ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

নো নো , লেট মি আস্ক, হু দ্যা হেল ইজ দিজ গাই?
উপরের বাক্যটি আজ গভঃ ল্যাব বয়েজ হাই স্কুলের সামনে দাঁড়ানো অভিভাবকদের জটলায় এক ক্ষুব্ধ পিতার, যার সন্তান জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে । চিৎকার শুনে জটলার সামনে এগিয়ে আসলাম পরিষ্কার ভাবে বোঝার জন্য ঘটনা কী ।

পরীক্ষা চলছে । সন্তানদের পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে আসা অভিভাবকগণ পরীক্ষা শেষে সন্তানকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য এখানেই অবস্থান করেন তিন ঘন্টা । তাঁরা সমসাময়িক ঘটনাবলির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এরকম জমজমাট আড্ডায় । এরকমই একটি জটলায় বেশ বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা শুনতে আরও জনা পঁচিশেক অভিভাবক শ্রোতা কাম বক্তা হয়ে থাকেন । ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল আলোচনার মধ্যেই হঠাৎ এক ভদ্রলোক ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন । চিৎকার করে বলে উঠলেন, হু দ্যা হেল ইজ দিজ গাই? লেট মি আস্ক,হু ইজ ইমরান? সবাই চুপ হয়ে গেলো ।

ভদ্রলোক বলে চললেন, সোয়া তেইশ লাখ জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবকরা এ বৎসর  নি:শঙ্কচিত্তে ছিলেন, আগের তিন-চার বছরের মত রাজনৈতিক হানাহানি নেই, এবার পরীক্ষা হবে শান্তিতে। কিন্তু একি হলো? তেইশটার মত পোলাপান শাহবাগে বসে তেইশ লাখ ছেলেমেয়ের পরীক্ষা বন্ধ করে দিলো । কেউ টু শব্দটি করলো না। দেশের আইনে ইমরানের মত যে কেউ কি ইচ্ছা করলেই হরতালের মত কর্মসূচি দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করতে পারে? ইমরান কোন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র নয়, কিসের বলে সে হরতালের মত কর্মসূচি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে? কে ওকে অথরাইজ করছে? কে ওর জ্বালানির যোগানদাতা?

পিনপতন স্তব্ধতা। আশেপাশে থাকা পরীক্ষার্থীদের মায়েরা এগিয়ে এলেন শোরগোল শুনে। এক ভদ্রমহিলা বললেন, আমি টেলিভিশনে দেখেছি ইমরানের সঙ্গে বড় জোর পঞ্চাশটা ছেলেমেয়ে ছিল। আমরা এখানে এই জটলাতেই আছি পঞ্চাশের উপর মানুষ । আমাদের মধ্যে অনেকেরই গণজাগরণ মঞ্চের সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গে অংশ নিতে প্রতিদিনের কিছু অংশ শাহবাগের জন্য বরাদ্দ থাকতো। সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে শাহবাগের জ্বালানি ছিলাম আমরা লাখো জনতা। আমাদের প্রাণের দাবি আমরা কিছুটা হলেও আদায় করতে পেরেছি, অপেক্ষায় আছি বাকি অংশ পূরণ হবে। কিন্তু এখন কতিপয় সুবিধাবাদীর কারণে শাহবাগে পঁয়ত্রিশ জন জোগাড় করতেও ইমরানকে গলদঘর্ম হতে হয়। সেই ইমরান তেইশ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষার দিন হরতাল ডেকে বসে অবলীলায়, সরকারের একটা মন্ত্রী টু শব্দটি করলো না। আরও লাই দিয়ে ইমরানকে মাথায় তুলে পরীক্ষা পিছিয়ে দিলো চার ঘন্টা। খালেদার আগুন সন্ত্রাসের হরতালের সময় শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে পরীক্ষা হবে বলে পরে পিছিয়ে আসতো নিরাপত্তার কথা বলে। কিন্তু অদ্ভূদ! এবার শিক্ষামন্ত্রী নিজেই হরতালে শামিল হয়ে গেলেন, পরীক্ষা চার ঘন্টা পিছিয়ে দিয়ে। ছি! কি লজ্জা!

ইমরান অবলীলায় বলে দিলো ব্লগার হত্যাকাণ্ডের পিছনে সরকার এবং পুলিশের হাত আছে । কী মারাত্মক পর্যবেক্ষণ ইমরানের! ইমরানকে পুলিশ কেন তদন্তের দায়ভার দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে না ? হত্যাকাণ্ডের একদিনের মধ্যেই ইমরান এমন বক্তব্য দিতে পারলে আমরা কেন পুলিশকে ইমরানের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারবো না?

শুনে থ বনে গেলাম । সরকার কি জনগণের মনের ভাষা পড়ার মত অবস্থায় নেই? হত্যাকাণ্ডকে কোন স্বাভাবিক মানুষ সমর্থন করে না। জঙ্গি-খুনিদের হাতে নিহত প্রকাশক এবং আহত ব্লগারদের যারা কুপিয়েছে তাঁদের যদি জনসমর্থন থাকতো তাহলে খুন করে বুক ফুলিয়েই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতো, চোরের মত পালিয়ে যেত না । খুনিরা সবার কাছেই ঘৃণার পাত্র । তাঁরা যাদের খুন করছেন সেই মুক্তমতের প্রবক্তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে অন্যদের বিশ্বাসের গভীর দূরত্ব থাকলেও মুক্তমনাদের হত্যা করার বিষয়টি কেউ ভালভাবে নেয়না। এটি জঘন্য অপরাধ, জঙ্গিরা যা করছে ।

আমার মনে প্রশ্ন আসলো, কাল শহরের কদমতলিতে ছয় বছরের একটি শিশুকে ঘরে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দূর্বৃত্তরা, সঙ্গে একই কায়দায় আরও তিনজনকে কুপিয়ে আহত করেছে। এখানে এই শিশুটির করুণ মৃত্যু কি কোন একটি নাগরিকের মনে ঝাঁকুনি দিতে পারেনি? এখানে ইমরানকে কি আমরা আশা করতে পারি? ইমরানের সঙ্গী ঐ পঁয়ত্রিশ জনের একজনও কি একটি প্রতিবাদ করেছে? কেউ কি ইমরানকে জিজ্ঞাসা করবেন, কেন এই শিশুটিকে কুপিয়ে মারার প্রতিবাদে হরতাল দেওয়া হবে না?

এখন সময় এসেছে, সরকারকে এখুনি এই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ষোল কোটি মানুষের এই দেশে হরতাল ঘোষণা করার মত যুক্তিসঙ্গত গনতান্ত্রিক অধিকার কার আছে? আর কার নেই?

না হয়, কাল রাস্তার কাগজ কুড়ানো ছেলেটিও কোন কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে বা কোথাও থেকে জ্বালানি পেয়ে হরতালের মত কর্মসূচি ঘোষণা করে বসবে। অথবা কোন টোকাই কর্তৃক ঘোষিত হরতালের কারণে রাষ্ট্রীয় আচার অনুষ্ঠান, সরকারি দৈনন্দিন কার্যতালিকা পিছিয়ে দেবার রীতি চালু হয়ে গেলে অবাক হবার কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না? এমনটি হলে আমি তো ভাই অবাক হবো না।

অথবা শাহবাগের আন্দোলনকে খেলো করার জন্য, হাস্যস্পদ করার জন্য কেউ কি ইমরানকে জ্বালানির জোগান দিচ্ছে? এখন সময় এসেছে প্রশ্ন করার। সরকারের মন্ত্রীদের কাছে আমার প্রশ্ন, আজ যদি লন্ডনে বসে খালেদা এই খুনের প্রতিবাদ স্বরূপ আধা বেলা হরতাল ঘোষণা দেন, আপনারা কী বলবেন? গলা ফাটিয়ে চেঁচাবেন না? কবে ঘুম ভাঙ্গবে আমাদের? কে কখন সেই ভদ্রলোকের মত ফুঁসে উঠবেন – হু দ্যা হেল ইজ দিজ গাই বলে?

এখনি ভাবতে হবে । হরতাল শব্দটি খালেদার মুখ দিয়ে বেরুলে অবৈধ, ইমরানের হরতাল সরকারি অনুমোদনে সিক্ত । ছিঃ ছিঃ! খুব খারাপ আলামত!