ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ব্লগার এরশাদ পাহলোয়ান সাহেবের পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে এই পোষ্ট দেওয়া, লেখার বক্তব্যের সাথে আমি একমত। কিন্তু আমার মনে প্রায়ই এই প্রশ্নটি আসে যে, আস্তিক-নাস্তিক, সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী সকলেই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি নাকি শুধুমাত্র আস্তিকরা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি এবং নাস্তিকরা বিজ্ঞানের সৃষ্টি?

“নাস্তিক কিংবা দুরাচারী দোষী মানুষ, পৃথিবীর যোগ্য না হত তাহলে সৃষ্টিকর্তা তাদের সৃষ্টি করত না” – এই অংশটি পাহলোয়ান সাহেবের  পোস্টের ৫ম লাইন থেকে নিয়েছি। আমার উপরের প্রশ্নটি এই বাক্যের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। ইদানিংকালে নাস্তিকতার প্রচার-প্রসার উল্লেখযোগ্য জায়গা পেয়েছে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায়, যাতে করে নাস্তিকতার চর্চা এবং প্রচারকদের বক্তব্য, তাদের থিওরি আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজে আমরা শুনতে পাচ্ছি, পড়তে পারছি, আলোচনা পর্যালোচনা করতে পারি, পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কে লিপ্ত হতে পারছি।

আমার মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, আস্তিকতা এবং বিজ্ঞান কি একটি আরেকটির বিপরীত অবস্থানে? যারা আস্তিক, যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তারা কি বিজ্ঞান চর্চা করেনা? অথবা নাস্তিকতার ধারক বাহক যারা, শুধুমাত্র তাঁরাই কি বিজ্ঞান চর্চা করে, নাকি বিজ্ঞান চর্চা করে না এমন অনেক বিদ্যান-বিদুষী যারা জ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রে বিচরণ করেন তাঁরাও সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী হয়ে থাকেন? আমদের সমাজে এখন এরকম অনেক জ্ঞানি-গুণীজন আছেন , যারা বিজ্ঞানের ছাত্র বা শিক্ষক কিছুই নন, বিজ্ঞানের সাগরে সাঁতার কাটা তো দরে, বিজ্ঞানের খালেবিলেও পা ভিজাননি কখনও, তাঁরাও আস্তিকতায় বিশ্বাসী নন।

এটা থেকে আমার মতো বোকারও বুঝতে বাকি থাকেনা যে নাস্তিক হতে হলে বিজ্ঞানি হওয়াটা অপরিহার্য নয় । মানে বিজ্ঞান ও সৃষ্টিকর্তার দূরত্ব বা শত্রুতা পয়দা করতে হলে শুধুমাত্র বিজ্ঞানের মহাসাগরে বিচরণ করতে হবে এমনটি নয়। বাংলা বা ইংরেজি সাহিত্যের পণ্ডিত হলেও সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী হতে কোন বাধা নেই, বা প্রকৃত অবিশ্বাসীরা এটা বলতে পারে না যে নাস্তিক হওয়াটা তাদেরই একচ্ছত্র অধিকা্‌র, যারা বিজ্ঞানের পণ্ডিত এবং একমাত্র বিজ্ঞানই প্রমান করতে পারে সৃষ্টিকর্তা বলে কিছু নেই!

 

আমার এ কথাগুলো পেটের ভিতর প্যাঁচঘোঁচ পাকাচ্ছিল এতদিন ধরে , উগড়ে না দিয়ে পারা গেল না। এখন প্রায়ই নিকটজনদের মধ্যেও খেয়াল করেছি, নবম-দশম শ্রেনির পাঠ্য পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিদ্যা বইগুলোর মলাট পুরনো হবার আগেই পাশাপাশি দু’চারটা সায়েন্স ফিকশনের চটিবই পড়েই রাতারাতি নিজেদের হাবভাবে নাস্তিক-নাস্তিক একটা প্রলেপ দিয়ে চলতে চায় ।এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকানোর আগেই তড়িঘড়ি করতে থাকে নিজেকে তাদের সমকক্ষ ভাবতে, যারা ইতোমধ্যে সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী হিসেবে সমাজে একটি পোক্ত অবস্থান করে নিয়েছেন ১০/১৫/২০ বছর আগেই।

আমার সঙ্গে কোন নাস্তিক বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী নয় এমন কারো গভীর পরিচয়/ বিদ্বেষ কিছুই নেই । আমার মতের অমিল হয় তাদের সঙ্গে যখন তাঁরা বুঝাতে চান যে, ইনি উনি বা তিনি বিজ্ঞানের মহা জ্ঞানি পণ্ডিত, তাঁর পাণ্ডিত্য দিয়ে তিনি প্রমান করেছেন যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তাঁরা অন্ধকার জগতে হাবুডুবু খাচ্ছে, অদৃশ্যে বিশ্বাস করে জগতের অনিষ্ট করছে। আর অবিশ্বাসীরা বিজ্ঞানের আলোকে নিজেরা উদ্ভাসিত হয়ে জগতের সব অনিষ্টকারীকে আলোর জগতে আনার জন্য টানা হেঁচড়া করছেন,অবিশ্বাসীরা ভাবছেন  সেই আলোর জগতে বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় ফেলে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ক্রিয়াকর্ম করতে উদ্বুদ্ধ করাও জগতকে মহিমান্বিত করা।

তাহলে যারা বিজ্ঞানের মহাজ্ঞানি নন, জ্ঞানের অন্যান্য সড়ক মহাসড়কে যাদের চলাচল কিন্তু অবিশ্বাসী, তাঁরা কোন থিওরিতে ফেলে অন্ধকারাচ্ছন্ন সাগরের ডুবন্ত জাহাজের সেই যাত্রীদের উদ্ধার করবেন, যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী?

শেষ প্রশ্ন – বিজ্ঞানের সাগর-মহাসাগর হাতড়ে যারা সভ্যতাকে জগতে চিরস্থায়ী করতে বিখ্যাত মৌলিক সব আবিস্কার করেছেন সেসব বিজ্ঞানীদের মধ্যে কে কে বিজ্ঞান এবং সৃষ্টিকর্তাকে বিরোধপূর্ণ রূপ দেওয়ার জন্য কয়টি থিসিস রচনা করে গিয়েছেন? বিজ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে কতজন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারক মানব সভ্যতাকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন? সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করতে বলেছেন? তাহলে কেন আমরা বিজ্ঞান এবং সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী আস্তিকদের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাচ্ছি?

সকল বিজ্ঞানী যেমন নাস্তিক নয়, তেমনি সকল আস্তিকও অন্ধকারের বাসিন্দা নয়। সকল বিশ্বাসী ব্যক্তি জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে এবং বিজ্ঞানের সমস্ত উপহারগুলোকে বিনা বাধায় সাদরে গ্রহন করেছে, কিন্তু বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে কিছু সংখ্যক অবিশ্বাসী, যারা নিজেদের নাস্তিক ভাবতে স্বচ্ছন্দ, তাঁরাই নিরলসভাবে বিজ্ঞানকে বিশ্বাসীদের বিপরীত অবস্থানে দাঁড় করানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

যার যার বিশ্বাস নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তখনই ব্যহত হয় ,যখন একজন আরেকজনের উপর নিজের বিশ্বাসটিকে জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করে , যদি সেটা প্রকৃতির স্বাভাবিকত্ব ধবংশের বিনিময়েও হয় ।

এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে ব্লগার অভিজিত রায়ের হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, এই প্রশ্নটির অবতারণা । অভিজিৎ রায় একজন প্রকৌশলী, একজন লেখক, অনেকের কাছেই তিনি অবিশ্বাসীদের দলভুক্ত, আমি যদি এখন বলি তার লেখায় যে মত তিনি প্রকাশ করেছেন তাতে “বিশ্বাসী”রা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যা করেছে, তা কতটুকু সঠিক হবে?

সৃষ্টিকর্তায় প্রকৃত বিশ্বাসী কখনও হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হতে পারে না। যারা হত্যাকাণ্ড করে তাঁরা উগ্রবাদী, নরহন্তা উগ্রবাদী আর সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী নিজ আত্মার শান্তির জন্য ধর্ম পালনকারী কখনও এক হতে পারেনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ঘটনার পর কেউ কেউ প্রয়াস পাচ্ছেন অপপ্রচারের ফায়দা নিতে এভাবে—- অভিজিৎ রায় ছিলেন বিজ্ঞান মনস্ক সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী একজন লেখক, ধর্মান্ধ- সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী গোষ্ঠী তাকে হত্যা করেছে। এভাবে বললে কি সঠিক হয়না? যে, ধর্মান্ধ উগ্রবাদী গোষ্ঠী তাকে হত্যা করেছে, সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী ধর্ম পালনকারীরা নয়।

আমি বিশ্বাস করি আস্তিক এবং নাস্তিকে কোন দ্বন্দ্ব নেই, দ্বন্দ্ব আছে নাস্তিক এবং উগ্রবাদী অন্ধদের মধ্যে। আমি ওদের ধর্মান্ধও বলি না। কে আমার প্রশ্নের উত্তর দিবেন ভাই?