ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

বাংলাদেশে গজিয়ে উঠা বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে সংখ্যার বিচারে নেতিবাচক বোঝানোর ক্ষেত্রে ব্যাঙের ছাতার সঙ্গে তুলনা করা হয় । মানের বিচারের কথা বলার মত ধৃষ্টতা নাইবা দেখাই! চ্যানেলগুলোকে যদি ব্যাঙের ছাতার সঙ্গে তুলনা করা যায়, এর রিপোর্টারদের নিশ্চয়ই ব্যাঙের সঙ্গে তুলনা করা ভুল হবেনা। মাঠে ক্যামেরা-মাইক্রোফোন নিয়ে ঘুরে বেড়ানো রিপোর্ট সংগ্রহকারি থেকে সংবাদ উপস্থাপক পর্যন্ত ভুল বাংলা উচ্চারণে দিনের পর দিন দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন, ভুল শুধরে দেওয়ার মত কেউ যদি থাকতেন তবে নিশ্চয়ই ক্যামেরার সামনে ’নির্দিষ্ট’ -কে দিনের পর দিন বাঘা সাংবাদিকরা ’নিদ্রিষ্ট’ উচ্চারণ করে পার পেয়ে যেতেন না। ’মন’ শব্দটি এখন হয়ে গেছে ’মোন’। বনজঙ্গলের ’বন’ আর ভাই-বোনের ’বোন’ এখন ওরা একই রকম উচ্চারণ করে।  ’মুক্তিপণ’ নিয়ে এক সংবাদ পাঠকের উচ্চারণে শুনেছি ’মুক্তিপোন’! ’বন্যা’ তো অনেক আগেই হয়ে গেছে ’বোন্যা’। ’ইস্টার্ন ব্যাংক’ তাঁদের উচ্চারণে ’স্টার্ন ব্যাংক’ আবার “ইস্পাহানি” হয়ে যায় ’স্পাহানি’। ’স্পেন’ হয় ’ইস্পেন’। যা হোক এগুলো বিজ্ঞজনেরা ভালো বোঝেন।

পোস্টের শিরোনামের সঙ্গে লেখার কোনো মিল হচ্ছেনা! আমার এই পোস্ট লেখার মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন। আজ বাংলা ভিশন চ্যানেলে রাত দশটার খবর দেখছিলাম, খবর পাঠক ছিলেন কামরান। হঠাৎ করেই একটু জোরে তিনি চিৎকারের মত করেই বলে উঠলেন, ’মাহমুদ, এই মুহূর্তে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে কী পরিস্থিতি? আপনি তো বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছেন, সর্বশেষ অবস্থাটা যদি আপনি আমাদের জানাতেন…’।. আমার চোখকান সজাগ হয়ে গেল। সর্বনাশ হয়েছে!  আবার কোন অঘটন ঘটেছে মনে হয়।

ওপাশ থেকে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে যিনি গর্জে উঠলেন ক্যামেরার সামনে তিনি মাহমুদ শরীফ। হ্যা, কামরান, আপনি যেমনটি বলছিলেন, আমি এখন বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে অমুক অমুক নেতার আগমনের পরেই ’চ্যায়ারপারসন’ এসে পৌঁছেছেন। এখনো ভিতরে সভা চলছে। ঈদের পর আন্দোলন কোন দিকে মোড় নিবে সে ব্যাপারে বেগম জিয়া সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি আগামিকাল পবিত্র ওমরাহ করতে সৌদি আরবে যাচ্ছেন। সেখানে তার বড় ছেলে তারেক রহমান মিলিত হবেন। ঈদের পর বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলনকে কিভাবে বেগবান করবে এবিষয়ে মক্কায় তাদের মধ্যে আলোচনা হবে। কামরান, আমি যেমনটি বলছিলাম ৫ জানুয়ারি এই গুলশান কার্যালয় থেকে বেগম খালেদা জিয়া লাগাতার অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন। টানা তিন মাস অবরোধ চলার পর আজই প্রথম সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। আগামি দিনগুলোতে আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে আজকের বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে।

মাহমুদ শরীফের উচ্ছাস যেন থামছিলনা! বাধ সাধলেন ততোধিক উৎসাহি কামরান। মাহমুদ, আমরা আবার আপনার কাছে ফিরে আসবো বিএনপি কার্যালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে…।

ভিতরে তখনও সভা চলছে, সভা শেষ হবার আগে রিপোর্টার মাহমুদ অগ্রিম কী করে বলে দিতে পারেন  এই এই বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, বেগম জিয়া এই এই নির্দেশনা দিবেন? অদ্ভূত!

এই হচ্ছে টিভি রিপোর্টিং। মনে হবে, কিছুক্ষণের মধ্যেই অবরোধ-হরতাল-পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারার ঘোষনা আসবে যা ঘটেছিল ৫ জানুয়ারি। এই গুলশান কার্যালয়ে, দেশবাসি দেখেছে সেদিন, বিএনপি নেত্রির মুখ থেকে কিভাবে কেড়ে বের করেছিলেন, ’অবরোধ চলতে থাকবে লাগাতার’ এই চারটি শব্দ – কয়েকজন অত্যুৎসাহি সাংবাদিক নাকি সাংঘাতিক!

সেদিনও লাইভ টেলিকাস্ট চলছিলো, বিএনপি নেত্রি বিফল মনোরথে দোতলায় ফিরে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ সেই বিখ্যাত সাংবাদিক পেছন থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,  ম্যাডাম, অবরোধের কর্মসূচির ব্যাপারে?

ম্যাডাম ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, চলবে লাগাতার। ভিডিও ফুটেজ দেখে বের করুন, কে ছিল এই সাংবাদিকটি, যার অতি উত্সাহে আজ বিএনপি নেত্রীর এই বেহাল অবস্থা, পুড়ে মরাদের কথাতো ভুলেই গিয়েছে সবাই। ক্ষমতার মসনদ তো হয়েই গেছে। এখন পোড়া মরাদের কথা বলা কী দরকার? দরকার হবে আবার নির্বাচন এলে।

অবরোধের সময় গাড়িতে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারার আগে টিভি ক্রুদের ডেকে নিয়ে আসা, টিভি ক্যামেরা রেডি না হওয়ায় যে বাসে পেট্রোল বোমা মারা হবে সেটাতে না মেরে পরেরটিতে মারা। টিভি ক্যামেরা রাস্তার নির্দিষ্ট জায়গায় ফ্রেম করার পর সেখানে পেট্রোল বোমা ককটেল ফাটানোর দৃশ্যগুলো খুব দেখা হয়েছে তিন মাসে। এই টিভি রিপোর্টারদের কে বুঝাবে খবরের গুরুত্ব বুঝে মন্তব্য কিভাবে করতে হবে? অতি উৎসাহি লাইভ সম্প্রচারে কোন কথাগুলো বললে জনহিতকর ব্যাপারটির গলা টিপে ধরা হয়, অতি উচ্ছাস দেখানো লাইভ রিপোর্টারের জন্য কখন অনুচিত, এগুলো শেখানোর জন্য তো কারো থাকার কথা চ্যানেলগুলোতে।

লাইভ সম্প্রচার তো এখন নিত্য দিনের। নগন্য পর্যায়ের সভা হলেও গুলশান কার্যালয়ের সামনে একশো ক্যামেরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় এখনি যুদ্ধ ঘোষনা হবে! লাইভ সম্প্রচার আর ব্রেকিং নিউজ এখন ভাতের মাড় হয়ে গেছে। ডালভাতের দামও নেই।

সব নষ্ট হয়ে গেছে বা নষ্টদের দখলে টেলিভিশন এসেছে – একটা তো হবেই!