ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

“আমি রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেইনি… তবে বলেছি, সংবিধানে কোন ‘ইজম’ টেনে আনবেন না।” সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিকে পরামর্শ দেবার পর মিডিয়ার সামনে বিচারপতি মোস্তফা কামালের মন্তব্য এটি। মন্তব্যটি বেশ অস্পষ্ট। কারণ সংবিধানে ‘ইজম’ না টানার পরামর্শ তিনি দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু ‘ইজম’ বলতে কোন ইজমকে বুঝিয়েছেন তা স্পষ্ট করেননি। বরং তার এই অস্পষ্ট পরামর্শ বা বক্তব্য– যাই বলিনা কেন, প্রচ্ছন্নভাবে ধর্মের প্রলেপ দেয়া সংবিধানকেই সমর্থন করে। কারণ সরকার যে সময়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানকে ধর্মীয় গন্ডির উর্ধ্বে তুলে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেই সময় বিচারপতি মোস্তফা কামালের মত বিদগ্ধ ব্যক্তির কাছ থেকে জাতি বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম আরো স্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয় তা পাওয়া যায়নি। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন কিংবা হয়তো ভেবেছেন অন্য কথা…।

সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া ও এর উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু থেকেই একটি বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা অব্যহত রয়েছে। কোন দেশে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হলে বির্তক সৃষ্টি হবে না তা নয়। কিন্তু চলমান বিতর্ক সৃষ্টির রন্ধনশালার প্রধান রাঁধুনী ধর্মাশ্রয়ী এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। ইমেজ ও অস্তিত্ব সংকটে থাকায় জামাত নিরব তবে বিএনপি সরব। আর মুফতি ফজলুল হক আমিনীর আচরণ তো নতুন করে উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। ধর্মকে পুঁজি করে দেশে অনাকাক্সিক্ষত উত্তেজনা সৃষ্টিতে তার দক্ষতার জুড়ি নেই। তার মত ধর্মীয় পুঁজিপতিরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিগত কয়েক শতক ধরে ‘ইসলাম গেল’ ধরনের স্লোগান তুললেও ইসলাম আজ অবধি বহাল তবিয়তেই আছে। অবশ্য বিএনপি শুধু তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নয়, তাদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দর্শন হুমকীর মুখে পতিত হবার আশঙ্কাতেই একটি বিরোধী অবস্থান দলটি নিয়েছে। এমন অবস্থান নেয়া ছাড়া দলটির সামনে ভাল কোন বিকল্প আছে বলেও মনে হয়না। কারণ সংবিধানের যত পরিবর্তন তার একটা বড় অংশ সম্পাদিত হয়েছে তাদের দ্বারাই। অবশ্য বিরোধী দলের বিরোধী অবস্থান যে সব সময় মন্দ তাও নয়। এতে কখনো কখনো সরকারের উপর এক প্রকার গণতান্ত্রিক চাপ সৃষ্টি হয় যার ফলে সরকার সর্বাত্মক আচরণ থেকে নিজেকে নিবৃত করার তাগিদ অনুভব করে। কিন্তু এধরণের বিরোধীতা হতে হবে যুক্তিনির্ভর। সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিএনপির যে অবস্থান তা যে শতভাগ অযৌক্তিক তা বলার সুযোগ নেই কিন্তু যুক্তিপূর্ণ অবস্থান পাকাপোক্ত করার স্বার্থেই দলটির উচিত ছিল তাদের আপত্তিগুলো লিখিতভাবে সংসদীয় কমিটির কাছে উপস্থিত করা। এতে ভিন্নমত যেমন প্রকাশ পেত তেমনি সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদীয় আচরণের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকতো। সংসদ একটি প্রতিষ্ঠান আর যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার সুফল ভবিষ্যতের জন্য মজুদ থেকেই যায়। কিন্তু বিএনপি বোধ হয় সেই ভবিষ্যত সুফল থেকে বঞ্চিতই হলো। তবে রাজনীতি মানেই কূটনীতি, কৌশল। এই নীতিতে যে পারদর্শী সেই জয়ী হয়। সর্বশেষ বিএনপি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলতেন যে, কৌশলগতভাবে বিএনপি এগিয়ে আছে। আর আওয়ামী লীগ নানা দুর্বলতায় তাদের সাথে পেরে উঠছেনা। কিন্তু বর্তমানে সেই কৌশলের খেলায় আওয়ামী লীগই এগিয়ে আর বিএনপি পেছনে।

বলছিলাম সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মন্তব্য নিয়ে; তার অস্পষ্ট ‘ইজম’ নিয়ে। আমাদের এই স্বাধীন রাষ্ট্রের আদি সংবিধানে ধর্ম কিংবা ধর্মানুভূতির কোন উপস্থিতি ছিলনা। রাষ্ট্রকে ঘোষণা করা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে যা একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌল চরিত্র। যেহেতু রাষ্ট্র একটি সংগঠন এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অনুযায়ী সমাজের আভ্যন্তরিন বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট; তাই এই সংগঠনের– তা হোক গণতান্ত্রিক দৃষ্টিতে কিংবা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে– নাগরিকের প্রতি সমান দৃষ্টি প্রক্ষেপ করাই তার দায়িত্ব। রাষ্ট্রের কাজ ধর্ম প্রচার কিংবা তার পছন্দের ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপার্থিবও নয়। এই পার্থিব জগতে তার নাগরিকের পার্থিব কল্যাণ সাধন করে দেয়াই রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য। ধর্ম জীবসত্ত্বার জন্য এবং এই জীবসত্ত্বা উৎকৃষ্ট জীবসত্ত্বা। রাষ্ট্র যেহেতু জীবসত্ত্বা নয় তাই তার কোন ধর্ম থাকতে পারেনা। রাষ্ট্রকে যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন তারা রাষ্ট্রের চরিত্রই ধারণ করবেন। শাসকের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস থাকতে পারে কিন্তু তার রাষ্ট্রীয় আচরণে সেই বিশ্বাসের প্রভাব পড়ার কোন সুযোগ নেই। আর রাষ্ট্র ও শাসকের সেই কাক্সিক্ষত চরিত্র হলো ধর্মনিরপেক্ষতা অর্থাৎ সকল ধর্মের প্রতি সমান আচরণ। কিন্তু এ নীতিবাক্য শুধু শাসকের মুখে উচ্চারিত হলেই চলবেনা, তা লিপিবদ্ধ থাকতে হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে এবং প্রতিফলিত হতে হবে শাসক ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সম্পাদিত কর্মকান্ডে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের মূল সংবিধানকে পরিবর্তন করে এই অজীব রাষ্ট্রের জন্য ইসলামকে ধর্ম হিসেবে আরোপ করা হয়েছিল। শুরুতেই ‘বিসমিল্লাহ’ যুক্ত করে একটি বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। অথচ এই পরিবর্তিত সংবিধানের কোন শুভ ফল কখনোই লক্ষ্য করা যায়নি। এতে ইসলাম উপকৃতও হয়নি, এ নীতি ইসলামের জন্য রক্ষাকবচও হয়নি। উল্টো, এই অজুহাতে রাষ্ট্রে ধর্মভিত্তিক অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, রাজনীতি ধর্মাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে এবং অন্য ধর্মের মানুষের মনে অতৃপ্তি দানা বেঁধেছে।

অনেকে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধীতা করতে গিয়ে পশ্চিমা সেক্যুলারিজমের নানা ব্যাখ্যা এনে দাঁড় করান। একাডেমিক বিচারে তা ফেলে দেবার মত নয়। কিন্তু শেষতক রাষ্ট্রের জন্য সেক্যুলারিজমই উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা, কোন ধর্মের ইজম নয়। স্মর্তব্য যে, গির্জার নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলনের সূচনা ইউরোপীয় রেনেসাঁর সময় থেকে শুরু হলেও সেক্যুলারিজম শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেছিলেন ব্রিটিশ লেখক জর্জ হলিয়ুক ১৮৯৬ সালে। তিনি তার ‘ইংলিশ সেক্যুলারিজম’ গ্রন্থে সেক্যুলারিজমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন: সেক্যুলারিজম হলো এমন এক বিধান যা প্রয়োগ হবে পার্থিব জীবনে এবং এই বিধান সম্পূর্ণ মানবিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠিত। তিনি সেক্যুলারিজমের তিনটি অপরিহার্য নীতির কথা উল্লেখ করেছেন: ১. বস্তুগত উপায়ে পার্থিব জীবনের উন্নয়ন সাধন। ২. বিজ্ঞান মানুষের ভাগ্যনিয়ন্তা। ৩. মঙ্গল সাধনই মঙ্গলজনক। অন্য কোন মঙ্গল আছে কিনা তা বিবেচ্য নয়, পার্থিব জীবনের মঙ্গলসাধনই মঙ্গলজনক।

তাছাড়া ইসলামও এই পার্থিব নীতিকে বাতিল করে না। সহি মুসলিমের একটি হাদিস থেকে জানা যায়, একদিন হযরত মোহাম্মদ (সা.) কিছু লোককে খেজুরের কৃত্রিম পরাগায়ন করতে দেখলেন। কোন কারণে তিনি এই প্রক্রিয়াকে পছন্দ করলেন না এবং একাজ না করার জন্য তাদের পরামর্শ দিলেন। লোকগুলো তার পরামর্শ মেনে সে কাজ থেকে নিবৃত হলো। কিন্তু পরের বছর দেখা গেল খেজুরের ফলন বেশ কম হয়েছে। একথা যখন হযরত জানতে পারলেন তখন পার্থিব জ্ঞানে তার সীমাবদ্ধতার কথা তিনি স্বীকার করে নিলেন এবং বললেন, এটা যদি পার্থিব কোন বিষয়ে হয় তবে তোমরাই ভাল জান কিন্তু যদি ধর্ম সংক্রান্ত হয় তবে তা আমিই ভাল জানি। অর্থাৎ পার্থিব জীবনে পার্থিব কল্যাণ সাধনের নীতি ইসলামের দৃষ্টিতে নেতিবাচক কিছু নয়।

অনেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসেবে আখ্যা দেবার চেষ্টা করেন। ধর্মনিরপেক্ষতার শাব্দিক অর্থ কিংবা এর ব্যাখ্যা নিয়ে তারা বিরুদ্ধ আলোচনা করেন। তাদের দৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে মুসলামনদের ধর্মহীন করে তোলার একটি হীন প্রচেষ্টা এবং এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু এই ধারণার কোন বাস্তব ভিত্তি আছে বলে মনে হয়না। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যেখানে সব ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি লালন করবে সেখানে ইসলামকে প্রতিপক্ষ ভাবার কোন সুযোগ নেই। বরং ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্ম রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান সুযোগ ও সুবিধা লাভ করবে। তাই বৈষম্যের কোন প্রশ্নই আসেনা।

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথীর মোহাম্মদ একবার বলেছিলেন, রাষ্ট্র ও জনগণের মঙ্গলের জন্যই সরকারকে কখনো কখনো কিছু অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার প্রতিশ্র“তি আগে থেকে দেয়া থাকে না। সুতরাং সরকারের উচিত হবে, রাষ্ট্র ও জনগণের মঙ্গলের স্বার্থেই ধর্ম ও সংবিধান নিয়ে বিভিন্ন মহলের অপপ্রচার সত্বেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনপ্রতিষ্ঠা করা। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে আমারা যা বুঝি অর্থাৎ রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ ও সকল ধর্মানুসারীর প্রতি সমান দৃষ্টি– আমাদের সংবিধানে সেটাই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে দৃঢ়তার সাথে। প্রয়োজনে আমাদের বিবেচনায় ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা কী তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিতে হবে এবং এর সাথে সম্পর্কীত অন্যান্য শব্দ বা প্রত্যয়গুলোরও সুস্পষ্ট অর্থ সংবিধানে সংযুক্ত করে দিতে হবে। এই সংজ্ঞা যদি ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে নাও মেলে তাতেও কোন সমস্যা নেই। আমাদের বোধটাই বড় কথা।

সুতরাং কোন ধর্মের ইজম নয়, ধর্মের প্রলেপ নয়, সংবিধানের ভিত্তি হবে পার্থিব কল্যাণ-নীতি তথা ধর্মনিরপেক্ষতা বা পার্থিব-ইজম। এটাই নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা।