ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

মিছিলে মিছিলে যখন বাংলাদেশ জাগ্রত, ৪২ বছরের পুরনো কলংক যখন মুছতে দলমত নির্বিশেষে এদেশের মানুষ দাড়িয়েছে, তখন দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির কি করণীয় তা নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষন আছে। বিএনপির জন্ম বা দলটির বিকাশ এবং বড়ো হয়ে বর্তমান পর্যায়ে আসা এ ইতিহাসে অনেক প্রশ্নই রয়েছে। প্রমানিত সত্য, প্রত্যক্ষভাবেই এ দলটি স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্রয় দিয়েছে। তবু একটি কথা বিএনপির নীতি নির্ধারকরা সহজভাবে এখন সহজ ভাবেই বুঝতে পারছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং শাস্তি এখন আপামর জনতার দাবী। এ জনতাকে শুধু মুক্তিযোদ্ধা বা এদের পরিবার পরিজন বলে বিভাজিত করার উপায় নেই। বিএনপির যুদ্ধাপরাধীদের অংশটি মূল দলের কোন বড় অংশ নয়। আওয়ামী লীগেও যুদ্ধাপরাধীদের নূন্যতম একটি অংশ কিন্তু রয়েছে। সেসব বিতর্ক তুলে এখন বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক প্রজন্মকে যে বিভাজিত করার আর যে উপায় নেই, এটি কিন্তু চরম সত্য।

মূল সত্য আরও একটি, আওয়ামী লীগ নব প্রজন্মের চাহিদার প্রয়োজন পূরন করতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। এ বিচারকে জাতীয় দাবীতে পরিণত কিন্তু আওয়ামী লীগ করেনি। করেছে তরুন প্রজন্ম। সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। অনেক কষ্ট করেছেন এরা, ৮৪-৮৬’ এর দিকেও দেখেছি, যুদ্ধাপরাধেিদর বিচার নিয়ে আন্দোলন করতে কত কষ্ট করেছেন এরা। আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে যেসব হিসাব নিকাশ চলে, তাতে আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে এদের নিয়ে কুন্ঠিত বা ক্ষুব্ধও ছিল। কিন্তু তারপরেও এই চরম সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, আওয়ামী লীগই সেই দল যারা এই সত্য বুঝে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে আমরা এই বিচার দেখতে পারতাম না। শুধু তাই নয়, এর ক্রেডিট কিন্তু আওয়ামী লীগের চেয়েও শেখ হাসিনার বেশি। তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে না থাকলে দলটি কখনোই এ বিচার করতো না। দলের নেতারা নানা রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ করে এ নিয়েও ১০/১২ মতবাদে ভাগ হতেন। এর ক্রেডিট তাকে দিতেই হবে। বঙ্গবন্ধু যে কারনে পারেননি, শেখ হাসিনা সেই কারণ মাথায়ও রাখেননি। এতে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার একটা অভিযোগ আওয়ামী লীগ বা তার বিরুদ্ধে করা হয়। কিন্তু ফায়দাটা কি আমি বুঝি না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামায়াত রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল হলে আওয়ামী লীগের কি লাভ? এদের ভোট কি আওয়ামী লীগের বাক্সে পড়বে? অসম্ভব।

বরং এ জুজুর ভয় দেখিয়ে বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে জামায়াত। এতে জামায়াতের একটি ভোটও কমবে না, কমবে বিএনপি’র। জামায়াত যা আছে তাই, বরং বিএনপি’র কারনে তারা বাংলাদেশে পুনরায় জায়গা পেয়েছে। আর যুদ্ধাপরাধী জামায়াত দেশের তরুন প্রজন্মর একটি অংশকে পাকিস্তানপন্থী করে তুলতে পেরেছে। যেটা হয়তো সম্ভব হত না। উগ্্র ডানপন্থী ঘরানার কোন রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধ উত্তর বাংলাদেশে থাকার কথা নয়। ডানপন্থী ঘরানার নতুন দল হতে পারতো, স্বাধীন বাংলাদেশকে ধারন করে, সেটা হয়নি। বরং এই দেশে, স্বাধীন একটি দেশে, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা রাজনীতিতে আবার কখনোই সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। বঙ্গবন্ধু মাফ করেছেন। যারা ধর্ষণ করেছে, খানসেনাদের তার গ্রামের বধূবনিতাদের তুলে দিয়েছে, গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, শত শত মানুষকে শুধু জমি দখলের লোভে জীবন্ত পুড়িয়ে দিয়েছে, তাদের বঙ্গবন্ধু কেন, আল্লাহ পর্যন্ত মাফ করতে পারেন না। জামায়াতের ওই সময়ের রাজনীতিকদের আর কোন রাজনৈতিক ভবিষ্যত থাকারই কথা নয়। তাদের খন্দকার মুশতাকের মত নীরবে নিভৃতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার কথা, তা হয়নি। কেন?

হয়নি জিয়া –এরশাদের জন্যে। জিয়া-এরশাদের সামরিক ছাউনিতে তৈরি বিএনপি জাতীয় পার্টির জন্যে। দেশকে বিভক্ত করার বীজ, তরুন প্রজন্মের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ এবং এর দায় সম্পূর্নতঃ বিএনপি’র। আওয়ামী লীগ আর্ন্তজাতিক চক্রান্তে নীবীর্য হতে বাধ্য হয়েছিল, দোষ তাদের ভিতরেও ছিল, কিন্তু আজ যে নিজামী-কাদের মোল্লা- –সাকা চৌধুরী- অশিক্ষিত দেলোয়ার সাইদীরা মুক্তিযুদ্ধ উত্তর তরুনদের নেতা হতে পেরেছে, তার দায় কিন্তু বিএনপি’র।

ভোটের হিসাবে বিএনপি জামায়াতকে হাতে রেখেছে ভাবছে, জামায়াতই তাদের ব্যবহার করছে। জামায়াতের উত্থানে বিএনপি শংকিত হয়নি, এ ধরনের দলগুলোর সমস্যা এখানেই। এরা দলকে যত ভালবাসে, তার চেয়ে বেশি ভালবাসে নিজেকে, যে কারণে এসব দলে দেশপ্রেমের অভাব খুব বেশি।

তবে দলমত নির্বিশেষে এদেশের মানুষ যে এখনও দেশপ্রেমিক, তার প্রমান এই গণজাগরন। শাহবাগ স্কয়ারে যে প্রানের জোয়ার তাতে অনেক কিছু শেখার আছে। এ জোয়ার থেকে বিএনপির শেখা উচিত। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শেষ দিকে এরকম হঠাৎ করেই উত্তাল হয়েছিল দেশ। বিএনপি’র এখন বোঝা উচিত যে এদের মধ্যে একটা বড়ো অংশই কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থক নয়। তারা উদার আধুনিক ডানপন্থী। এরা যেমন মসজিদে নামাজ পড়ে, তেমনি পহেলা ফালগুনে বাসন্তী রঙয়ের শাড়ী পড়ে। এরা বিএনপির ভোটার। এ অভূতপূর্ব জনতা কিন্তু যুদ্ধাপরাধেিদর বিচার নিয়ে মোটেও বিভ্রান্ত নয়। দ্বিধান্বিত বরং বিএনপির মধ্য সারির কর্মীরা। এদেরও সমর্থন এ আন্দোলনে। তারা অংশ নিতে পারছে না। এ আন্দোলন বিএনপিকে একমুখী রাস্তার মাথায় ঠেলে দিয়েছে। এখন বিএনপির উচিত, জামায়াতকে ত্যাগ করা, অথবা জামায়াতকে সব যুদ্ধাপরাধীদের দল থেকে বাদ দিতে বলা। এতে বিএনপি জাতীয় ঐক্যের এই স্মরনীয় মূহুর্তে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সমর্থ হতে পারে। নয়তো আগামী নির্বাচন বিএনপির জন্যে খুব সুখকর হবে না বলেই মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগ পর্দার আড়ালে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করেছে কিনা জানি না। তবে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবে না। জামায়াতকে চেপে ধরে এখন যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত দল গঠন করার কথা বলা উচিত বিএনপি’র। বিএনপি এরকম প্রস্তাব দিলে আওয়ামী লীগের কথিত সমঝোতার প্রক্রিয়া ভেস্তে যাবে। তাছাড়া বিএনপিকে এটা করা উচিত কারণ তারাই এ সকল যুদ্ধাপরাধীদের জামায়াত নামে বাংলাদেশে রাজনীতির সুযোগ করে দিয়েছে। যারা ফাসিতে না চড়লেও এতদিনে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে থাকার কথা।

* বিএনপির জামায়াতকে বলা উচিত, স্বাধীনতা যুদ্ধের ভূমিকার জন্যে সরাসরি ক্ষমা চাইতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে পূর্ণ সমর্থন দিতে। একই সঙ্গে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দল থেকে অব্যাহতি দিতে। তাহলেই একমাত্র বিএনপি আগামী নির্বাচনে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে।

* সাকা চৌধুরী বিএনপির জন্যে সবসময়েই বোঝা ছিল। শুধুমাত্র এরকম পরীক্ষিত যুদ্ধাপরাধীদের জন্যে বিএনপির এ বিচারপ্রক্রিয়াকে অস্বচ্ছ বলে নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার দরকার নেই। বরং বিএনপির এ মূহুর্তে বোঝা উচিত যে, দেশের মানুষ এ বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ বলেই মনে করে। শাহবাগের জনতার জোয়ার এর প্রমাণ। বিএনপির বলা উচিত, তারাও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চায়। ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতায় গেলে এ বিচার চালিয়ে যাবে। নিজ দলের তো বটেই, অন্য সব দলের যুদ্ধাপরাধীদের ফাসি দেবে। বরং রক্ষীবাহিনী, জাসদ কাহিনী, শেয়ার- হলমার্ক কেলেংকারি নিয়ে বিবৃতিতে বালসুলভ উল্লেখ না করে স্বাধীনতা যুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধকে জাতীয় আবেগ হিসেবে মূল্যায়িত করা উচিত। কারণ তরুন প্রজন্ম স্বাধীনতার সঙ্গে অন্যসব মিলিয়ে দেখতে চায় না। কারণ বুড়ো ধামড়াদের জন্য অন্য পরিচয় থাকলেও এ প্রজন্ম স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচয়েই গর্বিত।

* স্বাধীন বাংলাদেশ না হলে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান কেউই তৈরি হতেন না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় শ্রেণীর সামরিক কর্মকর্তা হিসেবেই থাকতেন তিনি। এ সত্য মাথায় রেখে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে মেনে নেয়া উচিত বিএনপির। একই ভাবে আওয়ামী লীগের উচিত, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়ায় জিয়াকে সম্মান দেখানো। তবে এ ব্যাপারে বিএনপিকে এগিয়ে আসতে হবে কারণ স্বাধীনতার ঘোষনার পাঠক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বড় দেখানোর ইতিহাস বিকৃতির যুগ যুগ ধরে চর্চা বিএনপি করেছে।