদেশের মানুষ দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তানিদের বৈশম্যমূলক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছে। গনতন্ত্র প্রতিষ়ঠায় ৯ বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করেছে। কিন্তু এরপর থেকে আমরা দেখে আসছি আন্দোলনকে ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে। আন্দোলনের নামে চলছে সহিংসতা ও নৈরাজ্য। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নির্লজ্জ মিথ্যাচার। মিথ্যার উপর ভর করে তো ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। ক্ষমতায় যেতে হলে জনগন লাগবে, জনগনকে সাথে নিয়েই যেতে হবে। প্রশ্ন হল জনগন কি সঙ্গ দিবে? এর উত্তর আমার জানা নেই। সময়ই এর উত্তর দিবে।