ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

গ্রেপ্তারের ৪৭৫ দিন পর বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্যের। গতকাল বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এতে আসামির বিরুদ্ধে একাত্তরে তিন শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা, ৫টি ধর্ষণ, ৬টির বেশি গণহত্যাসহ ২৩টি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার আনুষ্ঠানিকতা পেলো বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের অভিমত। আগামী ২৯শে এপ্রিল প্রসিকিউশনের উদ্বোধনী বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে। ওই সময়ের মধ্যে আসামিপক্ষকে তাদের সাক্ষীর তালিকা ও প্রাসঙ্গিক নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়, সালাহউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ থেকে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টের ৩(২), ৪(১) এবং ৪(২) ধারায় উল্লিখিত অপরাধ করেছেন। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক লিখিত আদেশ দেন। তিনি অভিযোগ গঠনের আদেশ দিতে গিয়ে আসামির বিরুদ্ধে একে একে ২৩টি অভিযোগ পড়ে শোনান। এ সময় জনাকীর্ণ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আদেশের পরে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, মি. চৌধুরী। আপনি কি চার্জগুলো শুনেছেন এবং বুঝেছেন? সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, না। শুনিনি। আমাকে পড়ে শোনাতে হবে। এ সময় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ পড়ে শোনানো হয়েছে, তাই তিনি বিষয়টি শুনতে এবং বুঝতে পেরেছেন বলে ধরে নেয়া হলো। পরে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি দোষী, না নির্দোষ? সালাহউদ্দিন কাদের পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, কেন? কোন অপরাধে? তিনি বলেন, আমি তো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তাই এ বিষয়ে কোন কথা বলবো না। আদেশের পরে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, মি. চেয়ারম্যান। আমার কয়েকটি আবেদন আছে। সেগুলো শেষ করলে হতো না? ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, হ্যাঁ। এখনই করবো। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, হ্যাঁ। একটু পানিটানি খেয়ে নিন। আমার স্ত্রীকে গালাগালি করেছেন। আর একটু পানিটানি খাবেন না? ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, হ্যাঁ। এ সময় আসামির পক্ষে শুনানি করেন ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাই লর্ড। আমরা দেখেছি, আপনি আমাদের সিরিয়াস ম্যাটারগুলোতেও হাসেন। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, সেন্স অব হিউমার থাকতে হবে। আপনি হাসেন, এটা আমার খুব ভাল লাগে। আপনি যে অবজ্ঞাভরে হাসেন, এটা আরও বেশি ভাল লাগে। এ সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেই মামলা লড়তে চান। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তাতে আপত্তি জানায়। বলে, আপনি আইনজীবী নিয়োগ করেছেন। তাই নিজের পক্ষে মামলা লড়ার অধিকার হারিয়েছেন। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ১৭(২) ধারায় বলা আছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেও মামলা লড়তে পারবেন এবং আইনজীবীও নিয়োগ করতে পারবেন। এখানে বলা নেই যে, একটা করলে আরেকটা করা যাবে না। তিনি বলেন, আমাকে অন্য আসামিদের মতো মনে করবেন না। আমি ছয় বারের এমপি। আপনি আমার স্ত্রীকেও গালাগালি করেছেন। একটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা জাতির পিতাকে একদিন ‘জুতার ফিতা’ এবং আবার একদিন জাতির পিতা বলতে বলতে মুখে ফেনা তৈরি করে ফেলে; সেই রাজনীতিবিদদের কি বলবেন? সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, আপনি বলেছেন, এটা সাংবিধানিক কোর্ট নয়। অথচ সাংবিধানিক বিষয়ে আপনি দু’টো বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন। সেটা কিভাবে করলেন? পরে নিজের পক্ষে সালাহউদ্দিন কাদেরের মামলা লড়ার আবেদনটি খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল। ফখরুল ইসলাম শুনানিতে বলেন, মাই লর্ড। আপনি অভিযোগ গঠনের যে আদেশ দিয়েছেন, তাতে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, প্রসিকিউশন যেসব যুক্তি তুলে ধরেনি, আপনার আদেশে তা-ও প্রসিকিউশনের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে আসামি পক্ষকে রিভিউ আবেদন করার পরামর্শ দেয়।

