ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

হত্যা, অগ্নিসংযোগসহ পিরোজপুরে সংঘটিত সব ঘটনায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী জড়িত ছিলেন বলে লোকমুখে শুনেছি। ট্রাইব্যুনালে এমন বক্তব্য দিয়েছেন ২৭তম সাক্ষী সাইফ হাফিজুর রহমান। তিনি বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কারণে আমার ভাইকে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে। এর আগে গ্রেপ্তারের সময় মন্নাফ রাজাকার ও দেলোয়ার হোসেন ছিল পাকিস্তানিদের গাড়িতে। ভ্রাতৃহত্যার ঘটনা পরে তিনি জেনেছেন মন্নাফের কাছ থেকে। আজ বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ বক্তব্য গ্রহণ করে। পরে তাকে জেরা করেন এডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও এডভোকেট মঞ্জুর আহসান আনসারী। জেরা শেষ হয়েছে। সাইফ হাফিজুর রহমান জানান, তার বয়স ৬৫ বছর। তিনি দুই বারের সাবেক সংসদ সদস্য। এবারসহ নড়াইল জেলা আইনজীবী সমিতির ছয় বারের নির্বাচিত সভাপতি।

তিনি জবানবন্দিতে বলেন, ১৯৭১ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র হিসেবে শহীদুল্লাহ মুসলিম হলে থাকতাম। ’৭০-এর নির্বাচনের আগে থেকেই পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ’৭০ সালের নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করে। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। এক পর্যায়ে ৭ই মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। অসহযোগ আন্দোলন এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। আমি নড়াইলে চলে যাই। শহীদ সাইফ মিজানুর রহমান আমার বড় ভাই। তিনি একাত্তরে পিরোজপুরে ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশের অন্যান্য স্থানের মত পিরোজপুর প্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মকর্তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন এসডিও আবদুর রাজ্জাক, এসডিপিও ফয়জুর রহমান ও আমার ভাই সাইফ মিজানুর রহমান। আমি জানতে পারি আমার ভাই মিজানুর রহমান ১৯৭১ সালের ৫ই মে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। আমি, আমার বাবা ও বোন আফরোজা পারভীন নড়াইল থেকে প্রথমে খুলনায় যাই। ভাবীর সঙ্গে দেখা করি। ভাবী মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকার পরেও আমাদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন। আমরা পিরোজপুরে যাই। পিরোজপুরে গিয়ে খান বাহাদুর আফজাল ও মন্নাফের সঙ্গে সাক্ষাত করি। আফজালের কাছে জানতে পারি, আমার ভাই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহায়তা করে। এবং ট্রেজারি থেকে অস্ত্র বের করতে সহায়তা করে। একারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যার পূর্বে তাকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে বলা হলেও তিনি ‘জয়বাংলা’ বলেন। এরপরে তাকেসহ এসডিও রাজ্জাক এবং এসডিপিও ফয়জুর রহমানকে বলেশ্বর নদীর পাড়ে নিয়ে যায়, পরে ব্রাশ ফায়ার করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়। আমার ভাইকে গ্রেপ্তারের সময় মন্নাফ রাজাকার, দেলোয়ার হোসেনও পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়িতে ছিল। ওই তিন জনকে গ্রেপ্তার করে বলেশ্বর নদীর পাড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। আফজাল সাহেব ও অন্যদের কাছে জানতে পারি পিরোজপুরে যেসব হত্যাকান্ড, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোর সঙ্গে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী জড়িত ছিলেন। ওই সময় দেলোয়ার হোসেন নাম শুনেছি। পরবর্তীকালে জেনেছি উনিই দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

