ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

চাঁপা আগুন।

অনেকদিন আগের কথা। একবার বঙ্গবাজার থেকে একটা বাসে উঠে বসলাম। বাসটি আজিমপুর হয়ে নীলক্ষেত দিয়ে মিরপুর যাবে। বাসে অনেক যাত্রী ছিল। স্কুল লাইফ থেকেই শিক্ষক ও বন্ধুদের দেয়া একটা তকমা গায়ে আঁটা ছিল। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Absent Minded‘। এখন চিন্তা করি আসলে ওরা সঠিক তকমাই দিয়েছিলো।

বাসে ওঠার পর সেদিনও অন্যমনস্ক ছিলাম। তিন জন লোকের কিছু কথাবার্তা বার বার কানে আসছিলো আবছা আবছা। প্রথমে গুরুত্ব দেইনি । কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটাতে নাক না গলিয়ে পারিনি। তাদের কথা বার্তার কিছু অংশ উল্লেখ না করলে অনেকের কাছে ঘটনা পরিস্কার হবে না। তাদের কথোপকথন ছিল অনেকটা এই রকম –

প্রথম বাক্তি কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে – আমারে ছাইড়া দেন স্যার, আমি গরীব মানুষ, গাঁয়ে খাইটা খাই। কোন অবৈধ কাজ করি না। আমার কাছে কিছুই নাই।

দ্বিতীয় বাক্তি, প্রথমজনের সামনের সিটের ডান পাশের সিটে বসা, অনেকটা ধমকের সুরে প্রথমজনকে – চুপ ব্যাটা, তোর সম্পর্কে আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে। তোর কাছে ডাইল (ফেনসিডিল) আছে। তুই নাম এখানে, নইলে সামনে আজিমপুর থানা। আমরা কইলাম ডিবির লোক। একেবারে সোজা থানায় নিয়ে যামু।

তৃতীয় বাক্তি, দ্বিতীয় বাক্তির পাশে বসা। সেও আরও জোরে ধমকের সাথে প্রথমজনকে একই কথা বলল। এই দুই জনের ধমকে প্রথমজনের দফারফা অবস্থা। বাসের যাত্রীরা চুপ। সবাই তাদের কথাগুলো মনে হয় গিলছিলো। লোক দুটো বারবার নিজেদের ডিবির লোক বলে পরিচয় দিচ্ছে। আমার সন্দেহ হল। কারণ ডিবির কার্যক্রমের ব্যাপারে আমার কিছুটা ধারণা ছিল। প্রকৃত ডিবির লোকের বারবার নিজেদের ডিবির পরিচয় দেয়ার কথা নয়।

আমার মনে হল, ডালমে কুচ কালা হ্যায়। তাই সাহস করে চ্যালেন্জ করে বসলাম। ভাই, আপনারা ডিবির লোক, খুব ভালো, তাহলে আপনাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে ওনাকে নিয়ে যান।

আমার কথা শুনে ওই দুই ব্যক্তির একজন কিছুটা রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো – কী বললেন? আমাদের ক্ষমতা কতোটুকু জানেন?

অতীব ঠাণ্ডা গলায় বললাম – জ্বি জানি। তাই আমি আইডি কার্ড দেখাতে বলেছি।

এতক্ষণ নীরব হয়ে থাকা অন্যান্য যাত্রীরাও তাদের নীরবতা ভাঙিয়ে একসাথে বলে উঠলো – হ্যাঁ, উনি ঠিকই বলেছেন, আপনাদের আইডি কার্ড দেখান।

মুহূর্তের মধ্যে বাসের পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে গেলো। ডিবির পরিচয়দানকারী দুই ব্যক্তির তখন ’ছাইড়া দে মা, কাইন্দা বাঁচি’ অবস্থা। তারা আইডি কার্ড তো দুরের কথা, এক উকিলের একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমার হাতে দিল। আমি ভিজিটিং কার্ডটি উঁচু করে অন্যান্য যাত্রীদের দেখিয়ে বললাম- ভাই, এইটা নাকি ওনাদের ডিবির আইডি কার্ড।

ব্যাস, শুরু হয়ে গেলো গণধোলাই। মূলত ডিবি পরিচয়দানকারী লোকদুটি ছিলো ছিনতাইকারী। আর প্রথমজন ছিলো রংপুর থেকে আসা নীরিহ টাইপের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। প্রথমজনের কাছ থেকে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়াই ছিলো ওই দুই ছিনতাইকারীর উদ্দেশ্য। কিন্তু যাত্রীদের প্রতিরোধের কারণে ওদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিলো।

আসলে সেদিন আমার মতো বাসের অন্যান্য যাত্রীদের মনেও কিন্তু একই রকম ক্ষোভ ছিল। তাই যখন একজন প্রতিবাদ করে উঠেছিলে তখন অন্য সবার মনের জমানো ক্ষোভ প্রতিবাদ হয়ে বের হয়ে এসেছিলো। তাই সেদিন ফেসবুকের একটা স্ট্যাসে বলেছিলাম, চাপা আগুন সবার মনেই আছে, প্রয়োজন শুধু উসকে দেয়া।

slide