ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গোড়া ইসলামী রাষ্ট্র সৌদি আরব। একজন ব্যক্তির নামে এটিই পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র, তিনি আবদুল আজিজ বিন সউদ। রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরোপুরি অনৈসলামিক অর্থাৎ চরম রাজতান্ত্রিক হলেও এই রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয় ইসলামী শরীয়া দিয়ে। যেন ভুতের মুখে রাম নাম। এ দেশটিতেই গত ৭ অক্টোবর হুসেইন সাইদ মোহাম্মদ আবদুল খালেক নামক এক মিশরীয় নাগরিককে হত্যা ও গুদামঘর লুটপাটের অভিযোগে প্রকাশ্যে শিরোশ্ছেদ করা হলো আট বাংলাদেশীকে। এটি ইসলামী দন্ড কিসাস বা চোখের বদলে চোখ। শরীয়া আইনে কোন বিদেশীর শিরোশ্ছেদ এবারই প্রথম নয় এবং নিশ্চিতভাবে এবারই শেষ নয়। কারো অপরাধ প্রমাণিত হলে এ দন্ড মওকুফের ক্ষমতা কোন ব্যক্তির এমনকি রাষ্ট্রেরও নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার যদি চায় তাহলে অর্থের বিনিময়ে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারে। কারণ এটা পার্থিব জগৎ, এখানে অর্থের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। পার্থিব জগতের এই অমূল্য চালিকা শক্তিকে ইসলাম এ ক্ষেত্রে বৈধ করেছে ‘রক্তঋণ’ নাম দিয়ে। কিন্তু আট বাংলাদেশীর ক্ষেত্রে এই বিধান কাজে আসেনি। নিহতের পরিবার রাজি হয়নি অর্থ নিতে, খুনিদের রেহাই দিতে। যদিও আমরা জানি এ পার্থিব জগতে হয়না এমন কিছুই নেই। এই সৌদি আরবেই কোন এক নিহতের পরিবার আদায় করেছিল ১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ যাবৎ এটাই সর্বোচ্চ।

আট বাংলাদেশীর শিরোশ্ছেদ নিয়ে অনেক হৈচৈ হয়েছে স্বদেশে, বিদেশে। তবে বিদেশীদের চিৎকার এখানে বিবেচনা না করলেও চলবে। কারণ তারা যে কখন কার পক্ষে আর কার বিপক্ষে চিৎকার দেয় তা বুঝা মুশকিল। এখন তারা আমাদের পক্ষে চিৎকার দিলেও দুদিন আগে দিয়েছিল বিপক্ষে এবং হয়তো দুদিন পরেও দেবে । কারণ তারাও বিশ্বাস করে শক্তির বাহু-ভুজে। কিন্তু আমরা স্বদেশীরা যে হৈচৈ করলাম তার হেতু কী? কষ্ট, স্বজাতিপ্রেম নাকি সৌদি আরব নামক ছালার ভেতরের আমটা ‘ইসলাম’ হবার কারণে। হতে পারে সবগুলোই।

সৌদি আরব একটি গোড়া রাষ্ট্র হলেও বাংলাদেশের চেয়ে বহুলাংশে কার্যকর একটি রাষ্ট্র, এখানে দীর্ঘদিন ধরে আইন হিসেবে প্রচলিত রয়েছে ইসলামী শরীয়া, এখানে রিজিক জুটছে লাখ লাখ বাংলাদেশীর এবং এখানে পার্থিব বাস্তবতায় বাধা আছে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সৌদি আরবের ভূমিকা নেতিবাচক হলেও এসব জেনে-বুঝেই আমরা সম্পর্ক গড়েছি এই দেশটির সাথে। এ সম্পর্ক একদিকে কূটনৈতিক এবং অপর দিকে ধর্মীয়। সৌদি আরবই মুসলমানদের সর্বোচ্চ তীর্থস্থান ও সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গম্বরের জন্মভূমি। তাই এই গোড়া রাষ্ট্রটিকে নিয়ে এদেশের মুসলমানদের মনে কাজ করে এক প্রকারের ধর্মীয় আবেগ, অন্ধত্ব কিংবা আনুগত্য।

