ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ছবি: বিডিনিউজ২৪ ডট কম
‘সুযোগ’ ও ‘সুযোগের সদ্ব্যবহার’ এবং ‘ব্যাখ্যাহীনতা’ ও ‘অপব্যাখ্যা’ শব্দগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কীত। প্রথম শব্দগুলোর কারণে দ্বিতীয় শব্দগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। বোধ করি, বিপদজনক হয়ে উঠার কারণ উপলব্ধি করা খুবই সহজ ব্যাপার। এটা বুঝার জন্য খুব একটা কাঠ-খড় পুড়াতে হয় না।
কিন্তু এসপি বাবুল আক্তারকে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ কিংবা ‘উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া’ নিয়ে ডিএমপি ও সিএমপি’র পক্ষ থেকে আজ বিকেলে বক্তব্য আসার পর মনে হচ্ছে অভিন্ন সত্তার ওই দুই কর্তৃপক্ষের কেউই তা উপলব্ধি করতে পারেনি। এমনকি তাদের সুপারভাইজিং অথরিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি বা মন্ত্রণালয়ও না। শুক্রবার মধ্যরাতে যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল, শনিবার আগ বেলায় তা নাটকে পরিণত হয়ে আজ রবিবার শেষ বিকেলে তামাশায় পরিণত হয়েছে।
যে তিনটি শব্দ আমি ব্যবহার করেছি অর্থাৎ ধোঁয়াশা, নাটক ও তামাশা সেগুলো নিয়ে দু-তিনটা লাইন লেখার অবকাশ আছে। ধোয়াশার অর্থ কাউকে শিখাবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু মধ্যরাতে যখন খবর এল বাবুল আক্তারকে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও একজন এডিসি এসে পুলিশের আইজি’র রেফারেন্সে তুলে নিয়ে গেছে এবং এরপর থেকে শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, ঠিক তখনই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে। অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকে ‘বটতলার প্রকাশনা’র সাথে তুলনা করার সুযোগ নেই। আমি যেগুলোর কথা বলছি, তার সবগুলোই জাতীয় সংবাদপত্রের অনলাইন ভার্সন। কেন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল? কারণ পুলিশ ও বাবুল আক্তারের শ্বশুর। আগে ওনার শ্বশুরের কথায় আসি। মধ্যরাতে মিডিয়া কিভাবে জানল যে বাবুল আক্তারকে পুলিশ নিয়ে গেছে। পুলিশ নিশ্চই মিডিয়াকে ইনফর্ম করেনি। কাজটা তার শ্বশুর করেছেন। ধরলাম তিনিও করেননি, মিডিয়া তার নিজস্ব সোর্স থেকে ইনফর্মড হয়েছে। কিন্তু সেই তথ্যের নিশ্চয়তা কে দিয়েছে? বাবুল আক্তারের শ্বশুর দিয়েছে। কেন দিয়েছে? এর আগেও বাবুল আক্তারকে মামলার বাদী হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন সে খবর কেন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেনি? এই সবগুলো প্রশ্নের জবাব একটাই– সেবার আর এবার এক ছিল না। বাবুল আক্তারের শ্বশুর মধ্যরাতেই দাবি করেছেন, এর আগেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়নি। কিন্তু এবার হয়েছে। ফলে তারা উদ্বিগ্ন, তার বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। মিডিয়া আরো জানতে পেরেছিল, স্ত্রী’র খুনিরা বাবুল আক্তারের বর্তমান বা সাবেক সোর্স। ফলে বাবুল আক্তারকে নিয়ে যাওয়ায় এবং সেই সাথে এই খবর ছড়িয়ে পড়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই গুজব রটে যায়, স্ত্রী হত্যার পেছনে এসপি বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া গেছে। গুজব তো গুজবই। গুজবকে সত্য বলে স্বীকার করি আর না করি, ওটা একবার পাখা মেললে বেধে রাখা মুশকিল। এই গুজব কিংবা ধোঁয়াশার জন্য পুলিশও দায়ী। কেন? কারণ মধ্যরাতে বাবুল আক্তারকে নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ নিশ্চই ঘুমিয়ে পড়েনি। মিডিয়ায় নানা ধরনের খবর ছড়িয়ে পড়ছে জেনেও তারা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে কোন বক্তব্য দেয়নি। কেন দেয়নি? তারাই ভাল জানেন।
