ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

এর আগে এই অধম প্রায় একই শিরোনামে একটি ব্লগ লেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলো। কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্রের সঠিক সম্মেলন না ঘটায় তখন করা প্রায় সব ভবিষ্যদ্বানী মাঠে মারা গেলো। তবে এবার আর ফসকানোর সুযোগ নেই। একেবারে ঘোড়ার মুখের খবর, হতদরিদ্র-হতচ্ছাড়া বাংলাদেশে বৈশ্বিক রাজনৈতিক হেভিওয়েটরা আসছেনই। শুধু তাই নয়, এই মহারথীদের আবাসন ব্যবস্থা বাংলাদেশকে ঘোর সঙ্কটে নিপাতিত করেছে। কাকে যে কোথায় শোয়ানো হবে, ঘুমানো অর্থে, সে ভাবনায় সদ্য রোগমুক্ত পররাষ্ট্র সচিবসহ পুরো পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের কর্তাদের নিজেদেরই ঘুম হারাম হয়ে গেছে। যাহোক, শনৈঃ শনৈঃ উন্নতির দেশ বাংলাদেশে একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। যে মহারথীরা আসছেন, তারা সবাই সকল অতীত ও বর্তমান শাসক সম্প্রদায়ের অতি পুরনো বান্ধব। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারিকে তো বলা চলে বাংলাদেশের বুসুম ফ্রেন্ড। যদিও তাদের মূল এজেন্ট, আই মীন, নিজেদের লোক ড.ইউনুস এই তারকা সম্মেলনে উপস্থিত থাকছেন না বলে একটা তারা কম জ্বলবে, তবু আজকাল তো আর দশমাইল হেঁটে ধুলিধুসরিত পদে বন্ধুর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে বন্ধুকে বিশেষ সংবাদ জানাতে হয়না, তাই বাঁচোয়া। আর মান্যবর প্রণব মুখার্জী তো আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর “আপা”র পতিদেবতা। একরকম ঘরের মানুষ। এক্কেবারে শেষ সময়ে জানা গেলো, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারির একা এলে চলেনা, তাই তাঁর সহকারী রবার্ট ব্লেক সাহেবেরও আসতে হবে। এক রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর। অবশ্য এমনও হতে পারে হিলারি বিবি কোন জরুরী কাগজ ভুলে নিয়ে আসেননি, এসব জিনিষ তো আর ফ্যাক্সম্যাক্সে পাঠানো যায়না, তাই তাকে বাহক হিসেবে আসতে হচ্ছে। অথবা, ব্যাটা এরকম তারকাদের সাথে ফটো-অপের সুযোগটা হারাতে চায়না।

যাহোক, আমার বক্তব্যের ভুমিকা তো সমাপ্ত হলো (যারা বুদ্ধিমানের মতো ঘুমিয়ে গেছেন, তারা আস্তে নাক ডাকবেন যাতে অন্যদের অসুবিধা না হয়) এবার কি? কেন গরীবের দ্বারে হস্তীর থামের মতো পা? আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আপাতঃ নির্দোষ এই তারকামেলা বেহুদা বসছে না। সর্বশেষ সংবাদে যা জানা গেলো, তা হচ্ছে, হিলারি বিবি একদিন আমাদের সুভাষিনী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করবেন আর এক রাত্রে একত্রে ভোজন করবেন (পদ্মার ইলিশ তো মেনুতে থাকবেই…. সুরুৎ)। এছাড়া তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও তথাকথিত বিরোধীদলের নেত্রীর সাথে বৈঠকও করবেন (এবার খানিকটা উত্তেজনা ও আকর্ষন টের পাওয়া যাচ্ছে)। তার পরদিন হিলারি বিবি ব্যক্তিগত সময় ব্যয় করবেন। পৃথিবীর কুটনীতির ইতিহাসে এটি একটি রেকর্ড বলে বিবেচিত হবে। তিনি তাঁর মহামূল্যবান সময় থেকে একটি দিন ঢাকার ট্রাফিক জর্জরিত নগরে ব্যক্তিগত সময় কাটাচ্ছেন, এটি ভাবলেই তো আমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সখি, ভালোবাসা কারে কয়? হতে পারে মার্কিন দূতাবাস ইদানীং বাজেটবহির্ভুত ব্যয় করছে সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের সেদিন ব্যয়সংকোচনের পরামর্শ দেবেন, তাদের বোঝাবেন একটু টানাটানি যাচ্ছে তাই ব্যয় নিয়ন্ত্রন করে চলুন। অথবা তিনি এই ব্যক্তিগত সময়টি বাংলাদেশের সম্পূর্ণ স্বার্থবিরোধী, কিন্তু আমেরিকার বর্তমান নিয়ন্ত্রক বৈশ্বিক করপোরেশনগুলোর কোন লাভজনক পরিকল্পনা নিয়ে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করবেন। এই অধম পরের সম্ভাবনাতেই ভোট দিচ্ছে, এবং বাংলাদেশের আরেকটি সর্বনাশের দৃশ্য দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সাথে একথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে রবার্ট ব্ল্যাক মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের আস্থাভাজন পরিকল্পনাবিদ। তাই তার ঝুলিতে বাংলাদেশের সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ করার পরিকল্পনা আছে বলেই বিশ্বাস করছি।

এবার নজর দেয়া যাক আমাদের জামাইবাবু, অর্থাৎ কিনা “আপা”র উনির দিকে। এদ্দিন তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন নি, তা সে পাঁচ লাখ টনের জায়গায় তিন লাখ পঁচা চাল পাঠানোর লজ্জার জন্যই হোক (বেশীরভাগই অবশ্য আমাদের সদাসতর্ক সরকারের উদ্যোগে সমুদ্রগর্ভে ঠাঁই নিয়েছে) কিংবা সীমান্তে বাংলাদেশী না মারার প্রতিশ্রুতি দিয়েও রক্ষা করতে বা পারার জন্যও হোক, অথবা ভারতের কেন্দ্রে গনেশ উল্টে যাওয়ার আতঙ্ক থেকেই হোক। যাহোক, আশার কথা, তিনি আসছেন। নিতান্ত নির্দোষ রবীন্দ্র জন্মসার্ধশত বার্ষিকীতে যোগ দেয়ার জন্য। আসবেন না? বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকে কী ভালোই না তিনি বাসেন! তবে একুশ ঘন্টার বাকী সময় তিনি কিভাবে কাটাবেন তা আমাদের সাংবাদিককুল আমাদের জানাননি, আমরাও জানিনা। জানার দরকারও নেই। ভারতের অতীব ব্যস্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভ্যন্তরীন সমস্যা নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সাথে দেখা করার সময় পান না অথচ রবীন্দ্রনাথ স্মরণোৎসবে (মতান্তরে বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের ৮০ বছর পুর্তিতে) যে বাংলাদেশে আসছেন, তাই তো আমাদের পরম পাওয়া। “……তোমায় কি দিয়ে যে বরণ করি”।

এতো প্যাচাল পারার অর্থ কি? এক, এই ব্লগে ভালো ও জ্ঞানী কথা শুনতে শুনতে পাঠকেরা নিশ্চয়ই বোরড্ হয়ে গেছেন। তাই একটু ডিস্ট্রাকশনের ব্যবস্থা আরকি। দুই, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে (Geo-politics) প্রধান পরিচালিকা শক্তি হচ্ছে বৃহৎ করপোরেশনগুলো। তারা শক্তিশালী পেশীবাজ রাষ্ট্রগুলোকে নির্দেশ দেয় কোন দেশে কি ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে তাদের বিখ্যাত সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন তত্ব বাধাগ্রস্থ না হয় তা নিয়ে আলোকপাতের চেষ্টা করা।

আমরা জানি, বর্তমান সরকারের দেড় বছরের মতো ক্ষমতাসীন থাকার আইনী সুযোগ আছে। কিন্তু করপোরেশনগুলোর সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা হয়নি বলেই তত্ত্ব-উপাত্তে মালুম হয়। একই সাথে ভু-রাজনীতিতে ভারত এক উঠতি শক্তি এবং আমেরিকা-ইসরায়েলের সহযোগী বিশাল অর্থনৈতিক (ও সামরিক) শক্তি বলে প্রচার চলছে। (মনে রাখা ভালো, বাংলাদেশ ইসরায়েল বা আমেরিকা নয়, রাশিয়া থেকে এক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনতে যাচ্ছে, এজেন্ট কে জানেন? বলবো না)। আসলে ভারতে অতিবৃহৎ স্বাধীন পুঁজি আছে সত্য, কিন্তু একই সাথে ভারতের ৬৪% গ্রামীন জনগন দৈনিক এক ডলারের কম আয় করে, প্রায় ১৫ কোটি মানুষ অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়, কিন্তু জানেনা সকালে খেতে পারবে কি না । (সুত্র: ড. প্রণব বর্ধন; Awakening Giants, Feet of Clay: Assessing the Economic Rise of China and India, Princeton University Press, 2010). তা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমরাও তো আমাদের গার্মেন্টকর্মীদের সঠিক মজুরী দেই না। মুনাফা করতে গেলে অত আবেগী হলে চলে?

যাহোক, যেহেতু ভারতের পুঁজির মুনাফার্জনের জন্য বাংলাদেশের উপর অনেক বিষয়ে নির্ভরতা, আবার যেহেতু ভারত-আমেরিকার স্বার্থ একই সুত্রে গাঁথা, তাই বাংলাদেশ সরকারকে তাদের শেষ সময়ে দু‘চারটি পরামর্শ দেয়া আমেরিকা ও ভারত উভয়েরই খুব প্রয়োজন। একই সাথে বিএনপি কে খানিকটা কড়কে দেয়া দরকার যেন সমুদ্র জয়ের পরে এখন যখন তেল-গ্যাস নিয়ে ব্লক বরাদ্দে আর সমস্যা নেই, বিএনপি যেন খামাখা ফালতু ইস্যু নিয়ে হট্টগোল না করে। আগামী নির্বাচনে কাকে জিতিয়ে আনা যায় এ নিয়ে খানিকটা দরাদরিও হতে পারে তারকাদের মধ্যে।

এখন এই বিশাল মানোয়ারী তারকা জাহাজ নিয়ে আমার মতো আদার ব্যাপারীর ব্লগ লেখার কী এমন প্রয়োজন পড়লো? সর্প ভ্রমে রজ্জু? এ লেখার প্রয়োজন হতো না যদি আমি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের হাড়-মজ্জাসহ না চিনতাম। যদি না জানতাম এধরনের উচ্চপর্যায়ের মিলনমেলার পরে পরে বাংলাদেশ আরো দরিদ্র হয়। যদি না দেখতাম কমিশনজীবীরা কি হন্যে হয়ে ছুটাছুটি করছে। যদি চোখে না পড়তো বাংলাদেশের শ্রান্ত, হাল ছেড়ে দেয়া কৃষকের শুকনো অভুক্ত মুখ। যদি না চিনতাম হতাশ এবং পরাজিত মুখের পিতাকে। যদি না স্বপ্ন না দেখতাম যে বাংলাদেশ তার অপার সৌন্দর্য্য নিয়েও উঠে দাড়িয়েছে বিশাল ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়ে, আর সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফিকে না হয়ে যেতে দেখতাম।! ফ্রন্টে জিতে দেশে এসে যদি না হারতাম!!

তাহলে প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, আমরা কি করবো? আলো ঝলমল তারকারাজির মেলা দেখবো নাকি চোখ রাখবো ৫ই মের দিকে এবং খুচরো খবর যা পাওয়া যাবে তা থেকে অনুমান করতে চেষ্টা করবো বাংলাদেশের আর কি কি গেলো? আমরা কি নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক চালিয়ে সত্যের কাছাকাছি যাবো না নিশ্চল হয়ে বসে থেকে বাংলাদেশকে খুবলে খাওয়ার মহোৎসব চলতে দেবো? ইয়োর কল।

ভালো থাকুন। বেঁচে থাকো বাংলাদেশ।

সংযোজন: আগ্রহী পাঠকেরা আমাদের মতো দেশে আগতপ্রায় মহামান্যদের পদার্পন করার মূল কারন ও বিশ্লেষন Naomi Klein লিখিত “The Shock Doctrine: The Rise of Disaster Capitalism” বইটিতে বিস্তারিত পাবেন।