এমন একটি দেশে যে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন দীর্ঘ দিন ধরে তারা কী জানেন না সে দেশের প্রচলিত আইন কী? কিংবা যে আট জনের শিরোশ্ছেদ করা হলো তারা কী জানতেন না খুন ও লুটের শাস্তি কী হতে পারে। অবশ্যই জানতেন। ছোট বেলায় সৌদি প্রবাসী আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকেই সে দেশের আইন সম্পর্কে ধারণা পেতাম। বাংলাদেশীরা স্বদেশের আইন না জানলেও বিদেশে ঠিকই আইন সচেতন- এটা প্রমাণিত। তাই যে আট জন প্রাণ হারালেন সৌদি আইনে তারা অপরাধী এবং অপরাধী আমার সাধারণ বিবেচনাতেও। তাই শাস্তি তাদের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সমস্যাটা বোধ হয় শাস্তি পাওয়া নিয়ে নয় বরং শাস্তির ধরণ নিয়ে। জীবন্ত মানুষকে লোক সম্মুখে মাথা কেটে হত্যা করা চলমান সভ্যতায় বর্বরতাই বটে। আমি এই বর্বরতার বিপক্ষে। কিন্তু আমি বা আমরা চাইলেই ইসলামী আইন খসে পড়বে না, ধ্বসে পড়বে না। যেমনটি পড়েনি কানাডার মত সভ্য দেশের আইন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে দেবার দাবি জানানো হলেও সে দাবির প্রতি দেশটির সরকার কোন কর্ণপাত করেনি। কারণ তারা ও তাদের আইন মৃত্যদন্ডের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ আমরা চাচ্ছি ঐ খুনিদের মৃত্যুদন্ড দিতে আর সভ্য রাষ্ট্রটি চাচ্ছে তা প্রতিহত করতে। অথচ এ ক্ষেত্রে আমরা নিশ্চুপ। কারণ আমরাও ক্ষমতার বাহু-ভুজে বিশ্বাস করি।

শিরোশ্ছেদকৃত আট বাংলাদেশী আমার বিবেচনায় দুই ধরণের অপরাধে অপরাধী। এক. তারা খুন ও লুট করেছে। দুই. খুন ও লুট করে বাকি লাখ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিকের ভাগ্যকে তারা প্রবাসে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এর আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য সৌদি ও কাতার সরকার ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার ব্যতিত বাংলাদেশীদের ভিসা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। বহু দেনদরবার করে সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হয়েছে। এই শিরোশ্ছেদের ঘটনা নিয়ে এবারও আমাদের দেশে যে ধরণের হৈচৈ হচ্ছে, বিশেষকরে আমাদের প্রচার মাধ্যমগুলোতে তাদেরকে যেভাবে নিষ্পাপ হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে তাতে আশঙ্কা আবারো সেই একই নিষেধাজ্ঞা আসে কিনা। সৌদি সরকার ক্ষোভের বশবর্তি হয়েও যদি আগের মত সিদ্ধান্ত নেয় তবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে মারাত্মক ও অপুরণীয়।

অনেকে আমাদের সরকারকে এই আট অপরাধীর মৃত্যু রুখতে না পারার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছেন। নাগরিকরা তা করেতই পারে। প্রবাসে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু একটি ভিনদেশের আইনে প্রমাণিত অপরাধীর পক্ষে কথা বলার সামর্থ্য কোন সরকারের খুব বেশি থাকে বলে মনে হয়না, বিশেষকরে বাংলাদেশের মত সাহায্য নির্ভর দেশের। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে সৌদি আরবে বিদেশীদের মৃত্যুদন্ডের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এ ধরণের ব্যর্থতা শুধু আমাদের সরকারেরই নয়, শ্রীলংকা এবং ফিলিপিন্সের মত রাষ্ট্রও অতীতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের নাগরিকদের দন্ড রোধ করতে। তবে হ্যাঁ, তারা উদ্যোগ নিয়েছে তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ চুক্তি করার এবং এমন উদ্যোগ আমাদের সরকারও নিতে পারে। কিন্তু শরীয়া আইনকে পাশ কাটিয়ে সৌদি সরকার খুব সহজে এ ধরণের চুক্তি করতে চাইবে বলে মনে হয়না। এর জন্যে প্রয়োজন সরকারের আন্তরিকতা ও কৌশল। আর তাই মানবাধিকার কমিশনারের মত সৌদি সরকারকে কূটনীতি বিবর্জিত ভাষায় গালিগালাজ না করে সরকারের উচিত সৌদি আরবসহ বাকি আরব রাষ্ট্রগুলোতে বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চুক্তি সম্পন্ন করা।