ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

 
baul

শোনা যায়, ইসলামের শেষ পয়গম্বর হযরত মোহাম্মদ [তাঁর উপর করুণাময়ের শান্তি বর্ষিত হোক] এর চুল গ্রীবাদেশ পর্যন্ত লম্বা ছিল এবং তিনি খুব কমই চিরুনী ব্যবহার করতেন। এটা শুধু শোনা কথাই নয়, পড়া কথাও বটে। পড়েছিলাম বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থ থেকেই। তবে বেশ আগে। আমাদের দেশে বহুকাল ধরেই একটি মনুষ্য শ্রেণি আছে যারা সাংস্কৃতিকভাবে বাউল নামে পরিচিত। লম্বা ঝাকড়া চুল, ঠিকানাহীন এলোমেলো জীবন। পার্থিব নয়, অপার্থিব নয়– তাদের একটিই উদ্দেশ্য– আত্মার প্রশান্তি। এই বাউলেরা শুধুই সংসার বিবাগী নয়, বাঙালি সংস্কৃতির সাথে এদের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। বৃক্ষের সম্পর্ক যেমন মাটির সাথে। বাউলহীন বাঙলা– এ যেন কল্পনাই করা যায়না।

আমাদের দেশে আরো একটি শ্রেণী এবং সেই শ্রেণীর কিছু মেকি উপশ্রেণী রয়েছে যারা এই বাঙলা, এই সংস্কৃতিকে ঘৃণা করে। বৈশাখের উৎসব দেখলে তাদের অন্তরটা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। এদের পরিচয় এরা প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণি। এরা শিকড়কে অস্বীকার করে, সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে। এদের শাস্ত্র আছে, মুখে শাস্ত্রের বুলি আছে। কিন্তু হতভাগা সে শাস্ত্র। কারণ তার ঠাঁই মেলেনি তাদের অন্তরে। যা কিছু তা লোক দেখানো, যা কিছু তা লোক হাসানো। এরা জ্ঞান বিচ্যুত, বাস্তবতা বিচ্যুত। ফলত, অকাট মূর্খ।

এই শ্রেণীটাই কিছুদিন আগে রাজবাড়ির পাংশায় কয়েকজন বাউলের চুল কেটে নিয়েছে। এই চুলের কী অপরাধ ছিল আমার পক্ষে তা বোঝা মুশকিল, বলাও মুশকিল। তারা তো আর বাউলের চুল কাটেনি– কেটেছে আমাদের সংস্কৃতিকে, শিকড়কে। হয়তো আগামীকাল তারা কেড়ে নেবে বাউলের হাতের একতারাকে। আরো পরে এরা কেড়ে নিতে চাইবে এর চেয়েও বড় কিছু। হরণেই এদের সুখ। শাস্ত্র দিয়ে এরা কলম হরণ করতে চায়, ভাষা হরণ করতে চায়, চিন্তা হরণ করতে চায়। এরা ফতোয়াবাজ। এদেরকে থামাতে হবে, স্তব্ধ করে দিতে হবে। শোনা যাচ্ছে, চুল কর্তনের ফতোয়া প্রদানকারী মুফতীকে মদদ দিয়েছেন স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা। তাকে সহ গ্রেফতার করতে হবে সকল অপরাধীকে। বাউলরা দুর্বল, অসহায়। তাই হয়তো তারা আপোষ করেছে। মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছে। কিন্তু এই ঘটনার বিচার না হলে, উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা না হলে এদের দৌরাত্ম্য বাড়তেই থাকবে। দেশ হবে শাস্ত্র ও শাস্ত্রবাজদের মুঠোবন্দী।

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট