ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী হাজির করতে একের পর এক ব্যর্থতার কারণে সর্বশেষ একটি সুযোগ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। গত ৭ই মার্চ দেয়া ওই সুযোগে বলা হয়েছিল, ১৮ই মার্চও সাক্ষী আনতে না পারলে যথাযথ আদেশ দেয়া হবে। সে হিসেবে সবার মধ্যেই কৌতূহল ছিল গতকালের দিনটি নিয়ে। কি হতে পারে? প্রসিকিউশন কি সাক্ষী আনতে পারবে এদিন? নাকি পুরনো ‘অভ্যাস’-এর ধারাবাহিকতা- ‘সময় প্রয়োজন। চেষ্টা করছি’। দুপুরের বিরতির পরে বেলা ২টা ১০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এজলাস গ্রহণ করে। সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালে আনা হলেও ডকে তোলা হয়নি। তিনি ছিলেন হাজতখানায়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক আসনে থাকা প্রসিকিউটরকে বলেন, হায়দার সাহেব, আসেন দেখি। একটু ডকে আসেন। সৈয়দ হায়দার আলী ডায়াসের সামনে যান। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, কি করতে চাইছেন? প্রসিকিউটর বলেন, আজ তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেবেন। তিনি ছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের হাতে কোন সাক্ষী নেই। তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের পরে অন্য সাক্ষীরাও যাতে পরে সাক্ষ্য দিতে পারেন সে পথ খোলা রাখার আবেদন করেন তিনি। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, সেটা কি ডিফেন্স মানবে? সাধারণভাবে তদন্ত কর্মকর্তা তো সবার শেষে সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্যের পরে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম ক্লোজ হয়। আপনারা কি করতে চাইছেন সেটা বলুন। প্রসিকিউটর বলেন, আমরা চাইছি আজ তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেবেন। অন্য সাক্ষী পরে আনা হবে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিলে সাক্ষ্যগ্রহণ ক্লোজ হয়ে যায়। তিনি তো সর্বশেষ সাক্ষী। প্রসিকিউটর বলেন, সেটা হতে পারে না। তদন্ত কর্মকর্তার পরে আর কোন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে পারবে না- এ নিয়ম আর এখন নেই। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের একটি মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষীদের আগে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। এখানেও সে ধরনের কিছু হতে পারে। আমরা সাক্ষ্যগ্রহণ ক্লোজ করার আগে একটা দরখাস্ত দিয়ে জানাবো। ট্রাইব্যুনাল এবং ডিফেন্সকে সেই দরখাস্ত দেবো। এ পর্যায়ে আসামির আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, শনিবার উনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি বললাম, সাক্ষী আসবে? উনি বললেন, তদন্ত কর্মকর্তার জন্য প্রস্তুত থাকুন। সেই হিসেবে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি। আমরা ধরেই নিয়েছি তদন্ত কর্মকর্তাই হবেন সর্বশেষ সাক্ষী। সাধারণভাবে আমরা জানি, তদন্ত কর্মকর্তা সব সাক্ষীর পরে সাক্ষ্য দেন। তিনি সাক্ষ্য দিলে সাক্ষ্যগ্রহণ ক্লোজ হয়ে যায়। এরশাদের ওই মামলা বিশেষ ব্যতিক্রম। সেই দৃষ্টান্ত এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। প্রসিকিউশনের মোট সাক্ষী ১৩২ জন। তারা মূল ৬৮ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৮ জন সাক্ষী এনেছে। এই মূল তালিকা থেকে ৫০ জন সাক্ষীই তারা এখনও হাজির করতে পারেনি। তাই এখন তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের পরে আরও সাক্ষী আনলে, সে ক্ষেত্রে আমাদের সিরিয়াস আপত্তি আছে। তারা সাক্ষ্যগ্রহণ ক্লোজ করতে চায় কিনা সেটা আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার। প্রথমে ওনাদের বলতে হবে তারা সাক্ষ্যগ্রহণ ক্লোজ করতে চায় কিনা। আজ তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ ক্লোজ করতে চাইলে সেটা ভিন্ন কথা। অন্য সাক্ষী পরে আসবে, এই অপশন খোলা রেখে তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করার কোন সুযোগ বা যৌক্তিকতা নেই। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে তিনি প্রসিকিউটরকে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেয়ার আগে আপনারা কি চিন্তা করছেন সেটা আমাদের জানান। তদন্ত কর্মকর্তার পরে আর কোন সাক্ষী আনবেন কিনা, আনলে কতজন আনবেন, কাদের আনবেন- এসব বিষয় আমাদের জানাতে হবে। তারপরে আমরা অর্ডার দেবো। পরে অন্য কিছু। প্রসিকিউটর বলেন, এটা তো আমার বন্ধুর (মিজানুল ইসলাম) কথার মতো হয়ে গেল। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, তাই যদি হয়, তো তাই। পরে ট্রাইব্যুনাল অর্ডার দেয়। অর্ডারে জানানো হয়, আগামীকাল প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে দরখাস্ত দিয়ে জানাবে, তারা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ক্লোজ করবেন কিনা, তদন্ত কর্মকর্তার পরে সাক্ষী হাজির করবেন কিনা। একই সঙ্গে আগামী ২৩শে মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়। পরে মিজানুল ইসলাম বলেন, মাই লর্ড। আপনি এর আগের তারিখে বলেছিলেন, ১৮ই মার্চ সাক্ষী হাজির করতে না পারলে যথাযথ আদেশ দেবেন। আমার মনে হয়, প্রসিকিউশন এই ‘যথাযথ আদেশ’ এড়ানোর জন্যই আজ তদন্ত কর্মকর্তাকে সাক্ষী হিসেবে এনেছে। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, তা হয়তো নয়।

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গত ৭ই ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওইদিন সাক্ষ্য দেন মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার। এরপর একে একে সাক্ষ্য দেন রুহুল আমিন নবীন থেকে শুরু করে সাইফ হাফিজুর রহমান পর্যন্ত ২৭ জন। এদের মধ্যে ৯জন জব্দ তালিকার। এ পর্যন্ত আসতে বেশ কয়েকটি নির্ধারিত তারিখ ডিঙিয়েছে প্রসিকিউশন। সাক্ষী আনতে পারেনি। ট্রাইব্যুনালের ক্ষোভ, ভর্ৎসনা, বিরক্তি ও অসন্তোষের মুখে পড়েছেন তারা। ট্রাইব্যুনাল এও বলেছে, এটি আপনাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সাক্ষী হাজির করতে না পারার কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময় প্রসিকিউশন সাক্ষীদের অসুস্থতা, রাস্তায় জ্যাম, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া, এই মাত্র ঢাকায় এসে পৌঁছানো, সাক্ষীর মায়ের মৃত্যু ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে।

আবারো পড়তে দেখুন: