ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

জিয়াউর রহমান- বহুভাবে তার নাম ও পরিচয় বিবৃত হতে পারে। সৈনিক জিয়া, মেজর জিয়া, সামরিক শাসক জিয়া, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক জিয়া এবং বিএনপির ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া। জিয়াউর রহমানের আরো বিশেষণ শোনা যায় মানুষের মুখে। সৎ জিয়া। আমাদের দেশে সততা বলতে মানুষ টাকা-পয়সার সাথে সম্পর্ককেই বুঝে। অর্থ সম্পদের প্রতি ব্যক্তি জিয়ার তেমন কোন লালসা না থাকার কারণে হয়তো মানুষ বিশেষকরে প্রবীণরা তাকে সৎ ও সাদাসিধা মানুষ হিসেবেই জ্ঞান করে। সে জ্ঞানে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার কোন আপত্তি নেই। আমার মত ব্যক্তির চেয়ে ব্যক্তি জিয়ার অবস্থান অনেক উর্ধ্বে তার এই শেষোক্ত অর্জিত গুণগুলোর প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা রয়েছে।

কিন্তু জিয়াউর রহমানকে শুধুই ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করার কোন সুযোগ নেই। কারণ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে তার নাম ও ভূমিকা লেপ্টে রয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর পক্ষ নিয়ে জাতির প্রতি স্বশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান সম্বলিত ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ তার আহ্বানকে বৈধতা দিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন, তিনি সেনাপ্রধান হয়েছিলেন, সেনা চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেশের সামরিক জান্তা হয়েছিলেন, হ্যাঁ-না ভোটের তথৈবচ পদ্ধতিতে সেনা খোলস ছেড়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, ক্ষমতা একচ্ছত্র করতে জাতীয় সংবিধানকে টেনে ছিঁড়েছিলেন, বিরোধী পক্ষের সংখ্যা হ্রাস ও বৈধতা প্রাপ্তির নেশায় ধর্মনির্ভর মৌলবাদী শক্তিকে দেশের রাজনীতিতে জড়িত করেছিলেন। অধিকার না থাকা সত্বেও রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করে ধর্মপ্রাণ জনগণকে বিসমিল্লাহ ও আল্লাহর প্রতি ভক্তি উপহার দিয়েছিলেন। তার ধর্মানুরাগ দেখে এদেশের মানুষ আহ্লাদ বোধ করেছিল এবং ওমর ফারুক কিংবা খালিদ বিন ওয়ালিদের মত তাকেও ধর্ম রক্ষক হিসেবে জ্ঞান করেছিল। অবশ্য ব্যক্তি জীবনে জিয়াউর রহমানের ধর্মের অনুশাসনের প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধাবোধ ছিল সে প্রশ্ন এখানে উত্থাপিত হবেনা। তার ধর্মপ্রীতি প্রশংসনীয় হলেও ক্ষমতা প্রীতি প্রশংসনীয় হতে পারেনি। ক্ষমতা নিরবিচ্ছিন্ন করতে তিনি কর্ণেল তাহের ও আরো অনেককে যেভাবে হত্যা করেছেন তা আজ উন্মোচিত।

এসব সত্বেও জিয়াউর রহমানের বেশ কিছু প্রশংসনীয় দিক উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা শ্রবণ করেছি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ ছিলেন, অর্থ সম্পদের প্রতি তার মোহ ছিলনা। তার মধ্যে এক ধরণের রাজনৈতিক ক্যারিশমা ছিল। তার সততায় মানুষ তাকে ভালবাসা দিয়েছিল। তিনি সামরিক জান্তার বিপরীত রূপ খানিকটা অর্জন করে রাজনৈতিক মনোপলির অবসান ঘটিয়ে বহু দল নির্ভর রাজনীতিকে উন্মুক্ত করেছিলেন, সংবাদপত্র প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সে সময় এই কর্ম কোন মতেই গুরুত্বহীন ছিলনা। তিনি যখন নিহত হলেন তখন তার ব্যক্তিগত সম্পদ পাহাড়সম তো দূরের কথা টিলাসমও ছিলনা। তার কথিত গুটি কয়েক সুটকেস ছিল ভাঙ্গা, প্রায় ওজনহীন।

কিন্তু তার মৃত্যুর পর সময়ের ধারাবাহিকতায় যিনি তার উত্তরাধিকারী হয়েছেন অর্থাৎ তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই সব গুণগলো থেকে অনেক দূরে। স্বামীর মত ক্ষমতার প্রতি তার আসক্তি রয়েছে, এটা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছেন। কিন্তু যা পাননি তা হলো জিয়ার সততা ও সম্পদের প্রতি অনাসক্তি। জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া গুটি কয়েক ভাঙ্গা সুটকেস এখন পৌঁছে গেছে গণনারও উর্ধ্বে। জিয়াউর রহমানের সামরিক বাসভবন গত কয়েক বছরে হয়ে উঠেছিল প্রাসাদসম। যে প্রাসাদের অধিকর্তা ভাঙ্গা সুটকেসের মালিক জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম জিয়া। জিয়াউর রহমান দুটি পুত্র সন্তানের জনক হয়েছিলেন- তারা তারেক ও কোকো। কিন্তু বেগম জিয়ার সেই প্রাসাদ জন্ম দিয়েছিল আরো দুটি পুত্র সন্তানের- নব্য তারেক ও নব্য কোকো। জিয়ার পুত্রের সাথে এই দুই পুত্রে অনেক গড়মিল। বোধকরি, এই নব্য ভাতৃদ্বয়ের সম্পদের খতিয়ান মা বেগম জিয়া কেন, তারা নিজেরাও জানেনা। ক্যান্টনমেন্টের সেই প্রাসাদটি আরো একটি প্রাসাদের জন্ম দিয়েছিল যার নাম ‘হাওয়া’। হাওয়ার মতই রহস্যময় ছিল সে প্রাসাদ, অনেকের মতে ‘কুঠি’। এই কুঠির অধিকর্তা ছিলেন নব্য তারেক ও তার অনুচর মামুন। সম্ভবত বৃটিশ শাসন অবসান হবার পর এই নব্য তারেকই এই উপমহাদেশে জন্ম দিয়েছিল দ্বিতীয় দ্বৈত শাসনের। সিংহাসনে খালেদা জিয়া, শাসনকর্তা তারেক জিয়া। বড় ভাইয়ের পাশাপাশি ছোট ভাই নব্য কোকোও নিজেকে পরিণত করেছিলো অর্থ বাণিজ্যের একজন অধিকর্তা হিসেবে। অথচ এসবের কোন কিছুই নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রতিরোধ করতে পারেননি বেগম জিয়া। না মা হিসেবে, না প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

আর কথা না বাড়িয়ে একথা স্পষ্ট বলা যায় যে, জিয়াউর রহমান সৃজিত দল বিএনপিও যেমন তার সৃজন কর্তার ব্যক্তি দর্শনকে লালন করতে পারেনি তেমনি স্ত্রী হিসেবেও বেগম জিয়া তার স্বামীর আদর্শকে ধারণ করতে পারেননি। বিগত কয়েক দশকে তিনি হয়ে উঠেছেন তারই স্বামীর প্রতিপক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী।