ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

এসময়ে এটা একটা সামাজিক-পারিবারিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে —— ” আব্বু তুমি ‘বোলো’ হয়ে কি হবে ? — আমি ‘দাক্তাল’ হবো , হে হে হে হে হেহিহিহিহি !!!!
যেন ‘দাক্তাল’ না হলে জীবনে আর কিচ্ছু হওয়া যায়না , মানব জন্মের একমাত্র ব্রত ” দাক্তাল হবো ” ।

আরেক দল আছে , বিয়ের রাতে বউয়ের সাথে চুক্তি করে , আমরা লুইচ্চামি পাইজ্জামি যা করছি তো করছি —- আমাগো পরথম পোলাডারে কিন্তু কোরানে হাফেজ বানামু । নতুন বউ রাজি হইয়া যায় , হাফেজ বানাইতে যা যা করন লাগে আমি রাজি ।

বাপ মা থার্ড ডিভিশনে মেট্রিক পাশ করে কেরানি চাকরি করে , পোলা জন্ম হওয়ার সাথে সাথে নিয়ত করে ঘোষণা দেয় , আমার ছেলেটাকে মস্ত বড় ডাক্তার বানাবো । আরে মিয়া , এটা কি কাঠমিস্ত্রি দিয়ে বানানো যায় ? ঐযে পোলার মাথায় ঢুকাইছে ডাক্তার হবে ? পোলা স্কুল ধাক্কাইয়া মাক্কাইয়া কোন রকম বের হলেও কলেজের গেট এতই ‘চিপা’ যে , বাইরই হইতে পারলনা । শেষে বাজারে একটা অসুধের দোকান দিয়া গলায় স্টেথস্কোপ না কি কয় , ঝুলাইয়া সারাদিন ফ্লাজিল সিরাপ আর নাপা এক্সট্রা বেচে ।

পোলার সাধ্য অনুযায়ী অন্য কিছু পড়ার চিন্তাই করলনা । মাথায় চাপছে ভূত – আর কিচ্ছু হওয়ন যাইবনা , ডাক্তার না হইলে জীবনের লাইফটা পাংচার ।

বুয়ার নাতিন হইছে , একমাস না যাইতেই শুনলাম বুয়ার মাইয়ায় কইছে ওরে ডাকতর বানাইব ! লও যাও , বানাও গিয়া ডাকতর !!!

ডাকতর হওনের কলেজে ভর্তির প্রশ্ন ফাস হইছে । লে হালুয়া ! তোমরা যারা এখন রাস্তায় চিল্লা ফাল্লা করতাছ , তোমরা কি প্রশ্ন না কিনাই বইসা ছিলা ? মনেতো হয়না । তোমরা জানলা ক্যামনে ? এখন পরীক্ষা দিয়া পাস করতে পারনাই , হাউ কাউ শুরু কইরা দিছ । দ্যাশ অচল কইরা দিবা , এহ আপোষহীন হইয়া গেছগা ।

‘দাক্তাল’ না হইয়া তুমি যদি অন্য কিছু পইড়া মানুষ হও , তোমার কি দিন চলবে না ? ঐ মিয়া বিয়া শাদি কি হবেনা তোমাদের ? না হইলে আমারে তখন কইও । এখন অন্য কোথাও গিয়া ভর্তি হও । ‘দাক্তাল’ হইয়া যে তোমরা কার বা- টা ছিড়া আটি বানবা আমাগো জানা আছে ।

তাইলে আসো একটা সত্য ঘটনা শুন —- বুঝতে পারবা যারা ‘দাক্তাল’ হইছে তারা কার বা- ছিড়া আটি বানতাছে ।

গত রমজান মাসের ২৫ রোজা আমাদের ফ্যামিলির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য , তখন তার বয়স ৪১ দিন , শ্বাস কষ্টে চিৎকার করে কাঁদছিল , স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তিনি অসুধ দিয়ে বলে দিলেন সমস্যা বেশী দেখলে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন , যত তাড়াতাড়ি সম্ভব । রাত একটা নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ায় প্রথমে নিয়ে গেলাম ধানমন্ডির এবনে-সিনা হাসপাতালে । ডিউটি ডাক্তার পরীক্ষা করে ফোন করলেন শিশু চিকিৎসককে , হ্যালো , রেস্পিরেটরি প্রব্লেম নিয়ে একটা বাচ্চা এসচে , বয়স কত ? ফরটি ডেইস । পাঠাবো ? ওপাশ থেকে না করে দিলো । মুখ দিয়ে শব্দ বেরিয়ে আসলো – শালা খবিশ !

আবার গাড়ী দ্রুত নিয়ে গেলো ধানমন্ডিরই আরেকটি শিশু হাসপাতাল নাম নিবেদিতা , আহ কি ছমেতকার নাম !!! দৌড়ে দোতলায় উঠে দেখলাম , দুজন নার্স । সমস্যা শুনে তারা শিশুটিকে দেখল , ডাক্তার কে ঘুম থেকে তুলে আনল।

ব্যাচারা ঘুমের মধ্যেও গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিলো ইংরেজি ‘ওয়াই’ এর মত রাবারের নলটি। নার্স ডাক্তারকে বলল , ছ্যার , বাচ্চাকে অক্সিজেন দিবো ? এডমিশন ? ছ্যার অত্যন্ত কেতা ভাষায় ( একটু হিজড়া ফ্লেভারে ) বল্লেন , দেখুন আমরা কিছু করতে পারবোনা , বাচ্চাটা কোথায় জন্ম হয়েছে ?

