ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মানবাধিকার

তখন আমার বয়স ছয়-সাত হবে। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় যারা আদিবাসী হয়েই আমার মত জন্মেছিল তাদের কাছে দেশান্তর শব্দটি সেই সময়ের জন্য খুবই পরিচিত ছিল।  তখন অনেককেই দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে চলে যেতে দেখেছি। কিন্তু কী কারণে তারা চলে যেত তা ওই বয়সে বুঝিনি।

দেশান্তরের এই ছোট ছোট ইতিহাস এক সঙ্গে জড়ো করলে হয়তো কয়েক লাখ গল্প হবে। আর দেশান্তরের কারণগুলোকে বিশ্লেষণ করতে গেলে হবে হাজার পাতার বই।

এবারের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়, আদিবাসী জাতিসমূহের দেশান্তর: প্রতিরোধের সংগ্রাম। দেশে আদিবাসীদের উপর নির্যাতন আছে, তাদের উপর দিয়ে ঝড়-ঝঞ্ঝার শেষ নেই। ভূমি দখল আছে, জোড় পূর্বক ধর্মান্তরকরণ যেমন লেগে আছে ঠিক তেমনি আদিবাসীবান্ধব ব্যক্তি, দল, সুশীলদেরও অভাব নেই। ফলে আদিবাসী ইস্যু সারা বছরই নিউজ ফিডে, টেলিভিশন, সোশাল মিডিয়াতে থাকে।

৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে ঘিরে রঙিন ফিচার, বর্নিল সংস্কৃতির ফুলঝুরি সবখানে। আবার কোনও কোনও খবরের শিরোনামে বরাবরের মত লেখা  ‘ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী দিবস পালন’।

নব্বই দশকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নিকটবর্তী যেসব এলাকায় আদিবাসীরা বসবাস করতো সেসব এলাকার সিংহভাগ এলাকা থেকেই বাংলাদেশি আদিবাসীরা ভারতে দেশান্তর হয়েছে। তবে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়েই মাটি কামড়ে দেশে পরে থেকেছে বাকি আদিবাসীরা। অনেক সময়ই সীমান্তের অস্থিতিশীল অবস্থাও আদিবাসীদের দেশে থাকতে বাধ্য করেছে।

আবার ঐ একই সময়ে  ‘অ-আদিবাসীদের’ সৃষ্ট সমস্যাবাংলাদেশের বিভিন্ন দিক দিয়ে আদিবাসীদের দেশ ছাড়তেও বাধ্য করেছে। ভূমি সমস্যা যখন আদিবাসীদের কাছে প্রকট হয়ে দাঁড়ায় তখন দেশের সংখ্যালঘু হিসেবে দেশান্তর হবার মানসিকতা স্বভাবতই তাদের উপর জেঁকে বসে। আর সেই সুযোগটিই কাজে লাগায় স্থানীয় ভূমিদস্যু থেকে শুরু করে সুবিধাবাদীরা।

সংখ্যায় লঘু বলে আখ্যায়িত হওয়া এই আদিবাসী জনতা সংখ্যায় কম হলেও এক বছরে সংখ্যায় বহুবার রাজপথে দাঁড়ায় নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য। তাহলে সমস্যার সংখ্যাটি কত হতে পারে?

একটি আদিবাসী বিষয়ক সংস্থার জরিপ মতে নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০১৪ সালে পার্বত্য এলাকার বান্দরবান থেকে দেড়শ পরিবার মায়ানমারে দেশান্তরিত হয়েছে এবং সমতল এলাকার প্রায়  ৬০টি পরিবার ভারতে চলে গেছে।

এটি একটি ছোট্ট এবং খুবই ছোট্ট পরিসরের জরিপ। জরিপের বাইরে বিভিন্ন কারণে দেশত্যাগী আদিবাসীদের সংখ্যা অনেক বেশি হবে।

চলমান সাম্প্রদায়িক বৈষম্য তখনই প্রকট আকার ধারণ করে যখন কোনও রাজনৈতিক সমস্যা কোনও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সম্প্রীতির গোড়ায় বিষ ঢেলে যুগের পর যুগ স্বার্থ হাসিল করে আসছে; অন্যদিকে সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগরিষ্ঠ উভয় দলের ভেতর অশান্তি বিরাজমান থেকেই গেছে।

আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা আইন করার প্রস্তাব ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে এসেছে । কিন্তু বাস্তবায়ন হবে কিনা এটি সময় বলে দেবে।

বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস প্রায় এক যুগ ধরেই পালন করে আসছে দেশের আদিবাসী হিসেবে দাবি করা সকল জাতিগোষ্ঠী। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি এখনও উপেক্ষিত। দেশ কি জানে এখানে আদিবাসী রয়েছে?

‘অস্বীকৃত’ আদিবাসীদের নিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রও কি হতে পারে? শুধুমাত্র একটি স্বীকৃতির অভাব এবং যাচ্ছেতাই নামকরণের কারণে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিস্ফোরণ দেশের প্রেক্ষাপটকে দিনের পর দিন যেমন জটিল করেই চলেছে তেমনি পারস্পরিক আস্থাগুলো ভেঙ্গে খান খান হচ্ছে আমাদের চোখের সামনেই।

আমাদের শুধু আশার ভেলাতে বসেই দিন গুনতে হচ্ছে কবে আসবে সেই স্বীকৃতি? কবে আসবে স্বস্তি পাহাড়ে আর সমতলে?