জেরায় আইনজীবী বলেন, খান বাহাদুর সৈয়দ মোহাম্মদ আফজাল কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সাক্ষী বলেন, না।
আইনজীবী বলেন, তার নেতৃত্বে ৭ই মে পিরোজপুরে সর্বপ্রথম শান্তি কমিটি গঠিত হয়। সাক্ষী বলেন, না। ওই তারিখের আগেই গঠিত হয়।
আইনজীবী বলেন, শান্তি কমিটি গঠনের ব্যাপারে ওই সময় থেকে আজ পর্যন্ত কোন পত্রিকায় সংবাদ দেখেছেন। সাক্ষী বলেন, না। লোকমুখে শুনেছি।
আইনজীবী বলেন, পিরোজপুরে শান্তি কমিটি কবে গঠিত হয়। সেটি কি কোন দিন জেনেছেন। সাক্ষী বলেন, না। নির্দিষ্টভাবে বলতে পারবো না।
আইনজীবী বলেন, মাস বলতে পারবেন। সাক্ষী বলেন, এপ্রিলের শেষের দিকে।
আইনজীবী বলেন, পিরোজপুরে পাকিস্তানি বাহিনী সর্বপ্রথম কবে যায়। সাক্ষী বলেন, থার্ড মে। লোকমুখে শুনেছি।
আইনজীবী বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী আসার আগ পর্যন্ত পিরোজপুর এলাকাটি মুক্তিকামীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সাক্ষী বলেন, পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ছিল বলা যাবে না।
আইনজীবী বলেন, আপনার ভাই যে ট্রেজারির দায়িত্বে ছিলেন, তা দুই বার লুট হয়। ২৭শে মার্চ অস্ত্র এবং ৩রা জুন অর্থ লুট হয়। সাক্ষী বলেন, সত্য নয়।
আইনজীবী বলেন, ট্রেজারি থেকে অস্ত্র ও অর্থ কবে লুট হয়, বলতে পারবেন। সাক্ষী বলেন, জানা নেই। তবে শুনেছি একই দিনে ২০৬টি অস্ত্র ও নগট টাকা লুট হয়েছে।
আইনজীবী বলেন, ওই সময় এই তিনজন ছাড়া প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষে শক্তিশালী আর কেউ ছিল না। সাক্ষী বলেন, ছিল না।
আইনজীবী বলেন, তৎকালীন আনসার বাহিনী আইন বিলুপ্ত করে রাজাকার বাহিনী অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সাক্ষী বলেন, বেশ পরে।
আইনজীবী বলেন, রাজাকারদের মাসিক বেতন ও নির্দিষ্ট পোশাক ছিল। সাক্ষী বলেন, বলতে পারবো না।
আইনজীবী বলেন, আফজালের নেতৃত্বে পিরোজপুরে শান্তি কমিটি গঠিত হয়। তার সদস্যদের নাম আজ পর্যন্ত জানতে পেরেছেন। সাক্ষী বলেন, চেষ্টা করেছি। কিন্তু জানতে পারিনি।
আইনজীবী বলেন, পিরোজপুরে কবে রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়, সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা নেই। সাক্ষী বলেন, নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না।
আইনজীবী বলেন, স্বাধীনতার পরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রত্যেক জেলার ইতিহাস রচিত হয়েছে। সাক্ষী বলেন, কোন কোন জেলায় হয়েছে বলে শুনেছি।
আইনজীবী বলেন, সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ‘মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষী বলেন, শুনেছি।
আইনজীবী বলেন, ড. মো. মফিজউল্লাহ। সাবেক উপ-উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। চেনেন। সাক্ষী বলেন, নাম শুনেছি। আইনজীবী বলেন, ড. সালাউদ্দিন আহমেদ। ইতিহাস বিভাগ, ঢাবি। সাক্ষী বলেন, নাম শুনিনি। আইনজীবী বলেন, ড. আনিসুজ্জামান। বাংলা বিভাগ, চবি। সাক্ষী বলেন, নাম শুনেছি। আইনজীবী বলেন, ড. সফর আলী আকন। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী। সাক্ষী বলেন, নাম শুনিনি। আইনজীবী বলেন, ড. এনামুল হক। পরিচালক, জাতীয় জাদুঘর। সাক্ষী বলেন, নাম শুনেছি। আইনজীবী বলেন, ড. কেএম ফরিদ। পরিচালক, জাতীয় আক্রাইভ ও গ্রন্থাগার। সাক্ষী বলেন, নাম শুননি। আইনজীবী বলেন, ড. কেএম মহসিন। ইতিহাস বিভাগ, ঢাবি। সাক্ষী বলেন, নাম শুনিনি। আইনজীবী বলেন, ড.শামসুল হুদা হারুন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি। সাক্ষী বলেন, নাম শুনেছি। আইনজীবী বলেন, ড. আহমদ শরীফ। বাংলা বিভাগ, ঢাবি। সাক্ষী বলেন, নাম শুনেছি। আইনজীবী বলেন, কবি হাসান হাফিজুর রহমানসহ এদের মধ্যে যাদের নাম শুনেছেন বললেন, তারা কি স্বাধীনতার পক্ষে না বিপক্ষে ছিলেন। সাক্ষী বলেন, বলতে পারবো না।
আইনজীবী বলেন, হাসান হাফিজুর রহমান কি স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন। সাক্ষী বলেন, না। পক্ষে ছিলেন।
আইনজীবী বলেন, স্বৈরাচার এরশাদের আমলে আপনি দুইবার সংসদ সদস্য হন। সাক্ষী বলেন, জাতীয় পার্টির আমলে।
আইনজীবী বলেন, এর মধ্যে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত অংশ নেয়নি। সাক্ষী বলেন, সত্য।
আইনজীবী বলেন, আপনি বর্তমানে নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। সাক্ষী বলেন, জি। আইনজীবী বলেন, নড়াইলেই সর্বপ্রথম আপনার ভাইয়ের নিহত হবার সংবাদ পান। সাক্ষী বলেন, জি।
আইনজীবী বলেন, কয় তারিখে পান । সাক্ষী বলেন, তারিখ মনে নেই। আইনজীবী বলেন, ঘটনার কত তিন পরে। সাক্ষী বলেন, ১০/১৫ দিন পরে।
আইনজীবী বলেন, খবর পাওয়ার কয়দিন পরে খুলনায় যান। সাক্ষী বলেন, অনুমান করেও বলতে পরবো না।
আইনজীবী বলেন, খুলনায় কয়দিন ছিলেন। সাক্ষী বলেন, ভাবীর সঙ্গে দেখা করে সেদিনই পিরোজপুরে যাই।
আইনজীবী বলেন, আপনার ভাই মিজানের স্ত্রী লুৎফুন নাহার জীবিত আছেন। সাক্ষী বলেন, হ্যাঁ। তিনি বর্তমান স্বামীর সঙ্গে আমেরিকা প্রবাসী।
আইনজীবী বলেন, তিনি কতদিন আগে আমেরিকায় গেছেন। সাক্ষী বলেন, ৭/৮ বছর আগে।
আইনজীবী বলেন, আপনার ভাই নিহত হবার সময় কি স্ত্রী তার সঙ্গেই ছিলেন। সাক্ষী বলেন, জি।
আইনজীবী বলেন, পিরোজপুর থেকে ফেরার পরে এবং স্বাধীনতার পরে ভাবীর সঙ্গে আপনার দেখা হয়। সাক্ষী বলেন, জি। নতুন স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে আমার বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন।
আইনজীবী বলেন, পিরোজপুরে গিয়ে কতদিন ছিলেন। সাক্ষী বলেন, যেদিন গিয়েছি, সেদিনই ফিরে এসেছি।
আইনজীবী বলেন, আফজাল সাহেবের সঙ্গে তার বাসায়ই দেখা করেছেন। সঙ্গে আপনার পিতা ও বোন ছিল। সাক্ষী বলেন, জি।
আইনজীবী বলেন, মন্নাফের বাড়ি গিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, না।
আইনজীবী বলেন, তার সঙ্গে কোথায় দেখা হয়। সাক্ষী বলেন, আফজালের বাড়িতে। আইনজীবী বলেন, আপনি ওই দিন থানায় গিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, না।
আইনজীবী বলেন, স্বাধীনতার পরে বিরোধীরা হয় পালিয়ে যায়, না হয় গ্রেপ্তার হয়। সাক্ষী বলেন, হ্যাঁ।
আইনজীবী বলেন, স্বাধীনতার পরে বিরোধীরা দেশের অভ্যন্তরে বিরোধীতা করার অবস্থায় ছিল না। সাক্ষী বলেন, প্রকাশ্যে ছিল না। গোপনে চেষ্টা করেছিল।
আইনজীবী বলেন, তাদের গোপন তৎপরতা সম্পর্কে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত কোন পত্রিকায় সংবাদ দেখেছিলেন। সাক্ষী বলেন, না। তবে রাজনীতিবিদ হিসেবে সব খবরই পেতাম।
আইনজীবী বলেন, আপনি কি স্বাধীনতা বিরোধীদের কোন গোপন মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, প্রশ্নই ওঠে না।
আইনজীবী বলেন, ’৭১-এর ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত সময়ে আপনার ভাই হত্যার বিচার চেয়ে কোন মামলা করেছিলেন। সাক্ষী বলেন, না। পরিবেশ ছিল না।
আইনজীবী বলেন, জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন আপনি এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, সংসদে কোন উদ্যোগ নেইনি।
আইনজীবী বলেন, গণতদন্ত কমিশনের কাছে কোন অভিযোগ করেছিলেন। সাক্ষী বলেন, কমিশনের সেক্রেটারি, সম্ভবত মুকুল সাহেবের পাঠানো একটি ফরম পূরণ করে তার কাছে পাঠিয়েছিলাম।
আইনজীবী বলেন, কোথায় পাঠিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, ডাকে।
আইনজীবী বলেন, তার কোন কপি বা প্রমাণপত্র আপনার কাছে আছে। সাক্ষী বলেন, না। রেজিস্ট্রি করে পাঠাই নি।
আইনজীবী বলেন, ফয়জুর রহমানের জামাই আলী হায়দার খানকে চিনতেন। সাক্ষী বলেন, আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন। একবারই দেখেছি। সম্ভবত বেঁচে আছেন।
আইনজীবী বলেন, তিনি কি স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন। সাক্ষী বলেন, যতদূর জানি, পক্ষে ছিলেন।
এসময় ট্রাইব্যুনালের কনিষ্ট বিচারপতি একেএম জহির আহমেদ বলেন, শ্বশুরকে মেরে ফেলেছে। আর আপনি জামাইকে বিপক্ষে নিচ্ছেন! আইনজীবী বলেন, মাই লর্ড, প্রাসঙ্গিকতা আছে। আইনজীবী সাক্ষীকে বলেন, তিনি তো পিরোজপুরের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। সাক্ষী বলেন, সম্ভবত।
আইনজীবী বলেন, এসডিপিও ফয়জুর রহমানের স্ত্রী আয়েশা ফয়েজকে চেনেন। সাক্ষী বলেন, কয়েকদিন আগে নাম শুনেছি। আইনজীবী বলেন, আয়েশা ফয়েজ স্বাধীনতার পরপরই স্বামীর লাশ তুলে ময়নাতদন্ত করে স্বামীসহ অপর দুই জনের হত্যার বিষয়ে মামলা করেছিলেন। সাক্ষী বলেন, জানি না।
আইনজীবী বলেন, পিরোজপুরের স্বাধীনতা বিরোধীদের গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে আপনার কোন ধারণা নেই। সাক্ষী বলেন, না। আইনজীবী বলেন, ১৯৮৪ সালে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ‘মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র’ প্রকাশিত হয়। সাক্ষী বলেন, তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় শুনেছি। তবে কোন সালে তা জানা নেই।
আইনজীবী বলেন, ওই বইয়ের ৭ম, ৮ম ও ১০ম খণ্ডে পিরোজপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগস্ত ব্যক্তি, পক্ষের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, স্বাধীনতাবিরোধীদের নামসহ ভূমিকা, প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাতকার, বিশেষভবে আলী হায়দার খানের লিখিত বক্তব্যে এসডিও রাজ্জাক, এসডিপিও ফয়জুর রহমান ও ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমানকে পিরোজপুরের ওসি ষড়যন্ত্র করে ডেকে নিয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে তুলে দেয়, তখন তারা গুলি করে হত্যা করে। ওই বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সাঈদীর ভূমিকার কথা উল্লেখ না থাকায় বইটি পড়ার পরেও আপনি সত্য গোপন করছেন। মিথ্যা বলছেন। সাক্ষী বলেন, সত্য নয়। আইনজীবী বলেন, ‘পিরোজপুর জেলার ইতিহাস’ নামে ওই জেলা পরিষদের উদ্যোগে একটি বই লেখা হয়েছে। সাক্ষী বলেন, জানি না।
