ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সেলুলয়েড

 
foridi3

হুমায়ুন ফরীদিকে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। নাটক-চলচ্চিত্রে সদর্প পদচারণা তার। দুুপুর বেলা বিটিভিতে বাংলা সিনেমা দেখতে যেতাম। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। রান্না না হলে ভাত না খেয়েই যেতাম, অনেক সময়। তবুও সিনেমা দেখা মিস করতাম না। এর আগে ‘মায়ের অধিকার’-এ সালমান শাহের মামার চরিত্রে তার অভিনয় দেখে ভক্ত বনে যাই। ‘ও সোনা রে, পিঁপড়া খাবে বড় লোকের ধন’। তখন থেকেই চিনি হুমায়ুন কামরুল ইসলাম ফরীদিকে। সেই নয়-দশ বছর বয়স থেকে।

বড় হওয়ার সাথে সাথে সিনেমা দেখার ক্ষেত্র বদল হতে থাকে। বাড়ি থেকে শহরে হলে গিয়ে দেখতে থাকি সিনেমা। তখনও মুগ্ধতা কাটেনা ফরীদির অভিনয় থেকে। কি ন্যাচারাল অভিনয়! জাত অভিনেতা। দর্শক মাতানো অভিনয়। একটা সময় বুঝতে পারি তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের নক্ষত্র-সূর্য। ‘যার নিজের আলো আছে, গ্রহ-উপগ্রহ আছে; অন্যকে আলো দেয়, আলোকিত করে’। যিনি স্রষ্টা। লীডার। তিনি পথ দেখান। অন্যরা চলে তার দেখানো পথে।

মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্র সর্বত্রই ছিল তার সাবলীল ও রাজসিক পদচারণা। অভিনয়ের ভেতরে চলে যাওয়ার অপূর্ব ক্ষমতা। মিশে যাওয়া অভিনয়ের সাথে। এর নাম হুমায়ুন ফরীদি। মৃত্যু হবে। তাই বলে এমন মৃত্যু! ৬০ বছর নেহাত কম নয়। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে যেন খুবই কম! বিশেষ করে ফরীদির মত লোকদের। আর ক’টা দিন থাকলে কি হত না!

অভিনেতা যায়, আসে। কিন্তু কিংবন্তি তৈরি হয়। একবার গেলে আর আসে না। নজরুলের ধুমকেতুর মত-‘আমি যুগে যুগে আসি; আসিয়াসি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু। এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু’। ফরীদিরা বার বার আসে না। যুগেই আসেন। একবার। এসে বিপ্লব সাধন করেই চলে যান।

ব্যক্তিগত জীবনে সুবর্ণার সাথে বিচ্ছেদের পর থেকেই অনেকটা নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করতে থাকেন তিনি। নিজের ওপরে হয়ত ‘প্রতিশোধ’ নিতে থাকেন। অভিমান করেই। ঘরের মধ্যে তৈরি করেন আরেক ভুবন। অন্ধকার সে ভুবনের বাসিন্দা শুধু তিনিই। নিঃসঙ্গতা কুড়ে কুড়ে খেয়েছে তাকে এই এত দিনে।

ফরীদির জীবনটা যেন অনেকটা ‘দেবদাসে’র মত। বাথরুমে পড়ে কী করুণ মৃত্যু! দেবদাসের করুণ মৃত্যুর পর উপন্যাসের শেষাংশে শরৎচন্দ্রের মন্তব্য ছিল- ‘এখন এতদিনে পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না। শুধু দেবদাসের জন্য বড় কষ্ট হয়। তোমরা যে কেহ এ কাহিনী পড়িবে, হয়ত আমাদেরই মত দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনো দেবদাসের মত এমন হতভাগ্য, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু পার্থনা করিও। পার্থনা করিও আর যাহাই হোক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহ করস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে-যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে’।

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত