ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বাংলাদেশের গদীনশীন সরকারের মাননীয় মন্ত্রী ও সরকারীদলের মহাসচিব সাহেব এক মন্তব্য করে দেশে মহাহুল্লোড় সৃষ্টি করে দিয়েছেন। মন্তব্যের উৎস সেই কোন কালে একটি নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছিলো, তা সঠিক ব্যক্তিকে দেয়া হয়নি। এ নিয়ে গালফুলানো, অভিমান, বাসন ছুঁড়াছুড়ি সবই চলছে। আর ওই নোবেল পুরষ্কার যে কিচ্ছু নয়, আমরা ইচ্ছে করলে ওরকম ম্যালা মেডেল আনতে পারি এরকম কথাবার্তাও হচ্ছে। আর নোবেল প্রাইজপ্রাপ্তদের পুজারীরা যা বলছেন, তা হলো, এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবচেয়ে মূল্যবান সন্মান যে এনে দিল, তাকে এতো হেলাফেলা? মোদ্দা কথা, যা হওয়া অত্যন্ত উচিৎ ছিলো, তা হলো দীর্ঘ ত্রিশ বছর পরে ক্ষুদ্রঋণ ও বাংলাদেশের জনগনের উপর এর প্রভাব নিয়ে এবং এর উদ্যোক্তা ডঃ ইউনুস ও গ্রামীন ব্যাঙ্ক নিয়ে একটি মূল্যায়ন, নিদেনপক্ষে কিছু পেশাদারী আলোচনা করা, তা আর হয়নি। কেন হয়নি, তা নিয়েও একটি থান ইটের সাইজের বই লিখে ফেলা যায়। দেখা যাক, ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পাওয়া মহামহিম ডঃ মুহম্মদ ইউনুসকে অবলম্বন করে এগোনো যায় কি না। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, এই রচনা সংশ্লিষ্ঠ ভুলনির্নয়, তথ্যচ্যুতি, অসঙ্গতি নিয়ে মতামত কৃতজ্ঞতার সাথে এবং বেহুদা গালাগালি ততটা কৃতজ্ঞতার সাথে না হলেও গৃহিত হবে।

কার নোবেল পুরষ্কার? কেন? আমরা দেখছি (আপনারাও দেখুন: http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/peace/laureates/2006/grameen.html) নোবেল পুরষ্কার ২০০৬ দেয়া হয়েছিলো যৌথভাবে ডঃ ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে। ডঃ ইউনুসের পুজারীবৃন্দ প্রশ্ন করবেন, অসুবিধা কি? অসুবিধা আছে। ডঃ ইউনুস চট্টগ্রামের এক সোনারুর বায়োলজিক্যাল সন্তান আর গ্রামীণ ব্যাঙ্ক আইনকর্তৃক সৃষ্ট সন্তান। দুটি আলাদা সত্বা। হ্যা, ডঃ ইউনুসের অনুরাগীরা যদি আধা মেডেল পাওয়ার জন্য ডঃ ইউনুসকে নিয়ে উল্লসিত হন, তবে অঙ্কশাস্ত্রের হিসেবে তা সম্ভবতঃ সঠিক। আর এই পুরষ্কার পাওয়ার যোগ্যতা নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছে Field: Humanitarian work। না, যা নিয়ে এতো মাতামাতি, সেই দারিদ্রবিমোচন কর্মসূচীর উল্লেখও নেই। (তৃণমূল থেকে আর্থসামাজিক উন্নয়নের কারনে নোবেল কমিটি অনুপ্রানিত হয়েছিলো বলে অবশ্য জানা যাচ্ছে)। প্রক্ষিপ্ত হলেও বলি, মরহুম আবদুল হক ফরিদী প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম সত্তুর বছর ধরে বেওয়ারিস লাশ দাফন ও সৎকার করে আসছে। এটিও সমাজকর্ম।

গ্রামীণ ব্যাঙ্কের যাত্রা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯৭৬ সালে ডঃ ইউনুসের ব্যক্তিগত ঋণ ১,২০০ টাকা দিয়ে হাটহাজারীর জোবরা গ্রামে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের কার্যক্রম শুরু হয়। তারপরে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের sponsorship এ ১৯৭৯ সালে টাঙ্গাইলে দ্বিতীয় শাখা খোলা হয়। (http://www.grameen-info.org/index.php?option=com_content&task=view&id=19&Itemid=114)। তবে স্পন্সরশিপ কিরূপ ছিলো তা আর বিস্তারিত বলা হয়নি। এরকম সত্য চেপে যাওয়ার ঘটনা আমরা বহুবার দেখবো। যা এখানে বলা হয়নি, তা হলো, ১৯৭৮/৭৯ এর দিকে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন আহমেদের সহায়তায় ডঃ ইউনুস এসে জিয়াউর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। জিয়াউর রহমানের বিরূদ্ধে অজস্র অভিযোগ থাকলেও গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিতে যে তাঁর আগ্রহ ছিলো একথা উলসী প্রকল্পের পিতা ম খা আলমগীরও নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন। ফলে, ডঃ ইউনুসের পক্ষে জিয়াউর রহমানকে কনভিন্স করা সম্ভব হয়েছিলো এবং প্রাথমিকভাবে ডঃ ইউনুসকে তিনকোটি টাকা দেয়ার আদেশ হয়, এনিয়ে পদ্ধতিগত ঝামেলাও হয়েছিলো। (ডঃ ইউনুসের অফিসও বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক বিল্ডিঙে দেয়া হয়)। যা হোক সমস্যা সমাধানের পরে একপর্যায়ে এই তিনকোটি বৃদ্ধি করে ত্রিশ কোটি করা হয়। আপনাদের স্মরনে থাকতে পারে আমাদের বর্তমান অর্থমন্ত্রী ও ডঃ ইউনুসের চল্লিশ বছরের বেশী সময় ধরে বন্ধু একসময় বলে ফেলেছিলেন গ্রামীন ব্যাঙ্কতো সরকারের। আসলে তা সত্যি। কারন সরকারের রেকর্ডে সে ত্রিশ কোটি ফেরৎ দেয়ার প্রমান নেই। তখন ত্রিশ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকায় গ্রামীন ব্যাঙ্কের শতভাগ মালিকানা সরকারেরই ছিলো। পরে গ্রামীণ সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া মূলধনে ও রিজার্ভের প্লাবনে ( একত্রে ২০১০ সাল: ৭৩৬ কোটি টাকা) সরকারী পুঁজির হার হ্রাস পায়। সত্য চেপে যাওয়ার আরেকটি মাত্র উদাহরন দিয়ে এই বিষয়ে আলোচনা শেষ করবো। গ্রামীন ব্যাঙ্কের কার্যপদ্ধতি স্থির করার জন্য ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় Ron Grzywinski and Mary Houghton of ShoreBank কে নিয়োগ দেয়া হয় (সুত্র: উইকিপিডিয়া)। ডঃ ইউনুস বোধহয় এদের কথা ভুলেই গেছেন। কতকিছু যে তিনি ভুলেছেন! 🙂

গ্রামীণ ব্যাঙ্কের অসততা মাফ করবেন, অসততা ছাড়া আর লাগসই শব্দ পেলামনা। এক্ষেত্রে, আমি গোটা কয়েক উদাহরণ দেবো।
১। ডঃ ইউনুসের অজস্র সাক্ষাৎকারে সুফিয়া নামক গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রথম খাতকের নাম আমরা শুনেছি। গ্রামীন ব্যাঙ্কের ঋণে ব্যবসা করে তিনি এতই সমৃদ্ধ হয়েছিলেন যে দালানকোঠার মালিক হয়েছিলেন। গ্রামীন ব্যাঙ্কের হাউজ ম্যাগাজিনেও তার ছবি এবং সেই দালানের ছবি প্রমান হিসেবে ছাপা হয়েছিলো। কিন্তু কোন এক দুবাই প্রবাসী বলে বসলো আরে এ বাড়িতো আমার। আর সুফিয়াতো বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার পরে গ্রামবাসীর সাহায্যে তার দাফন হয়েছিল। (সাপ্তাহিক ২০০০/মানবজমিন পত্রিকার তথ্যানুসন্ধানী রিপোর্ট)। কি গেরো!! গোঁদের উপর বিষফোড়ার মতো ডেনিশ টিভি রিপোর্টার Tom Heinemann জোবরা গ্রামে গিয়ে সুফিয়ার মেয়ে এবং তার প্রতিবেশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েটিয়ে হলুস্থুল করে ফেললেন। এখন অবশ্য গ্রামীন ব্যাঙ্ক বলছে, আরে না না, প্রথম খাতক মোটেও সুফিয়া ছিলোনা, সে ছিলো নূরুন্নাহার! সেতো খুব ভালোভাবে বেঁচে আছে। তবে তার সাথে কারো দেখা করানো যাবেনা, আমাদের ঈশ্বরের নিষেধ আছে।

২। Tom Heinemann নরওয়ে টিভিতে গ্রামীন ব্যাঙ্কের একখাতে প্রাপ্ত টাকা অন্যখাতে সরিয়ে ফেলা নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেন। যারা ফান্ড এ্যাকাউন্টিং সম্পর্কে জানেন, তারাতো জানেনই, যারা জানেননা তাদের খুব সহজ করে বললে এভাবে বলা যায়, যখন কোন ফান্ড আসে (দান-খয়রাত হতে পারে, সুনির্দিষ্ট কাজ করার জন্য হতে পারে) তখন যদি তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়, তাকে বলে রেস্ট্রিক্টেড ফান্ড। ডঃ ইউনুস গ্রামীন ব্যাঙ্কের নামে আসা (অন্ততঃ দশ বছর আগের ঘটনা) এরকম রেস্ট্রিক্টেড ফান্ড গ্রামীন ব্যাঙ্কের এ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে তাঁর মালিকানাধীন ‘সামাজিক ব্যবসায়ের’ একটি প্রতিষ্ঠানের (৭ থেকে ২৮টি এরকম প্রতিষ্ঠান আছে বলে জানা যায়) এ্যাকাউন্টে জমা করেন, সে প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে ঋণ দেন, এর জন্য গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে গুনতে হয় তিন কোটি টাকা। যা ডঃ ইউনুসের নিয়ন্ত্রনাধীন (গ্রামীণ ব্যাঙ্কের নয়) প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যায় ও অবৈধ মুনাফা দান করে। এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করলে বা ইন্টারকোম্পানী লেনদেনে স্বচ্ছতা (আর্মসলেংথ ট্র‍্যানজেকশন) না থাকলে পাশ্চাত্যে এমন প্রতিষ্ঠান ও এর পরিচালকদের জেল-জরিমানা হয়। এনরনের কথা মনে নেই?

৩। ডঃ ইউনুস যখন নরওয়ে টিভিতে উপরোক্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন, তখন এই ফান্ড নিয়ে বলেন যে গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে ট্যাক্সের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি তা করেছিলেন। অথচ গ্রামীন একটি ট্যাক্সমুক্ত প্রতিষ্ঠান, তাই, ডঃ ইউনুস প্রকাশ্যে অসত্য বলেছিলেন। এছাড়া তাঁর মতো এক মহান ব্যক্তি খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীর মতো ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন এটি তাঁর পুজারীরা কিভাবে দেখবেন, তারাই ভালো জানেন।

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)