ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য টিউমার। কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই তার পরিচালন ক্ষমতা অনির্বাচিত ও ভূঁইফোড় ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত করতে পারেনা। কারণ এই ধরণের ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যত ক্ষতবিক্ষত হবার আশংকা নিরেট। অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে সমাজে এমন একটি সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী জেগে উঠে যারা নিজেদের রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার ভাবতে শুরু করে এবং সেই অংশীদার হবার আকাঙ্ক্ষায় গণতন্ত্রের ঘাতক হতেও দ্বিধা করেনা। আমাদের দেশে এই কথাটির সত্যতা খুঁজে পেতে এখন আর কারো কষ্ট হবে বলে মনে হয়না। এমন অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় শুধু সুযোগ সন্ধানী বেসামরিক গোষ্ঠীই নয় তাদের ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীর মধ্যেও দেশ চালাবার একটি অনৈতিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় যার নজির বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এই টিউমার স্বরূপ সরকার ব্যবস্থাটি আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত ও পাকাপোক্ত হয়েছিল আমাদের রাজনীতিবিদদেরই অযোগ্যতা ও ক্ষমতার লোভের কারণে।

কিন্তু সুখের কথা, সুপ্রিমকোর্ট রাষ্ট্রের এই টিউমার অপসারণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন এবং একটি নমনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রের চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ তবে ঝুঁকিমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার স্বার্থে আগামী দুটি সাধারণ নির্বাচন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হতে পারে। এই ধরণের সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত । তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের দায়ভার যাতে কোনভাবেই বিদ্যমান সরকারের উপর না বর্তায় সে দিকে সম্ভবত সুপ্রিমকোর্ট সতর্ক দৃষ্টি দিয়েছেলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য কোর্ট প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু ঝামেলা বেধেছে অন্যত্র। যে ঝুঁকি এড়ানোর জন্য কোর্টের এত সতর্কতা সরকার স্বেচ্ছায় হোক আর অদূরদর্শিতার কারণেই হোক, সেই ঝুঁকি নিজেই নিজের ঘাড়ে নিতে চাচ্ছে। সুপ্রিমকোর্টের সুবিবেচনাপ্রসূত নির্দেশনাকে আমলে না নিয়ে আগামী নির্বাচন থেকেই এই ব্যবস্থাকে বাতিলের সিদ্ধান্ত তারা ইতোমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে। যা একটি ভুল ও ত্বরিত সিদ্ধান্ত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এই ইস্যুতে বিরোধীদল ইতোমধ্যেই জোড়ালো আন্দোলন শুরু করেছে এবং তা আরো বেগবান হবে বলেই ধরে নেয়া যায়। বিরোধী দলীয় নেত্রীর সংবাদ সম্মেলনের জবাব দিতে গিয়ে গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ন্যুনতম ইংরেজি জ্ঞান থাকলে ‘মে বি হেল্ড’ এর অর্থ তিনি বুঝতেন। মে বি হেল্ড অর্থ অনুষ্ঠিত হতে পারে। এর শব্দগুলো ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট চরম সিদ্ধান্ত এড়িয়ে নমনীয় পন্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বাতিল করতে চেয়েছেন। এ কথা বিরোধী দলের নেত্রী বুঝেছেন কিনা তা পরের বিষয় কিন্তু সৈয়দ আশরাফও যে বুঝেননি তা অনেকটা স্পষ্ট। গণতন্ত্র মানেই সহনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভিন্নমতকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ সাহেবরা সেই নমনীয়তাকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে অনর্থক একটি কঠোর অবস্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। পরবর্তী দুটি নির্বাচন যদি তত্ত্বাবধায় ব্যবস্থার অধীনে হয় তবে আওয়ামী লীগের কোন সমস্যা আছে বলে আমার মনে হয়না। জনগণ চাইলে ঐ ব্যবস্থার নির্বাচনের মাধ্যমেই তারা জয় লাভ করবে আর জনগণ যদি না চায় তবে কোন পদ্ধতিতেই কাজ হবে বলে মনে হয়না। ইতিহাস তা বলে না। জাতীয় নির্বাচনের মত সংবেদনশীল বিষয়কে আওয়ামী লীগ কেন ঝুঁকিপূর্ণ করে নিজেদের ঘাড়ে বহন করতে চাইছে তা এখনও অস্পষ্ট।

তাই সৈয়দ আশরাফ সাহেবদের বলবো, কোর্টের ব্যবহৃত শব্দগুলোই (মে বি হেল্ড) গণতন্ত্রকে ধাপে ধাপে নিরাপদ করবে। আপনার চিন্তায় থাকা ইলেকশন মাস্ট বি হেল্ড আন্ডার পার্টি গভার্নমেন্ট কিংবা বিরোধী দলের নেত্রীর চিন্তায় থাকা ইলেকশন মাস্ট বি হেল্ড আন্ডার কেয়ারটেকার গভার্নমেন্ট- এর কোনটিই গণতান্ত্রিক ও সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। এসব বাদ দিন এবং ’মে বি হেল্ড’কে বুঝার মত প্রজ্ঞা অর্জন করুন । তবেই জাতির মঙ্গল।