ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রতিবারের মত এবারো প্রকাশিত হলো এসএসসি পরীক্ষার ফল। পাশের হার ৮২.১৬% এবং বোর্ডগুলোর মধ্যে কুমিল্লা ৮৫.৮৫% অর্জন নিয়ে শীর্ষে। ফল হিসেবে সত্যিই এ এক সাফল্যের চিত্র। সাফল্যে হাসছেন সবাই– পরীক্ষার্থীদের বাবা-মা, শিক্ষক, আত্মীয়-স্বজন। যেহেতু হাসি একটি সংক্রামক ক্রিয়া (ব্যাধী) তাই হাসছে পুরো জাতি। এই হাসিকে আমি মন্দ বলতে চাইনা তবে এতে কিছুটা দুর্গন্ধ আছে বলে মনে করি।

সদ্য স্কুল পেরোনো ছেলে-মেয়েদের এমন সাফল্যে আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলোও নিজেদের গুটিয়ে রাখেনি। তারাও উচ্ছ্বসিত, সংবাদ পরিবেশনায় দিলখোলা। যার প্রমাণ পাওয়া যায় আজকের শিরোনামগুলো থেকে। ভবিষ্যত প্রজন্মের এবারের শিক্ষা-সাফল্যকে সবাই প্রচার করেছে ফলাও করে। এই উচ্ছ্বসিত সংবাদপত্রগুলোর একটি তার প্রধান শিরোনামে এই ফলাফলকে আখ্যায়িত করেছে ‘নজরকাড়া’ বলে। এ শব্দে আমার কিছুটা আপত্তি আছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ধরণের উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। শিক্ষার্থীরা ড্রাম পিটিয়ে, নাচ-গান করে যেভাবে তাদের পরীক্ষার ফলাফলকে বরণ করে নেন তা কোন অংশেই পহেলা বৈশাখ কিংবা ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন উৎসবের চেয়ে কম নয়। উৎসবকে আমি মন্দ বলছিনা। কিন্তু শিক্ষা কী উৎসবের বিষয়! অর্থাৎ পরীক্ষার ফলাফলকে আমরা যেভাবে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে বরণ করে নিচ্ছি শিক্ষা কি তেমন কিছু? কিংবা প্রকৃত অর্থে পরীক্ষার ফলাফলকে কি নজরকাড়া বলা যেতে পারে? শিক্ষার নীতিশাস্ত্র কি এমন শব্দ ও উৎসবকে সমর্থন করে? না।

প্রতি বছর এসব পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবার সাথে সাথে সারা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। যার বহিঃপ্রকাশ মূর্ত। কিন্তু সেই সাথে আরো একটি দুর্ভাবনা জেগে উঠে সচেতন নাগরিক, অভিভাবকদের মাঝে। যা অনেকটা অপ্রকাশিত, অকথিত এবং বিমূর্ত। আমাদের এই শিক্ষা কি যথার্থ? এ শিক্ষার গুরুত্ব কতখানি? এ শিক্ষার ভবিষ্যত ফল কী? আমাদের এই শিক্ষা-সাফল্যের গুণগত মান কতটুকু? আমাদের স্কুল-কলেজের সাথে যাদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা আছে তারা জানেন এবং বুঝেন যে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উৎসব করার মত শিক্ষা আমাদের নবীন নাগরিকেরা অর্জন করছে না। যে পদ্ধতিতে আমাদের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, যে ভিত্তিতে আমাদের মেধার মূল্যায়ন করা হচ্ছে তা নিছক বালুর পাহাড় ছাড়া আর কিছুই নয়। একটু দমকা বাতাসেই এ পাহাড় মাটির সাথে মিশে যেতে পারে। কিছু সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে যাদের অর্জন ও গুণগত মান প্রশ্নাতীত কিন্তু তাদের দিয়ে সারা দেশ কিংবা জাতিকে মূল্যায়ন করা যায় না। তা উচিতও নয়। আজকের দৈনিক যায়যায়দিন এর তথ্য মতে জানা যায়, বরাবরের মত এবারো শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানে। অথচ পাশের হার বৃদ্ধি করার জন্য সরকার কী না করছে! যারা পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেন তাদের যে মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয় তা শুনলে হাসতে হাসতে কান্না চলে আছে। বিশেষকরে ইংরেজির ক্ষেত্রে। বলা চলে, যদি কোন খাতা দেখে মনে হয় যে এখানে ইংরেজিতে কিছু একটা লেখা আছে তবে সেখানেই নাম্বার দিতে হবে। কী লেখেছে তা দেখার দরকার নেই, পাশ করানোটাই বড় কথা। একজন হেড এক্সামাইনারের মন্তব্য ছিল এরকম, নাম্বার তো আর আপনি আপনার মানিব্যাগ থেকে দেবেন না। তাই এ নিয়ে আপনার দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। শুধু দিয়ে যান।

আমার পরিচিত এক ছাত্র ইংরেজিতে এ+ পেয়েও তা বলতে সংকোচ বোধ করছিল। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল– এ+ পেয়েছি শুনলে যদি কেউ ইংরেজিতে কিছু জিজ্ঞেস করে তবে তো কিছুই বলতে পারবোনা। এই হলো আমাদের ফলাফল ও বাস্তবতা। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, ছোট বড় সবাই বেশ সুন্দর ও সাবলীল ইংরেজি বলতে পারে। সে দেশের একজন দোকানদারও নাকি ইংরেজিতে কথা বলতে পারে অবলীলায়। অথচ আমাদের দেশের কী অবস্থা! মাস্টার্স পাশ করার পরও মুখ দিয়ে ইংরেজি বের হয়না। ইংরেজি শেখার জন্য তার সেকি প্রাণান্তকর চেষ্টা। শুধু কি ইংরেজি? মাতৃভাষা বাংলার অবস্থাও করুণ। একবার কোন এক সুপরিচিত স্কুলের এক ‘ভাল’ শিক্ষার্থীকে তার পাঠ্য বইয়ের একটি প্রবন্ধ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলতে বলেছিলাম। সে বলেছিল, এভাবে বলতে পারবো না। এখান থেকে কোন নির্দিষ্ট প্রশ্ন করলে তবে উত্তর দিতে পারবো। ও একা নয়। ওর মত শিক্ষার্থী হাজার হাজার।

আর সৃজনশীল পদ্ধতি? সে আরেক মহাকাব্য। প্রথমে যখন সনাতন পদ্ধতি (মরণশীল পদ্ধতি!) থেকে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া শুরু হলো, তখন অভিভাবকদের সেকি হুঙ্কার। মুখস্ত ছাড়া আমার সন্তানের পক্ষে পরীক্ষায় ভাল করা সম্ভব নয়, এই পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। ওদেরকে মুখস্ত বিদ্যার মধ্যেই ছেড়ে দিতে হবে। তাদের ভাবটা এমন যে, এত বোঝার, এত পড়ার সময় কোথায়। মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারলেই হলো। এবার যে স্কুলটি সারা দেশে পঞ্চম হয়েছে বিগত প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষায় সেই স্কুলেরই প্রায় ৩৫ জন ছাত্র বিজ্ঞানের এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করেছিল। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছিল দ্বিতীয়বার পরীক্ষা নিতে।

এই যখন অবস্থা, তখন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবার পর ঢাক-ঢোল বাজানো কিংবা রং-ফুল ছিটানো কতটুকু সাজে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অকথিত থেকে যায় শিক্ষার মান নিয়ে সেই বাস্তব দুর্ভাবনা।