ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অসহায় সরকারের বাঘা বাঘা কর্তা- আমলারা, অসহায় পুলিশ, অসহায় সিটি কর্পোরেশনের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মেয়রদ্বয়।

হ্যাঁ এরা সবাই প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী শুধু বাপ-মা মরা এতিম ঢাকাবাসী আম জনতার সামনে।

এরা অসহায় বাস ড্রাইভারের সামনে, এরা অসহায় কিশোর বয়সি লেগুনা ড্রাইভারের সামনে, আরেক যায়গায় এরা অসহায় ভ্যাড়া- তা হল ঘরের বউয়ের সামনে। ওদের ঘরের বউ আর এই বাস ড্রাইভার, লেগুনা ড্রাইভারদের মূল্য মর্যাদা ওদের কাছে একই। দুইটা জিনিস একটা আরেকটার পরিপূরক। তাই কোনটাই মর্যাদার প্রশ্নে কারো চেয়ে কেউ কম নয়।

প্রতিদিন সরকারের হোমরা চোমরা মন্ত্রী, নেতা, আর পুলিশের ছোট থেকে বড় সব স্তরের ভিখারিদের জন্য রাস্তায় যে চান্দা বা ‘তোলা’ ওঠে তা সারা ঢাকা শহরের পেশাদার ভিখারিদের ‘তোলা’ থেকে কোনো হিসাবেই কম হবেনা। ‘তোলা’ শব্দটি অনেকেই ভিক্ষার সন্মানজনক প্রতিশব্দ হিসেবেই জানে।

এই ভিক্ষা বা ‘তোলা’ কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোন বিশাল হৃদয় দানশীল ব্যক্তির দানের অর্থ নয়। প্রতিদিন এই ভিক্ষার জোগান দিয়ে যাচ্ছে বাস ড্রাইভার আর লেগুনা ড্রাইভারদের মত চুনোপুঁটিরা। এই ভিক্ষার টাকা দিন শেষে গিয়ে উঠছে মন্ত্রী, পুলিশ, নেতা এবং হোমরা চোমরাদের বউদের হাতে। এই ভিক্ষার অংকের উঠা নামার সংগে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে ভিক্ষা খেকোদের সংসারের সুখ শান্তি, এমনকি রাতের সোহাগ আহ্লাদ এর পারদও এই ভিক্ষার টাকার অংকের কমবেশির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

সকালে দেখবেন ৩০ হাজার টাকা বেতনের সরকারি কর্মকর্তার বউ শপিং এ ছুটেছে ৩০ লাখ টাকা দামের গাড়ী নিয়ে। সামনে উইন্ড শিল্ডের এক পাশে একটা প্রিন্টেড কাগজে লেখা থাকে “–শ” বা “ম্যা–ট”। আবার পাশাপাশি সময়ে ওনাদের ছেলে এবং মেয়েদের সঙ্গেও আছে আরেকটি করে নিদেনপক্ষে “করল্লা”। জী জনাব, এগুলোও ভিক্ষার টাকায়ই খরিদ করা, বেতনের টাকায় নয়। কপালদোষে পাপের বোঝা যখন অসহনীয় হয়ে কোন জায়গায় ধরা খায় তখন বলে — এই গাড়িগুলা আমার শ্বশুর গিফট করেছে। কিছুদিন আগে এরকম এক ঘটনার পর আমার এক নিকট বন্ধু ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল — এই “মাদার–দের” বাচ্চা, এমন শ্বশুর আমরা কোথাও খুইজ্জা পাইনা ক্যানরে?

প্রতিমাসে ঢাকা শহরে বাস চাপা পড়ে কয়েকজন মানুষ মরে যাচ্ছে, লেগুনা ধাক্কা মেরে পুরুষ মহিলা শিশু পথচারী, রিকশাযাত্রীর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে। কারো টু শব্দটি নেই। এমনকি পত্রিকার সাংঘাতিক রকমের ক্ষমতাশালী সাংবাদিকরাও মুখে কুলুপ এঁটে থাকে।

এর কারণ কি? কারণ একটাই — সবাই সকালে আশায় থাকে বাস ড্রাইভার, লেগুনা ড্রাইভারদের হাত যেন খোলা থাকে। ওরা যেন সরকারের মন্ত্রীর ওপর না চটে, ওরা যেন পুলিশের ওপর রেগে না যায়, ওরা যেন নেতাদের খোরাকী বন্ধ করে না দেয়। তাহলে প্রতিদিন যদি দু চারটা মানুষ ওরা থেঁতলে মেরে ফেলে, তাতে কি ই বা এমন এসে যায়? মেরে ফেলুকনা।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধে মাঝেমধ্যে। মানুষের পাশাপাশি ওরা না জেনে কখনো কখনো পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেটও মেরে ফেলে। এই যেমন আজ ক্ষিলক্ষেতে দুই বাসের চিপায় চিড়াচ্যাপ্টা হয়ে নিহত হয়েছেন একজন অবঃ ম্যাজিস্ট্রেট এবং তার পরিবারের আরও দুই সদস্য। কিছুদিন আগে ঈদের ছুটিতে সপরিবারে বাড়ি যাবার সময় ফেনিতে এক পুলিশ সার্জেন্ট এবং তার পরিবারের কয়েক সদস্য প্রাইভেট কারের ভিতর বাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছিলেন। ড্রাইভারগুলো হিসাব কষে মানুষ মারতে পারেনা? শালার ব্যাটারা এটাও বুঝেনা, কোনটা মানুষ মারছে আর কোনটা ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ।

আবার এরকম হতে পারে, বাস ড্রাইভার ট্রাক ড্রাইভার লেগুনার কিশোর ড্রাইভার ১৭(-) দের সঙ্গে এই যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, মাঝে মধ্যে যদি দুএকজন পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট মেরে ফেললেই কি পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট সহকর্মীদের হৈ হৈ করে উঠতে হবে? ছিঃ এটাকি বন্ধুত্বের পরিচয়।

আরে ভাই আপনি আবার আমাকে ভেজাইল্লা প্রশ্ন করবেননা বলে দিচ্ছি। আপনার চোখমুখ দেখেই আমি বুঝেছি আপনি বলতে চাচ্ছেন- ঐ মিয়া! ১৭(-) মাইনাস বয়সের লেগুনা ড্রাইভারের সাথে আবার পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট দের দোস্তি হয় ক্যামনে?

শোনেন ভাই, ঐ ভাইরা না বললেও ভাবীদের গিয়ে জিজ্ঞেস করেন বন্ধুত্ব হয় কি দিয়ে? বয়স আর অবস্থান বিচার করে কি বন্ধুত্ব হয়? ট্যাকা, ভাইরে ট্যাকা। ভাবীরা সহজ সরল মানুষ, সত্য কথা বলে দিবে।

লেগুনা ড্রাইভারদের মানুষ মারতে (ঢাকায় গাড়ী চালাতে) কোন রকম লাইসেন্স লাগেনা, বাসের ড্রাইভারদের মত স্বাধীনতা ঢাকা শহরের বাসিন্দা ট্যাক্সপেয়াররাও ভোগ করতে পারেনা। ওরা পুলিশের চেয়েও বেশী ক্ষমতাধর। বাসের ড্রাইভাররা রাস্তার মাঝখানে, আইল্যান্ডের পাশে কাত করে ত্যাড়া করে, সকলের রাস্তা আটকে দিয়ে যখন যেখানে খুশী দাঁড়াতে পারে। পুলিশের বাপেরও! ক্ষমতা নাই ওদের কিছু বলে। রাস্তায় মানুষের গায়ের ওপর বাস তুলে দিবে, আপনি টু শব্দ করতে পারবেন না। ওরা এমন ভাবে গাড়ী চালাবে যে, আপনি নিজ দায়িত্বে দৌঁড় দিন নইলে চাকার নীচে পড়ুন।—– এই সব কিছু স্বাধীনতার বিনিময়ে রাতে ভাবীদের হাতে যা কিছু ওঠে তা কম কিসে?

মারুকনা দুই চারটা নগরবাসী মানুষ। প্রতিদিন তো আর পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট মারেনা ওরা। আর ওদের দোষ দিবো কেন? (এটা ভেবে লজ্জা পাবেন না ) ৪৫ বছর বয়সের একটা দেশের রাজধানীতে বাস চালাতে লাইসেন্স লাগেনা, লেগুনা চালাতে লাইসেন্স লাগেনা, দৈনিক ভিক্ষা দিলেই হয়! কিন্তু আপনি সাইকেল/ মটর সাইকেল চালাতে রাস্তায় বের হন, দেখবেন আপনার দিকে শকুনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পুলিশ। আপনি পনেরো মিনিট ধরে জ্যামে/ সিগনালে বসে আছেন আপনার গাড়ীর ড্রাইভিং সিটে, দেখবেন হঠাৎ করে নায়ক সুলভ হাটা দিয়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট আপনার দিকে এগিয়ে এসে বলবেন, সিট বেল্ট কোথায়? দেন তো গাড়ীর কাগজ পত্র।

আবার কোন বাস ড্রাইভার/ ট্রাক ড্রাইভার/ লেগুনা ড্রাইভার (অবশ্যই অপ্রশিক্ষিত এবং লাইসেন্স ছাড়া) রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কপালদোষে কোর্ট পর্যন্ত গেলো। ঐ পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেট মিলে ফন্দিফিকির বের করে অভিযুক্ত ড্রাইভারের দায়মুক্তির বন্দোবস্ত করে দেয়। সেই ড্রাইভার দ্বিগুণ সাহসে গাড়ী চালিয়ে আবার মানুষ অথবা পুলিশ / ম্যাজিস্ট্রেট চাপা দিয়ে মেরে ফেলে। কারণ ঐ ড্রাইভার জানে ভালো করেই — শেখ হাসিনার ক্ষমতাও নাকি নাই ওকে কিছু বলে।

অতএব মরেন বাসের নীচে পড়ে বা চাপা খেয়ে, ফ্যামিলি সহ মরেন। একটু প্যাঁ করারও সময় পাবেন না।

নগরপিতাদ্বয় —– আপনাদের দায়িত্ব কি নগরবাসীকে রাস্তায় থ্যাঁতলানো থেকে বাঁচানো? না কি বাস ড্রাইভার আর লেগুনা ড্রাইভারদের নগরবাসী হত্যার লাইসেন্স দেওয়া? রিক্সার (সংখ্যা) কথা নাই বললাম।

নগরপিতা হয়ে যদি নগরবাসীকে এ থেকেও বাঁচাতে না পারেন, তো আগামীতে আর নগরবাসীর দরজায় পা রাখবেন না প্লিজ। এগুলো করতে ফান্ড লাগেনা, সদিচ্ছা লাগে, আর লাগে লজ্জাবোধ।

পরিশেষেভুল বানান সংশোধনী এবং ব্যাকরণ শুদ্ধিকরণ সাদরে গ্রহণীয় জানবেন।