ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

উচ্চলক্ষ্য, উচ্চাকাঙ্খা বা জীবনে বড় হওয়ার ইচ্ছা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করলে হয়ত প্রত্যেকই স্বীকার করবেন নিজের উচ্চলক্ষ্য বা জীবনে বড় হওয়ার দুর্বার আকাঙ্খার কথা।

উচ্চাকাঙ্খা বাস্তবায়নে ব্যক্তিমাত্রই সচেষ্ট হয়; কেউ সফল হয়, কেউ হয় না। গন্তব্যে পৌঁছার পথ-পন্থা-পদ্ধতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। অনেকে পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের কথা বলেন। পরিশ্রম ও অধ্যবসায় অনেক আয়াস ও কষ্টলব্ধ বিষয়। ধৈর্য ধরারও ‘ধৈর্য’ অনেকের থাকে না।

আর আত্মবিশ্বাস তো সাফল্য ও নিজের সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার ফলশ্র“তি। কিন্তু সাফল্য তো পেতেই হবে। তাই সাফল্য পেতে অনেকে সহজ পদ্ধতির সন্ধান করেন। (অবশ্য সহজ পন্থায় কার্যসিদ্ধি হলে পরিশ্রম ও কষ্টের পথে না যাওয়াই জ্ঞানীর কাজ। কিন্তু বড় কোন কাজ বা জীবনে সাফল্য সহজে এসেছে এমন দৃষ্টান্ত দুর্বল।) তাই অনেকে শর্টকাটে জীবনে উন্নতি করতে চান। তোষামোদ এদের বাতলে নেয়া এমনই এক পদ্ধতি।

কারও অহেতুক, অতিরিক্ত, কখনোবা অনুপস্থিত গুণাবলির প্রশংসা করে তার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার ব্যক্তিত্বহীন বা নির্লজ্জ প্রয়াসের নাম এটি। প্রচলিত ভাষায় এর নাম ‘তেল দেয়া’। আর ব্যক্তির নাম তেলবাজ। তোষামোদকারীকে চাটুকার বা খয়ের খা-ও বলা হয়। বলাবাহুল্য, এসময় তোষামোদকৃত ব্যক্তির কোন ব্যর্থতা বা দোষ তোষামোদকারীর দৃষ্টিগোচর হয়না কিংবা স্মরণে আসলেও তা উল্লেখ করা হয়না।

প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে, স্বনামে-বেনামে এদের সাথে সাক্ষাত ঘটে। তবে প্রতিষ্ঠিত কোন ব্যক্তি, কোন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল বা বস, সরকার ও প্রশাসনের উর্দ্ধতন ব্যক্তি সাধারণত অধস্তন ব্যক্তির তোষামোদের শিকার হন।

আমার এক বন্ধু বলেন যে, ‘প্রত্যেক মানুষই ‘তেল খেতে’ পছন্দ করে। তোষামোদ যখন করা হয় তখন ব্যক্তি নিজেও জানে যে তার তোষামোদ করা হচ্ছে, তেল দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তিনি তার প্রতিবাদ করেন না; তেল খান’।

তোষামোদ সাধারণত ক্ষমতা বা অর্থের পিছু নেয়। কারও ক্ষমতা বা অর্থ ফুরালে তোষামোদকারীও আর তার ছায়া মাড়ায় না। প্রতিষ্ঠান, সমাজ বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যখন এর শিকার হন, তখন তারা আমোদে গদগদ হন। আর নিজের দুর্বলতা, ব্যর্থতা বা অযোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক ও সম্যক ধারণা না থাকার কারণে প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের ক্ষতি বয়ে আনেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা সাধারণত তেল খাওয়ার অভিযোগ করেন। আর শিক্ষার্থীরাও পরস্পরকে ‘তেলবাজ’ আখ্যা দিতে পছন্দ করেন। কোন শিক্ষকের সাথে কোন শিক্ষার্থীর ভাল ‘যোগাযোগ’ বা পরিচিতি না থাকলে, কারণে-অকারণে তাকে ফোন না করলে নাকি তার কোর্সে ভাল নম্বর পাওয়া যায় না। একই নোট পড়ে একই রকম পরীক্ষা দিয়েও নম্বরের আকাশ-পাতাল ব্যবধান নাকি এই ‘যোগাযোগে’র কারণেই হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থানধারী এক ছাত্রের সম্পর্কে শুনেছি ভাল পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি তার অনুর্ধ ৩৫ বছর বয়স্ক কোর্স শিক্ষিকার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে পরীক্ষার হলে ঢুকতেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তার কাছ থেকে শুনেছি, সেখানকার অনেক সিনিয়র প্রফেসরও এই রোগে নাকি এতটাই আক্রান্ত যে, মাথা উঁচু করে, কাচুমাচু না করে উপাচার্যের সাথে কথা বলেন না। অনেকে আবার মেঝেতে বসে পড়েন! তার কথা বিশ্বাস করেছি কারণ স্বায়ত্বশাসিত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অনেক সম্মানিত-একথা বাদ দিলেও ক্ষমতাবানও বটে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও মানুষ!

ব্যক্তি যেহেতু এটি পছন্দ করে তাই সাংবাদিকতায় সোর্সের সাথে সম্পর্ক তৈরি, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ এবং তথ্য সংগ্রহে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তাই অনেক সাংবাদিক ব্যক্তিজীবনে বন্ধুমহলে ‘তেলবাজ’ হিসেবে অভিহিত হন।

তোষামোদ এবং আত্মসম্মানবোধ একসাথে চলতে পারে না। তাই তোষামোদকারী ব্যক্তি তার জীবনের মূল্যবান সম্পদ আত্মসম্মানবোধকে বিসর্জন দিয়েই একাজে অগ্রসর হয়।

আত্মসম্মানবোধ হল ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক দিক যার জন্য ব্যক্তি গর্ব করতে পারে, ব্যক্তি অন্যের থেকে নিজেকে আলাদা মনে করে। অন্যভাবে বললে, আত্মসম্মানবোধ হল নিজের ওজন বুঝা এবং তা বজায় রেখে চলা। নিজেকে বড় মনে করা এবং অন্যকে ছোট মনে না করাই আত্মসম্মানবোধ। ‘ইগো’র সাথে এর একটি সূক্ষè পার্থক্য রয়েছে। ব্যক্তিত্বের একটি নেগেটিভ দিক ইগো; যার যাথে অহংকারের সংশ্রব রয়েছে।

আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কখনও অন্যায় করতে পারে না। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি দারোয়ান হলেও বস তাকে সম্মান করতে বাধ্য। স্ত্রীর মত কাছের মানুষের কাছ থেকেও এরা সম্মান পান। আত্মসম্মানবোধহীন বসকে দারোয়ানও সম্মান করে না।

সততা, উদারতা, পরিশ্রমপ্রিয়তা, পরোপকারিতা, বিনয় প্রভৃতি গুণাবলির মধ্যে ব্যক্তির মত একটি জাতির জন্য সবচেয়ে গর্ব করার মত গুণ হতে পারে এই-আত্মসম্মানবোধ। যে মা তার সন্তানের ভেতর এই একটিমাত্র গুণ জাগিয়ে তুলতে পারেন, পেরেছেন; ওই মায়ের মত দেশও তার এমন নাগরিক নিয়ে গর্ব করতে পারে। জাতীয় জীবনে এর অভাব আজ ভয়াবহ রকমের। এর ফলেই হানাহানি, কাদাছোঁড়াছুঁড়ি, দ্বন্ব, অবিশ্বাস বা মিথ্যাচারে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে দেশ।

যে নিজেকে সম্মান করতে জানে না, ভালবাসতে শেখে নি; সে অন্যকে সম্মান করবে, ভাল বাসবে কিভাবে? হাটি হাটি পা পা করে হলেও আত্মসম্মানবোধ নিয়েই ‘বড়’ হতে হয়। যারা বলেন, তোষামোদ করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করে ‘বড়’ হয়ে নিই পরে আত্মসম্মানবোধের দিকে খেয়াল করব; তাদেরকে বলব, মানুষ তার অভ্যাসের বাইরে যেতে পারে না।