ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

বড় আপার বিছানায় বালিশের তলা থেকে একটি বই উঁকি দিয়েছিল। বইটির গায়ে লেখা ‘ভয়।’ তখন আমি ভয় পেতে ভালবাসি। কিশোর তারকালোক পড়ে পড়ে ভয় পাই, একা ঘরে থাকি তাই রাতে আরো বেশি ভয় পাই। কিশোর তারকালোকের হরর সংখ্যা বেড়ুলো আর কাকতালীয়ভাবে আমারও টাইফয়েড শুরু হলো। সে কী বদনাম! সে কী কুৎসা! ভুতের গল্প পড়ে টাইফয়েড বানাস, তোর ভয় পাবারও যোগ্যতা নেই। আমিও তাই বিশ্বাস করলাম। হরর-টরর পড়েই টাইফয়েড হয়েছে। কিন্তু পড়ে জানলাম টাইফয়েড কোন হররজনিত রোগ না, পরজীবীজনিত।

যাই হোক, ‘ভয়’ পড়ে ভয় পেতে চাইলাম। গোপনে পড়তে শুরু করলাম। কারণ আমাদের বাসায় এ ধরণের বই মানেই ‘আউট বই’। ছোট বাচ্চা তো দূরের কথা বড় বাচ্চারাও এগুলো লুকিয়ে পড়ে। তাই আপার বালিশের তলা থেকে এই বইয়ের উঁকি মারাকে একটা দুর্ঘটনাই বলবো।

দুর্ঘটনাক্রমেই ‘ভয়’ পড়তে শুরু করলাম। কিন্তু কিসের ভয়, কিসের কী! বই ভর্তি খালি তেলাপোকা। ‘ভয়’ পড়া শেষ হলো কিন্তু ভয় পেলাম না। যা পেলাম তা হলো, এক লোকের স্ত্রী জাগাবেজাগায় খালি তেলাপোকা দেখে, সে নিয়েই যত কাণ্ড। তাই ধাঁধায় পড়ে গেলাম। কী সব লোক! বই লেখে অথচ নামের সাথে কাহিনীর মিল নাই। কিন্তু হঠাৎ করেই চোখে পড়লো বইয়ের ভেতরে নাম লেখা রয়েছে ‘পোকা’। সাথে সাথে মলাট দেখলাম, সেখানে লেখা ভয়। তাজ্জব ব্যাপার! পড়ে বুঝলাম কোন কারণে ছাপা খানা থেকেই ভয়ের মলাট পোকায় গেছে, হয়তো পোকারটা গেছে ভয়ে। বিষয়টা আরো নিশ্চিত হতে পেরেছিলাম যখন পোকা নামক বইটা আমি আবিস্কার করেছিলাম আরো অনেক পরে, অন্য এক বাড়িতে। যতদূর মনে পড়ে, পোকার মলাটে সম্ভবত খানিকটা লাল রঙ আছে।

এভাবেই হুমায়ূন আহমেদের সাথে আমার পরিচয়। বিটিভিতে আমি তার বহুব্রীহি দেখেছি, অয়োময় দেখেছি। কিন্তু এগুলো কার বানানো, কার লেখা সেটা আমাকে ভাবিত করেনি। এটা বয়সের ব্যাপার ছিল, অবজ্ঞা নয়। কিন্তু পরিচয়ের পর খুব যে বেশি হুমায়ূন পড়েছি তা ঠিক নয়। হাতে গোনা কয়েকটা বই আমি পড়েছি। এই বইগুলো পড়েই আমি হিমুকে চিনেছি, মিসির আলিকে চিনেছি। তার একটা বইয়ের নাম হয়তো ‘শূন্য’। ওটাতে মিসির আলি সম্পর্কে বেশ ভাল একটা ধারণা আমি পেয়েছিলাম। ওই বই পড়েই আমার পরিচয় ঘটেছিল ফিবোনাক্কি সংখ্যার সাথে। ভেবেছিলাম এটা তার পাগলামি, বানানো। কিন্তু পড়ে যখন জানলাম বাস্তবেও এ নামে একটি সংখ্যা রীতি আছে তখন তার সম্পর্কে আমার ধারণা অনেক বদলালো। মিসির আলির চরিত্র আমার কাছে পাগলামি মনে হয়নি, উদ্ভট মনে হয়নি। ওই চরিত্র আমার ভাল লেগেছিল। কারণ আমিও নিঃসঙ্গতা প্রিয় ছিলাম। মিসির আলি পড়ে আমার মনে হলো, এমন গল্প যে বলতে পারে সে বানিয়ে বলে না, সে নিজের কথাই বলে। আমার মনে হলো, এই লেখক লোকটাই মিসির আলি। সেই ধারণা আমি এখনো পোষন করি।

হুমায়ূন আহমেদের আরো একটি সৃষ্টি আছে। সে হিমু। কিন্তু হিমুকে নিয়ে আমি যতগুলো বই পড়েছি আমার মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ হিমু নন। আমার বার বার মনে হয়েছে, হিমু নয়, হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলির সাথেই বেশি ঘনিষ্ঠ।

গত বছর অক্টোবরে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। নোবেল ক্যাম্পেইন ধর্মী। আজ আবার লিখলাম। তখন তিনি ছিলেন মার্কিন মুল্লুকে চিকিৎসারত, আর এখন যখন লিখছি তখন তার চিকিৎসা সমাপ্ত হয়েছে। কারণ মিসির আলিদের চিকিৎসা করার সাধ্য কোন চিকিৎসকের নেই। মিসির আলিদের স্থায়ী কোন দেহ নেই, তারা ক্রমাগত দেহান্তরিত হন। মিসির আলিরা ছিলেন, এখনো আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। তাকে নিয়ে শোক বা মাতম করার কিছু নেই। আছে কি?