ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি: সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক জীবনের শুরু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এবং ১৯৬৬ সালে বুয়েটে শেরে বাংলা হলের নির্বাচিত সহ-সভাপতি হিসেবে। প্রথম জীবনে তিনি তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (হক-তোয়াহা) সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্ত হক-তোয়াহার রাজনৈতিক লাইনকে ভুল আখ্যায়িত করে তিনি সে পার্টি ত্যাগ করে, ১৯৬৭ সালে ঢাকার মালিবাগে “মাওসেতুং চিন্তাধারার গবেষনা কেন্দ্র” স্থাপন করে মাওসেতুং তথা মার্কসীয় দর্শন অধ্যয়নের একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। সে সময়ে দেশের অন্য কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা এ ধরনের গবেষনা কে টেস্টটিউব গবেষনা বলে বিদ্রুপ করতেন এবং সিরাজ সিকদারের দানা বেধে উঠা পার্টি প্রক্রিয়াকে টিটি (টেস্ট টিউব) বলে অভিহিত করতেন। মজার তথ্য হলো, সে কেন্দ্রটি তৎকালীন তথাকথিত জামাতদের চাপে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করে দেয়। তথাকথিত জামাতিরা তাদের শত্রু চিনতে ভুল করেনি। (সুত্র: বাংলাপেডিয়া: সিরাজ সিকদার)। সৈয়দ আবুল মকসুদকেও সিরাজ সিকদার একথা বলেছিলেন বলে মকসুদ একটি নিয়মিত কলামে উল্লেখ করেছিলেন।

রাজনৈতিক কার্যকলাপ: কিন্তু সিরাজ সিকদার সে সময়ে সঠিকভাবে মার্কসীয় আলোকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে প্রথম দলিল প্রকাশ করে বামপন্থী মহলের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। আগ্রহী ও অগ্রসর পাঠকেরা ইংরেজীতে অনুদিত তার দলিলটি পড়তে পারেন।

১৯৬৮’র ৮ই জানুয়ারী সিরাজ সিকদার পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির মূল প্রস্তুতি সংগঠন পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৮ সালেই সিরাজ সিকদার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানের উপনিবেশ এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে জাতীয় গনতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে একটি স্বাধীন, প্রগতিশীল এবং সমাজতান্ত্রিক পুর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। (সিরাজ সিকদারের দলিল)। এই সালেই তাঁর পার্টির গেরিলারা ঢাকাতে জাতীয় পূনর্গঠন কেন্দ্রে (NBR), পাকিস্তান কাউন্সিলে এবং আমেরিকান তথ্যকেন্রে বোমা আক্রমন চালিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। ১৯৬৯ সালে পুর্ব বাংলার ছাত্র-গন আন্দোলনে শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীদের সাহসী ভুমিকা বামপন্থী মহলে প্রশংসা অর্জন করে।

১৯৭০ সালের ৩রা ডিসেম্বর পল্টনে মওলানা ভাসানীর জনসভায় পুর্ব বাংলার জাতীয় গনতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার আহ্বান সংবলিত লিফলেট এবং ভবিষ্যতে স্বাধীন পুর্ব বাংলার পতাকা বিতরন করে। সে পতাকাটি, সিরাজ সিকদারের অনুসারীদের ভাষায়, এখনকার বাংলাদেশের পতাকা যার ডিজাইন করেছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কর্মী অবাঙ্গালী আজমী (সুত্র: এই ব্লগে)। [আমিও সে লিফলেট ও পতাকা দেখেছি, তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছিনা।]

স্বাধীনতা যুদ্ধ ও সিরাজ সিকদার: ১৯৭০ সালের শেষের দিকে সিরাজ সিকদার তাঁর কেন্দ্রীয় কার্যালয় বরিশালের পেয়ারা বাগানে স্থানান্তর করেন এবং একটি বাহিনী গড়ে তুলতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭১ সালের ৩রা জুন সিরাজ সিকদার আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ, একটি পূর্নাঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টি, পুর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। অতিদ্রুত সেই বাহিনী বরিশাল, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ সহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিকাশিত হয়ে পাকিস্তানীদের দুঃশ্চিন্তার কারন হয়ে দা্ঁড়ায়। পাকিস্তানি সেনা বাহিনী গান বোট এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করেও সিরাজ সিকদারের মূল ঘাটি ভাঙ্গতে ব্যর্থ হয়ে, হাজার হাজার বাঙ্গালীকে বন্দুকের মুখে পেয়ারা বাগান কাটাতে বাধ্য করে। এই সময়েই সিরাজ সিকদার তাঁর অত্যন্ত বিখ্যাত দলিল, “ছয় পাহাড়ের দালালদের নির্মূল করুন” শীর্ষক দলিল ও প্রচারনাপত্র রচনা করেন। সে দলিলে তিনি সঠিকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিনতি নিয়ে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবানী করেন। যা সত্য বলে প্রমানিত হয়েছিলো। ১৯৭১ এর আগস্ট মাসে সিরাজ সিকদারের নেতৃস্থানীয় সহযোগী আজমীকে আলোচনার কথা বলে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। আজমীর স্মরণে সিরাজ সিকদার একটি কবিতায় বলেছেন, “উত্তর প্রদেশ থেকে এসে তুমি হলে বাংলার বেথুন”!! এরপরেই মুজিব বাহিনীর প্রতিআক্রমনে সর্বহারা পার্টি যুগপৎ পাকিস্তানি বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়।

সিরাজ সিকদারের স্বাধীনতা পরবর্তী ভুমিকা: স্বাধীনতার পরে পরে সিরাজ সিকদার ১৮টি দাবী সংবলিত একটি লিফলেট শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ ও প্রচার করেন। সেখানে দেশপ্রেমের প্রমান দিতে সেই ১৮টি দাবী (যার মূল সুর ছিলো ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের কবল থেকে মুক্তি) পূরনের আহ্বান জানান। অতি স্বাভাবিকভাবেই শেখ মুজিব বা সরকার এ লিফলেটের কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি। এরপরেই সিরাজ সিকদার শেখ মুজিবকে ভারতের দালাল ও বাংলাদেশকে ভারতের উপনিবেশ বলে রাজনৈতিক প্রচারনা শুরু করে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর প্রধান দাবীগুলোর মধ্যে যা জনপ্রিয়তা অর্জন করে তা হলো, ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ে যাওয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অস্ত্র ফেরত আনার দাবী, আওয়ামী লীগের একাংশের নির্বিচার লুন্ঠন এবং সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসননীতির বিরুদ্ধে। একই সাথে সর্বহারা পার্টির গেরিলারা ৭৩-৭৪ সালে ১৪টি থানা এবং ৭৯টি পুলিশ ফাঁড়ি লুট করে অত্যন্ত শক্তিশালী সশস্ত্র কমিউনিস্ট পার্টিতে পরিনত হয়। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে সর্বহারা পার্টি ১৬ই ডিসেম্বরকে কালো দিবস আখ্যা দিয়ে দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে এবং গ্রামাঞ্চলে ও অনেক ছোট শহরে সে হরতাল পালিত হয়। (সিরাজ সিকদার তাঁর “ছয় পাহাড়ের দালালদের নির্মূল করুন” শীর্ষক প্রচারপত্রে পাকিস্তানীদের পরাজয় এবং ভারতের সহযোগিতায় অর্জিত জয়কে বাংলাদেশের জনগনের উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পতনের তুল্য হবে বলে ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছিলেন সে সীমান্ত লোপ পাবে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারত কর্তৃক বাধাগ্রস্থ হবে এবং বাংলাদেশের সরকার ভারতের অনুগত হবে )। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে কমরেড মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার সহযোগিতায় ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পদচ্যুত লে. কর্ণেল জিয়াউদ্দিনের পরিচালনায় একটি কোম্পানী সৃস্টি করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান কালে সিরাজ সিকদার তাঁর আশাবাদী মনের পরিচয় রেখে একটি কবিতায় লিখেছেন, “…পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যায় মুরং তরুনী। অঙ্গে তার ছোট্ট আবরনী, কী নিটোল স্বাস্থ্যবতী। কবে তার কাঁধে শোভা পাবে রাইফেল একখানি?”

ধরা পড়া ও হত্যা: ১৯৭৪ সালের ৩০শে ডিসেম্বর চট্টগ্রামে ধরা পড়ে সিরাজ সিকদার ঢাকায় আনীত হন এবং ২রা জানুয়ারী ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তর সাভারে নিহত হন।

ভুল-ত্রুটি নিয়েও একটি কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সাফল্যের সাথে সিরাজ সিকদার এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আজ ২রা জানুয়ারী তাঁর মৃত্যুদিবসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরন করি। কমরেড সিরাজ সিকদার জিন্দাবাদ।