আইনজীবী বলেন, ওই বইয়ে দেলোয়ার হোসেন ভিন্ন ব্যক্তি হওয়ায় বইটি পড়েও আপনি সত্য গোপন করে বলছেন ‘বইটি পড়িনি’। সাক্ষী বলেন, সত্য নয়।
আইনজীবী বলেন, এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে কবে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষী বলেন, মনে নেই। আইনজীবী বলেন, সাক্ষ্য কোথায় দিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, আমার নড়াইলের বাড়িতে। ওই সময় আমার বোন উপস্থিত ছিলেন না।
আইনজীবী বলেন, আপনার বোন কবে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষী বলেন, জানি না। তবে সে বলেছে, সাক্ষ্য দিয়েছি।
আইনজীবী বলেন, সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের নাম শুনেছেন। সাক্ষী বলেন, হ্যাঁ। আইনজীবী বলেন, তিনি একটি বই লিখেছেন। সাক্ষী বলেন, জানি না।
এসময় প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, এটাও কি সাক্ষীর জানার বিষয়। মনে হচ্ছে, উনারা পিএইচডি করবেন। আসামীপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, ডিস্টার্ব করেন কেন। আমাদের দরকার আছে। আসামীপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যুনালের পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার ক্ষমতা নেই। তবে আপনার দরকার হলে আমি দিতে পারবো। মালুম বলেন, আমার লাগবে না।
আইনজীবী সাক্ষীকে বলেন, আপনি ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন না। সাক্ষী বলেন, হ্যাঁ। আইনজীবী বলেন, ১৯৭৪ সালে রক্ষী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি ন্যাপের সদস্য ছিলেন। সাক্ষী বলেন, হ্যাঁ।
আইনজীবী বলেন, ২০০৯ সালে নড়াইল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি থাকাকালীন প্রভাব খাটিয়ে আপনি একটি রেজুলেশন পাশ করেন যাতে আপনার বিরুদ্ধে আদিবাসীদের পক্ষে কোন আইনজীবী মামলা লড়তে পারবে না। সাক্ষী বলেন, সত্য নয়।
আইনজীবী বলেন, এ বিষয়ে ২০০৯ সালের ২৫ জুলাই প্রথম আলোতে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সাক্ষী বলেন, প্রতিবাদ দিয়েছিলাম। ছাপা হয়নি।
আইনজীবী বলেন, ওই সংবাদে আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা রেজুলেশনের অভিযোগ, জাল দলিল করে আদিবাসীদের সম্পত্তি আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ করার প্রতিবাদ না ছাপানোর জন্য বা মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের জন্য আপনি প্রথম আলোর বিরুদ্ধে কোন আইনী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, না।
আইনজীবী বলেন, আপনার ভাই নিহত হওয়ার পরে আপনি ওই একবারই পিরোজপুরে গিয়েছিলেন। সাক্ষী বলেন, জি। আইনজীবী বলেন, দেলোয়ার হোসেনই বর্তমান সাঈদী। এটা কবে শোনেন। সাক্ষী বলেন, ১২/১৪ বছর আগে। নড়াইলে।
আইনজীবী বলেন, নড়াইলে কথাটি আপনাকে কে বলেছিল। সাক্ষী বলেন, খেয়াল নেই। আইনজীবী বলেন, আপনি যে দেলোয়ার হোসনের নাম শুনেছেন। তিনিই যে বর্তমান সাঈদী এটা যাচাই করেছেন। সাক্ষী বলেন, এই মামলার আগে যাচাই করেছি। সাক্ষী বলেন, একাত্তরে যাদের কাছ থেকে শুনেছিলেন, যাচাইয়ের সময় তাদের কারও সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে। সাক্ষী বলেন, না।