সুতরাং পুলিশই সুযোগ করে দিয়েছে আর মিডিয়া সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। ঘটনাকে পুলিশই ব্যাখ্যাহীন রেখেছে, ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই তার অপব্যাখ্যাও সৃষ্টি হয়েছে। এর দায় শুধুমাত্র মিডিয়ার নয় নিশ্চই।
এর পর আসি নাটকে। নাটক কী তাও শিখাতে চাই না। নাটক কী যারা তা বুঝেন তাদের যদি এই শব্দে আপত্তি থাকে তবে আমি সোজা ‘নাটকীয়তা’ শব্দটিতে চলে যেতে চাই। নাটকীয়তা সৃষ্টি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের ‘দায়িত্বশীল’ কর্মকর্তারা। শনিবার দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন: বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কোন প্রশ্নের উদয় হলে তা যাচাই করে দেখা উচিত। আমরা আরো সময় নিয়ে বিষয়টা স্পষ্ট করবো। পুলিশের বিভিন্ন মহলেও সাংবাদিকরা যোগাযোগ করেছিলেন। সবাই জানিয়েছেন, তারা কিছুই জানেন না। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মধ্যরাতে ডেকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হল, ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করা হল, অথচ তারা কেউই কিছু জানেন না, এটা কি নাটকীয়তা নয়! ঊাবুল আক্তারকে নিয়ে যাওয়া আর জিজ্ঞাসাবাদ ইস্যুতে মন্ত্রী থেকে শুরু করে পুলিশের বড় কর্তারা যে সুরে কথা বলেছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে গুজব পাকাপোক্ত হলে দায় কার? গুজবের না গুজব সৃষ্টির সুযোগ যারা করে দিয়েছেন তাদের? অবশ্যই তাদের। একটা সহজ কথা বলতে যখন এত জটিলতা, এত গোপনীয়তা তখন অবশ্যই সেটা নাটক কিংবা নাটকীয়তা।
এখন আসা যাক তামাশায়। বাবুল আক্তারকে ১৪ ঘন্টা আটক কিংবা হেফাজতে রেখে বিকেলে বাসায় ফিরিয়ে দেয়া হল। ততক্ষণে যা রটার তা রটে গেছে। মোড়ে মোড়ে, ঘরে ঘরে মানুষ বলতে শুরু করেছে: ‘এসপি নিজেই তার বউকে খুন করেছে।’ তাদের মনে ধারনা জন্মে গেছে, ‘চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর সাথে সম্পর্ক থাকায় বাবুল আক্তার নিজেই এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন।’ তা সত্বেও শনিবার বিকেলের পরও পুলিশ নিরব ছিল। কেন ছিল? তা তারাই ভাল জানেন। কিন্তু আজ রবিবার বিকেলে ডিএমপি আর সিএমপি’র পক্ষ দেখে বলা হল, আইন মেনেই এসপি সাহেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, এ নিয়ে অপব্যাখ্যার সুযোগ নেই। খুব ভাল কথা। অপব্যাখ্যা নিন্দনীয়। কিন্তু ব্যাখ্যা যেখানে অনুপস্থিত, অপব্যাখ্যা তো সেখানে সৃষ্টি হবেই। এই বিষয়টা কি ‘দায়িত্বশীল’ কর্তারা বুঝেননি। বুঝলে আরো আগে কেন বলেননি! এই যে বুঝেও না বুঝার খেলা, এটাই তামাশা।
তবে যা হবার হয়ে গেছে। ঘটনার তদন্ত শেষ পর্যন্ত পুলিশই করবে, প্রকৃত খুনিকে তারাই আইনের হাতে ন্যস্ত করবে। আমরা তাদের কাজের প্রতি সমর্থন দিতে ও আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু আর কোন ধোঁয়াশা, নাটকীয়তা এবং তামাশা দেখতে চাই না। তনু হত্যাকান্ডের পর এই তিনটা জিনিস মানুষ যথেষ্ট দেখেছে। আমরা চাই, পুলিশ তার নিজের সৃষ্ট গুজবের ডানা কেটে দিয়ে আইনসঙ্গত উপায়ে মিতু হত্যা রহস্য উদঘাটন করুক।