যত অভিযোগ: সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ। এসবের মধ্যে ২৩টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে আসামিকে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, একাত্তরের ৪ অথবা ৫ই এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে সালাহউদ্দিন কাদেরের সাঙ্গপাঙ্গরা চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার রামজয় মহাজন লেনের বাসিন্দা মতিলাল চৌধুরী, শান্তি কুসুম, সুনীলসহ আরও সাতজনকে ধরে গুডসহিল-এ নিয়ে যায়। এর মধ্যে মতিলাল চৌধুরীর কর্মচারী সুনীলকে নির্যাতনের পর মারাত্মক আহত অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু মতিলাল, শান্তি কুসুমসহ বাকি ছয়জনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। পরে তাদের লাশ গুম করা হয়। ওই বছরের ১৩ই এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্য গহিরা এলাকার লোকজনকে ধরে এনে ডা. মাখন লাল শর্মার বাড়িতে জড়ো করা হয়। এখানে মাখন লাল, পঞ্চবালা শর্মাসহ ৫ জনকে হত্যা করা হয়। আসামির উপস্থিতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ হত্যাকাণ্ড চালায়। ওইদিন একই এলাকার কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহকে ধরে এনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা নির্যাতন করে। পরে আসামির গুলিতে তার মৃত্যু হয়। আসামির সহযোগী আবু মাবুদসহ দুই ব্যক্তি ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল রাউজানের মধ্য গহিরার জগৎমল্ল পাড়ায় কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়িতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের জড়ো করে। শান্তি কমিটির সভার জন্য সেখানে তাদের জড়ো করা হয়। শান্তি কমিটির সভায় যোগ দিলে জীবন বাঁচতে পারে- এ আশায় তারা যোগ দেন ওই সভায়। পরে বিষয়টি সালাহউদ্দিন কাদেরকে জানানো হয়। কিছুক্ষণ পর সালাহউদ্দিন কাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে হাজির হন। পরে পাকিস্তান বাহিনীর ব্রাশফায়ারে ঘটনাস্থলেই ৩২ জন নিহত হন। এদের মধ্যে তেজেন্দ্র লাল নন্দী, সমির কান্তি চৌধুরী, কিরণ বিকাশ চৌধুরীও রয়েছেন। কয়েকদিন পর নিহতদের ওই বাড়ির উঠানেই গণকবর দেয়া হয়। একইদিন বেলা ১টার দিকে রাউজানের সুলতানপুরের বণিকপাড়ায় সালাহউদ্দিন কাদেরের উপস্থিতিতে নেপাল চন্দ্র ধরসহ চারজনকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ এলাকায় থাকবে কি থাকবে না, এমন অবস্থার মধ্যে রাউজানের উনসত্তরপাড়ায় ক্ষিতিশ চন্দ্র মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়ে ১৩ এপ্রিল ডাকা হয় শান্তি কমিটির সভা। এলাকার লোকজন সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর সালাহ উদ্দিন কাদেরসহ পাকিস্তান বাহিনী সেখানে হাজির হয়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ব্রাশফায়ার করে। এতে চরণ পাল, মনতোষ মালী, বাবুল মালীসহ ৭০ জনের বেশি ব্যক্তি নিহত হয়। হত্যার পর সেখানেই নিহতদের গণকবর দেয়া হয়। ওই বছরের ১৪ই এপ্রিল রাউজান পৌরসভা এলাকার সতীশ চন্দ্র পালিতকে তার ঘরের মধ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ওই বছরের ১৭ই এপ্রিল চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কের হাটহাজারি বাসস্ট্যান্ড থেকে ধরে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে হত্যা করা হয়। ওই বছরের মধ্য এপ্রিলে রাউজান থানার কদুরখিল হিন্দুপাড়ার শান্তি দেবকে সালাহউদ্দিন কাদেরের নির্দেশে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। রাউজানের ডাবুয়া গ্রামের মানিক ধরের বাড়িসহ ওই এলাকার হিন্দুদের বাড়িতে সালাহউদ্দিন কাদেরের উপস্থিতিতে লুটপাট চালানো হয়। ওই বছরের ২২ এপ্রিল রাউজানের শাকপুরা গ্রামে ফয়েজ আহমেদ, আলাল আহমেদ, আহাম্মদ ছফা, নিকুঞ্জ শীলসহ অনেককে হত্যা করা হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। রাউজানের জগৎমল্লপাড়ায় বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী, হরেন্দ্র