বললাম –
স্কয়ার হাসপাতালে । ছ্যার বল্লেন — বেটার আপনারা ওকে স্কয়ারে নিয়ে যান। একবার মুখে এসেছিলো , আপনারা কি বা- ফেলাইয়া ডাক্তার হইছেন ? হাসপাতাল ব্যবসা খুইলা বসছেন , যে বাচ্চারা মা সহ নিরিবিলি ঘুমাইয়া ২৪ ঘন্টায় বিল উঠাইবো ৯০০০ টাকা , সেই রোগীর চিকিৎসা করার ‘দাক্তাল’ হইছেন ?

তাহলে এখন যারা ফাঁস হওয়া (কথিত) প্রশ্নপত্র কিনে পাস করে মেডিক্যালে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হবে , ওরা তো সর্দি জ্বরের চিকিৎসা করতে পারবে কিনা আমার সন্দেহ হয় । সব রোগীর রোগ ধরে দেয় ডায়গনস্টিক সেন্টারের ল্যাব এসিস্ট্যান্ট । নিউমোনিয়া হবার প্রাথমিক আলামতটুকু বুঝার ক্ষমতা যে ডাক্তারের হয়নি , সেতো প্রশ্নপত্র কিনে পরীক্ষা দিয়েই এমবিবিএস ডিগ্রি বগলদাবা করেছে অনুমান করা যায় ।

কত কথাই তো মনে আসে , সব কি বলা যায় ? যায়না ।

এবার দে দৌড় স্কয়ার হাসপাতাল । চিকিৎসক ভর্তি করার পরামর্শ দিলেন , পরীক্ষা নিরীক্ষা হল । জানলাম ব্রঙ্কো নিউমনিয়া , ক্যানোলা লাগিয়ে ইঞ্জেকজনের পর ইঞ্জেকশন , তিন ঘন্টা পর পর নেবুলাইজেশন । চিকিৎসা চলল ৬ দিন । আলহামদুলিল্লাহ , সুস্থ্য শিশু নিয়ে বাড়ী আসলাম ।

প্রশ্ন হয়ে রইল , ঐযে গলায় স্টেথস্কোপ ঝুলিয়ে রাখে সর্বক্ষণ , ভুলে যাতে কেউ ডাক্তার না ভেবে ব্রাদার ডেকে বসে !!! ঐটা কানে লাগিয়ে শিশুটির বুক পরীক্ষা করে শ্বাস কস্টের আলামত দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়ে রাত ২টার সময় বলে দেয় , অন্য কোথাও নিয়ে যান , আমরা পারবোনা । শালা কি বা-র ডাক্তারি পড়ছ ? এই রোগ ধরতে পারনা ? চিকিৎসা দিতে জানোনা । মনে মনে বললাম , শালা পুলিশের থেকেও খারাপ !!!

এবার মেডিক্যাল ভরতিচ্ছু আন্দোলনরত ন্যাতা ন্যাত্রি ভাই ও বোনেরা —–

তোমরা যারা গাট্টি বোচকা নিয়া রাস্তায় এসে চূড়ান্ত আন্দোলন করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে ‘দাক্তাল’ হওয়ার জন্য জীবনপাত করছ , পুলিশের বুটের লাথি খাচ্ছ , ডান্ডার বাড়ি খাচ্ছ । তোমরা বাড়ী যাও , বাবা মাকে বলো—– বাবা ,মা তোমাদের প্রতিজ্ঞা , তোমাদের জীবনের একমাত্র স্বপ্ন পূরণ করে আমরা ‘দাক্তাল’ হতে গিয়েছিলাম । এবার আমরা মানুষ হতে চাই । আরও অনেক বিষয় আছে পড়ার । সেগুলো থেকে একটা বাছাই করে পড় । নামের বামে ‘ ডাঃ ‘ না হোক ‘ ডঃ ‘ ওতো থাকতে পারে ।

ব্যাক্কল পোলাপানরে কে বুঝাইবো ,— আন্দোলন কইরা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কিনা মেডিক্যাল পইড়া ডাক্তার না হইতে পারো , মানুষ হও । তোমাদের জন্য আমার শুভকামনা ।

বিঃ দ্রঃ – এই পোস্টে আমার লেখার কোন অংশের সাথে যদি কারো ব্যক্তিগত বা কর্ম-জীবনের কোন অংশ ঘটনা ক্রমে মিলে যায় , ক্ষমা করবেন । এটি নাগরিক জীবনের অনেক অসংগতির একটি ।এরকম রুঢ় বাস্তবের সামনা সামনি আপনিও হতে পারেন ।অসম্ভব নয় ।