ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

এক রিক্সায় প্রসিকিউটর আরেক রিক্সায় গানম্যান। রাস্তায় বিশাল জ্যাম। জ্যাম পেরিয়ে প্রসিকিউটরকে বহনকারী রিক্সা পৌঁছে গেছে গন্তব্যে। আর অন্য রিক্সাটি তখনো পথে। উদ্বিগ্ন প্রসিকিউটরের ফোন, তুমি কোথায়? ‘স্যার, আমি তো রাস্তায়! জ্যামে আটকে পড়েছি’। প্রায়ই এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের। সরকারি গাড়ি প্রত্যাহার করে নেয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এই অবস্থা। শুধু তাই নয়, তিন মাস ধরে বেতনও পাচ্ছেন না এই প্রসিকিউটররা। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৮ শে মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে প্রসিকিউশন। গ্রেপ্তার করা হয় বিরোধী কয়েকজন রাজনীতিককে।

নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যৌথ সিদ্ধান্তে প্রত্যেক প্রসিকিউটরকে একজন করে গানম্যান দেয়া হয়। কিন্তু দেখা দেয় বিপত্তি। গানম্যান আসবে কিভাবে? পরে স্বরাষ্ট্র, আইন, পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার ও অর্থমন্ত্রণালয় যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, প্রসিকিউটরদের গাড়িও দেয়া হবে। কিছুদিনের মধ্যে গাড়ি বরাদ্দ দেয়া হয়। এর পর দেড় বছরের বেশি সময় ধরে প্রসিকিউটররা গাড়িতে গানম্যান নিয়েই যাতায়াত করছিলেন। কিন্তু গত ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে বলা হতে থাকে গাড়ি প্রত্যাহারের কথা। এরপর হঠাৎ করেই এক চিঠির মাধ্যমে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রভাবশালী কয়েকজন ছাড়া বাকিদের গাড়ি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। প্রসিকিউটররা পড়লেন মহাবিপাকে। গাড়ি ও গানম্যানসহ সরকারি সুবিধা পাওয়ার পর তাদের এতদিনকার ‘দাপট’ ও ‘মর্যাদা’ যেন হঠাৎ করেই উবে গেল। পরিবার-পরিজন ও আদালতপাড়ায় বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয়ে পড়েন তারা। গাড়ি ‘হারিয়ে’ তারা রিক্সায় যাতায়াতে বাধ্য হন। এ অবস্থায় সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় গানম্যানকে নিয়ে। কারণ গাড়ি প্রত্যাহার হলেও গানম্যান প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে অনেক প্রসিকিউটর অফিসে যাচ্ছেন রিক্সায় করে। কিন্তু গানম্যান? তিনি আরেক রিক্সায়। প্রসিকিউটর আগে পৌঁছে গেছেন ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু তখনও আসেনি গানম্যানের রিক্সা। অফিসে পৌছে প্রসিকিউটরের ফোন, তুমি কোথায়? রাস্তায় থাকা গানম্যানের জবাব, স্যার, জ্যামে আটকে গেছি।

এমন ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। গাড়ি প্রত্যাহার করে নেয়ায় গানম্যানের সুবিধাও তাই কাজে আসছে না প্রসিকিউটরদের। আবার কয়েকজন ছাড়া বাকিদের গাড়ি প্রত্যাহারে অপমানবোধও করছেন তারা। আর এর প্রভাব পড়ছে তাদের কাজে। একজন প্রসিকিউটর বলেন, নিরাপত্তা বিবেচনায় আমাদের গাড়ি ও গানম্যান দেয়া হয়েছিল। বিচারের মধ্য পর্যায়ে এসে সেই প্রয়োজন কি এখন ফুরিয়ে গেছে? তাহলে বিশেষ কয়েকজনের গাড়ির সুবিধা এখনো কেন বহাল? অন্যদের ক্ষেত্রে তা কেন প্রত্যাহার করা হল? তিনি বলেন, পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আইন মন্ত্রণালয় এককভাবে বাতিল করেছে। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের ১৪ জন প্রসিকিউটরের মধ্যে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, সৈয়দ রেজাউর রহমান, সৈয়দ হায়দার আলী, জেয়াদ আল মালুম ও রানা দাশ গুপ্তের এখনো গাড়ি রয়েছে। অন্যদের গাড়ি প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্য এক প্রসিকিউটর বলেন, আমি কয়েক মাস আগে জয়েন্ট করেছি। যেদিন জয়েন্ট করেছি সেদিনই গাড়ি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো পাইনি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কয়েকবার জানিয়েছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। রিক্সায় আসা যাওয়া করি। এখন আমার নিরাপত্তা কোথায়? এখন মনে হচ্ছে এখানে এসে ভুল করলাম কিনা? এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে ফোনে জিজ্ঞেস করলে তিনি কথা বলার জন্য ফোনটি প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমকে ধরিয়ে দেন। মালুম বলেন, এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারবো না। আইন মন্ত্রণালয় ভাল বলতে পারবে। তাদেরই জিজ্ঞেস করুন।

বেতন বন্ধ তিন মাস: গত তিন মাস ধরে বেতনও পাচ্ছেন না প্রসিকিউটররা। এর ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবতের জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের। অনেকে গ্রামের বাড়ির জায়গা-জমি, গাছ ইত্যাদি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও মুখ বুজে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন প্রসিকিউটররা। এসব নিয়ে প্রকাশ্যে কোন মন্তব্যও করতে রাজি হননি কেউ। দু’একজন যারা বলেছেন, তারাও বলেছেন, ‘অফ দ্যা রেকর্ড।’ একজন প্রসিকিউটর বলছিলেন, প্রসিকিউশনের ১৪ জন সদস্য ডিসেম্বর থেকে বেতন পাচ্ছি না। আমরা কিভাবে চলছি। আমাদের তো সংসার আছে। ছেলে-মেয়েদের কাছে মুখ দেখাতে পারি না। আরেক প্রসিকিউটর বলেন, সারা মাসে পাই মাত্র ৬৫ হাজার টাকা। এর চেয়ে হাইকোর্টের বারান্দায় ঘুরলেও বেশি পাওয়া যায়। তাও আবার তিন মাস বন্ধ।

***
প্রকাশিত হয়েছে: মানবজমিন, শুক্রবার, ১৬ মার্চ ২০১২