লাল চৌধুরীসহ চারজনকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা করে। ১০ই মে ঘাসি মাঝিরপাড় এলাকায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নুরুল আলম, আয়েশা খাতুন, জানে আলম ও আবুল কালামকে হত্যা করে। সেখান থেকে সালাহউদ্দিন কাদেরের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা ৫ মহিলাকে ধরে নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। সেখানে ওই মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়। ২০শে এপ্রিল রাউজানের কর্তার দিঘীরপাড় এলাকার মো. হানিফকে অপহরণ করে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। ৭ই জুন ওমর ফারুক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। ১৫ই জুলাই চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার হাজারী লেনের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বাড়ি থেকে নিজামউদ্দিনসহ ৭জনকে ধরে নিয়ে গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ১৩ই জুলাই শিকারপুর ইউপি চেয়ারম্যান শামসুদ্দিনেক ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ২৭ই জুলাই বোয়াল খালীর এখলাস মিয়াকে ধরে নিয়ে গুডসহিলে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। ফজলুল হক চৌধুরী নামের এক ইউপি চেয়ারম্যানকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়া হয়। এসব ছাড়াও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরো চারটি নির্যাতনের ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

‘এম কে আনোয়ারের বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত’: ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা করে বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ারের দেয়া বক্তব্যকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করা হয়েছে। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ মন্তব্য করেছে। সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনাল জঙ্গলের শাসনের চেয়েও খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার এই বক্তব্য পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বিষয়টি গতকাল ট্রাইব্যুনালের নজরে আনেন। ওই সংবাদে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদেরের বক্তব্যও ছিল। সকালে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এম কে আনোয়ার সাহেবরা মনে করছেন, এখানে ন্যায়বিচার হচ্ছে না। এসময় ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে বিরতির পরে আদেশ দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান আসামিপক্ষের আইনজীবী মুন্সি আহসান কবিরকে বলেন, মি. আহসান। বক্তৃতা দেয়া যায়। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে, আইন সম্পর্কে বলতে গেলে আগে আইন সম্পর্কে জানতে হবে। এসময় আসামি পক্ষের আরেক আইনজীবী ফখরুল ইসলাম বলেন, মাই লর্ড। এ ধরনের বক্তব্য আরও অনেকেই দিয়েছেন। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা অহরহ কথা বলছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। তাদের ব্যাপারেও আদেশ দিতে হবে। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, কি আদেশ দেবো তা কি আপনার কাছ থেকে জানতে হবে? আপনি বসুন। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমি বিশ্বাস করি, দ্য লেডি এখানে উপস্থিত আছেন। তিনি পত্রপত্রিকায় কি বলেছেন, তা আমরা দেখেছি। তিনি কি আইনটি পড়েছেন? তিনি কি দেখেছেন, এখানে তার স্বামীর প্রতি কোন অবিচার হয়েছে কিনা? সালাউদ্দিন কাদের বলেন, আমি তার স্বামী তো এখানে উপস্থিত আছি। আপনি আমার স্ত্রী সম্পর্কে কথা বললে আমিও আপনার স্ত্রী সম্পর্কে কথা বলবো। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানকে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আপনার নিরপেক্ষতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে কি দোষ দেয়া যায়? দুপুরের বিরতির পর প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ট্রাইব্যুনালে বলেন, ট্রাইব্যুনাল অনেক বিষয়েই উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অনেকেই আইন না জেনে, ট্রাইব্যুনালকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন। ট্রাইব্যুনালের একটি আইনসম্মত আদেশ নিয়ে জনগণের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এটি বিচার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার নামান্তর। এম কে আনোয়ার সাহেব যা বলেছেন, তা কি তিনি বলতে পারেন? তাই বিচারের স্বার্থে, ট্রাইব্যুনালের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করছি। এসময় কাঠগড়ায় উপস্থিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রসিকতা করে বলেন, জেলে দিয়ে দেন! ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, এই জন্যই বলি, যারা এসব কথা বলেন, তারা যেন ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ১৯(২) ধারা দেখে বলেন। এম কে আনোয়ার সাহেব তো ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তিনি একটি লিডিং পলিটিক্যাল পার্টির লিডার। পার্লামেন্টে ল’ মেকার। তাকে তো আমরা জ্ঞানী ও জানাশোনা লোক মনে করতাম। তিনি তো ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, আমার মনে হয়, তিনি এখনও সিআরপিসির বাইরে যেতে পারছেন না। প্রসিকিউটর বলেন, তিনি এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে এসে বলুন। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, স্যার, জেলে দিয়ে দেন! আমার সঙ্গে থাকুক! ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, আইনের সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু আমরা দেখছি তিনি কিভাবে সমালোচনা করছেন? তিনি ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে এ কথা বলতে পারেন কিনা? সালাউদ্দিন কাদের বলেন, এই সমালোচনার জন্য তো ট্রাইব্যুনাল অবমাননা হয় না। তিনি আরও বলেন, আইনের সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ট্রাইব্যুনালেরও? আইনকে জংলি বলা যেতে পারে। আইন জংলি হতে পারে। কিন্তু তাই বলে, সেই আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালকেও জংলি বলা যাবে? ট্রাইব্যুনাল জংলি হয় কিভাবে? ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়, এম কে আনোয়ার একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। আইনের জ্ঞান তার আছে। তিনি একজন মন্ত্রী ছিলেন। একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে তার মন্তব্যটি সঠিক নয়। আমাদের মনে হয়, তিনি সিআরপিসির বাইরে যেতে পারেননি। কারণ এখানে সিআরপিসি ও সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য নয়। আদেশে আরও বলা হয়, যে কেউ আইনের সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু তা যথাযথভাবে এবং আইন অনুসারে। আমরা আশা করি, তিনিসহ জনগণ আমাদের সহযোগিতা করবেন। আমরা ন্যায় বিচার করতে চাই। ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে তার বক্তব্যটি অনাকাঙ্ক্ষিত। আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হয়। আদেশের পর সালাউদ্দিন কাদের বলেন, এটা তো ঠিক হলো না! কম হয়ে গেল! ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের ট্র্যাডিশন ভঙ্গ হলো। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, আপনি যা বলেন, চৌধুরী সাহেব, আমরা কিন্তু এনজয় করি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমিও কিন্তু এনজয় করি!

২০১০ সালের ১৬ই ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। এর আগে ২৬শে জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলায়ই গ্রেপ্তার করে ১৯শে ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাকে। গত ১৪ই নভেম্বর তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। ১৮ই নভেম্বর আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করে। ৫৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে এক হাজার ২৭৫ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক নথিপত্র এবং ১৮টি সিডি ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। গত ১৫ই জানুয়ারি ৯ ধরনের ৭৭টি অভিযোগ উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। ওই দিনই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়া হয়।


মানবজমিন, বৃহস্পতিবার, ০৫ এপ্রিল ২০১২