ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

বেশ কিছুদিন আগে একবার অফিসের কাজে বগুড়া গিয়েছিলাম। কাজ শেষ করে চলে গেলাম আমার জন্মস্থান নানাবাড়িতে। আমার নানাবাড়িটি যে গ্রামে অবস্থিত তার পাশ দিয়ে চলে গেছে ঢাকা- রংপুর হাইওয়ে। গ্রামটি খুব ছোটো। ছোটো বেলার অনেক আনন্দের সময় কেটেছে ঐ গ্রামটিতে। তো সেদিন প্রচণ্ড গরম ছিল। আমরা মামাতো- খালাতো ভাই সব মিলিয়ে দশ বারোজন গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিলাম। আড্ডা শেষে ঠিক হোল আজ আমরা উন্মুক্ত আকাশের নীচেই রাত কাটাবো। আমার নানা বাড়িটি অনেক জায়গা জুড়ে এবং চারিপাশে খোলামেলা। যে কারণে আমরা বাড়ির বাইরের বিশাল খোলা জায়গায় উঁচু করে খড় বিছিয়ে মোটামুটি একটা বিছানা বানিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নীচে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোরের দিকে বিকট একটা শব্দে আমাদের সবার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। দূর থেকে মানুষের চিৎকার আর আর্তনাদ শুনতে পেলাম। আমার এক মামাতো ভাই হাইওয়ের দিকে দৌড়াতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলো –তোরা চল, গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়েছে।  আমরাও ওর পেছন পেছন দৌড়াতে শুরু করলাম।

যখন দৌড়াচ্ছিলাম তখন বুঝতে পারিনি কতটা ভয়াবহ, কতটা হ্রদয়বিদারক একটা সড়ক দুর্ঘটনা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে হবে। ব্রিজের রেলিং ভেঙ্গে ঢাকা রংপুরগামী একটি বাস গভীর খাদে পড়ে গিয়েছিলো। সেই প্রথম আমি কোন উদ্ধার কাজে অংশ নিতে পেরেছিলাম, সেদিন কিছু হতভাগ্য মানুষকে উদ্ধার করতে পেরেছিলাম। তাদের মধ্যে কেউ জীবিত ছিলো। কেউ ছিলো মারাত্মকভাবে আহত। এরকম মারাত্মক আহত এক ছেলেকে দূমরে মুচরে যাওয়া বাস থোকে বের করার সময় ওর শার্টের বুক পকেট থেকে একটা চিঠির খাম নীচে পড়ে যায়। খামটি রক্তে ভিজে লাল হয়ে গিয়েছিলো । খামের ভিতর চিঠিটাও ছিলো রক্তে ভেজা। ছেলেটির অবস্থা ছিল খুবই আশঙ্কাজনক। শেষ পর্যন্ত ছেলেটি বেঁচে গিয়েছিলো কিনা আর জানা হয়নি। উদ্ধার কাজ শেষ হবার পর আমি সেদিনই ঢাকায় চলে এসেছিলাম।

সেই আহত ছেলেটির রক্তে ভেজা চিঠিটা আমার কাছে রয়ে গিয়েছিলো। এখনও আছে। চিঠিটা হয়তো সে তার খুব প্রিয় কারও কাছে লিখেছিল। খামে ঠিকানা লেখা ছিলোনা। তাই আমি পোস্ট করতে পারিনি। আজ অনেকদিন পর চিঠিটা আবার পড়লাম। ভাবলাম চিঠিটা আমি ডাকে পোস্ট করতে পারিনি তাতে কি হয়েছে? অনলাইনে পোস্ট করবো । এমনও হতে পারে ছেলেটি হয়তো বেঁচে আছে। তার কাছে পৌঁছে যেতে পারে। আবার এটাও তো হতে পারে যাকে উদ্দেশ্য করে চিঠিটা লিখেছিল ছেলেটি তার কাছেও পৌঁছে যেতে পারে। চিঠিটার একটা নামও দিলাম। “রক্তে ভেজা এক ভালবাসার চিঠি“। চিঠিটা ছিল ঠিক এইরকম –

আমার হৃদয়ের অতীব গভীরে, যে অস্পৃশ্য অবিনশ্বর রুহ আছে, সেই রূহর প্রতিটি বিন্দু থেকে তোমাকে ভালোবাসি। তোমার রুপ অবয়ব বা যৌবন নয়, তোমার মনটাকে ভালবাসি। কারন ভালোবাসা মানে তো নয় শুধু রূপ যৌবনের লোভ। ভালোবাসা মানে নিজের অস্তিত্বকে, নিজের সত্ত্বাকে তোমার মাঝে খুঁজে পাওয়া । যাকে ছাড়া আমি অপূর্ণ।

আমি জানিনা মানুষ কেন বলে ভালবাসায় অনেক কষ্ট। পাওয়া না পাওয়ার বেদনা। তারা হয়তো জানেইনা ভালোবাসা আসলে কি। তাদের হয়তো সে ধৈর্যই ছিলোনা সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজে পাবার। নিজের জোর করে তৈরি করা ভালোবাসায় আবদ্ধ তারা। তা না হলে তারা জানতো, সত্যিকারের ভালোবাসায় চাওয়ার কিছু থাকেনা। থাকে না , না পাওয়ার দুঃখ। ভালোবাসা মানে নিজের কাছে হার মানা নয়। নয় স্রেফ পছন্দ হয়েছে একজনকে তাই তাকে বশে আনা। ভালোবাসা মানে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া। ভালোবাসা মানে নিজের সব সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে ভালবাসার মানুষকে খুশি করা।

ভালোবাসা মানে একা থাকা। ভালোবাসা মানে অপেক্ষা করা। একদিন আয়নার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া। যাকে পেলে এমনিতেই মনের সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়। নিজের মন সত্ত্বার প্রতিরূপ খুঁজে পেয়ে বিকশিত হয় অপার আনন্দ। তোমার কাছে কিছু চাওয়ার সাহস নেই আমার। আমি বরং তোমার কাছে নিজেকে দিয়ে দিলাম। তুমি আমার প্রসারিত বাহুডোরে না আসো, যদি আমাতে তুমি নিজেকে দিতে না চাও, তবু আমার সব কিছু তোমার।

আমি জানি তুমি আমার। কারন তুমি যদি আমার সে না হও, তবে কেন তোমাকে দেখলে এতো ভালো লাগে। তবে কেন তোমার সাথে একটু কথা বললে ভুলে যাই মনের সব কষ্ট । তুমি যদি আমার সে না হও, তবে কেন তোমার জন্য পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে একা দাঁড়াতে দ্বিধা নেই আমার। আমি যদি তোমার জন্য না হই, তবে হৃদয় কেন বলে হ্যাঁ, আমি তোমার জন্য। আমার মস্তিস্কে কেন শুধু তুমি। কেন আমার স্বপ্নে শুধু তুমি। আমার হৃদয় কেন অবিচল, সবসময়, তোমার পক্ষে।

আমি কখনো তোমার হাত ছুঁয়ে দেখিনি। কখনো একসাথে আকাশ দেখিনি। একসাথে কখনো বৃষ্টিতে ভিজিনি। তবু তোমায় ভালোবাসি। কোনকিছু ছাড়াই ভালোবাসবো।মৃত্যু পর্যন্ত… মৃত্যুর পরেও…।

যুগে যুগে ভালবাসা নিয়ে অনেক কাব্য হয়েছে। হয়েছে অনেক সাহিত্য। হয়েছে কতো গল্প, কবিতা গান। অনেক প্রান বিসর্জিত হয়েছে এই ভালবাসার জন্য। তবুও একটা প্রশ্ন কখনোই শেষ হয়না। ভালবাসা আসলে কি? এই চিঠিতে ছেলেটি তার মনের মতো করে ভালবাসার মানে খুঁজেছে। হয়তো মনের মানুষের কাছে তার ভালবাসার আকুতি কখনো পৌঁছায়নি, কখনো হয়তো পৌঁছাবেও না। কিন্তু নিজের মনের রঙেই সে রাঙিয়েছে তার ভালবাসাকে। ভালোবাসা আসলে তাই। ভালবাসার আলাদা কোন রঙ নেই, মনের রঙেই তাকে রাঙ্গাতে হয়।