ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আজ এবং দিন দুয়েক আগে বাংলানিউজ২৪.কম এ দুটি লেখা পড়ালাম। লেখা দুটোর শিরোণাম, ‘ক্যাম্পেইন অন নোবেল ফর হুমায়ূন’ ও ‘নোবেল ফর হুমায়ূন, অতঃপর’। লেখক শাখাওয়াৎ নয়ন। তার পরিচয়ে বলা আছে, অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণারত এবং বাংলানিউজের অতিথি কলামনিস্ট। আমার বিশ্বাস এ ব্লগের আরো অনেক ব্লগারই এই লেখা দুটো পড়েছেন। জনাব শাখাওয়াৎ নয়নের লেখার বিষয়বস্তু শিরোণাম দুটোতেই স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সাহিত্য কর্মের জন্য নোবেল সাহিত্য পুরস্কার লাভের যোগ্য। তার লেখাতে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, হুমায়ূন আহমেদের জন্য এই প্রচারণায় দেশের মিডিয়া, ব্লগসাইট ও ফেসবুক সদস্যরা যথাযথ সাড়া দেবেন এবং সুইডেনের নোবেল কমিটির কাছে হুমায়ন আহমেদের পক্ষে প্রস্তাব পাঠানো যায় কিনা তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন।

হুমায়ূন আহমেদ আমাদের দেশের একজন পাঠকপ্রিয় ও নন্দিত কথাসাহিত্যিক। শুধু দেশেই নয় তার কথাসাহিত্য আলোড়িত করেছে কোলকাতার পাঠক সমাজকেও। হুমায়ূন আহমেদের গল্প বা উপন্যাস পাঠ করলে একটি কথা বার বার সত্য প্রমাণিত হয়- সময় খুব দ্রুত বয়ে যায়। তার বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা খুলার পর কখন যে শেষ পৃষ্ঠা চলে আসে তা বুঝাই দায়। এটা একজন লেখকের অনেক বড় স্বার্থকতা। আমি হুমায়ূন আহমেদের সব বই পড়িনি কিন্তু যেটুকু পড়লে একজন লেখককে চেনা যায় সেটুকু পড়েছি। পাঠককে লেখার মধ্যদিয়ে নিজের কল্পিত ভুবনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা যে লেখকের থাকে তিনিই স্বার্থক লেখক। হুমায়ূন আহমেদের বইগুলো আমাকে এই ধারণা দিয়েছে যে লেখক হিসেবে তার সে ক্ষমতা বেশ প্রচন্ড। সাহিত্যকে বলা হয় সমাজের দর্পন, একজন সাহিত্যিক তার সত্তার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন সমাজকে, সমাজের অতীতকে, বর্তমানকে। ভবিষ্যত নিয়ে মাথাব্যাথা বোধকরি সাহিত্যের খুব একটা নেই। তাই একজন সাহিত্যিকও ভবিষ্যত প্রসঙ্গে থাকেন প্রচ্ছন। হুমায়ূন আহমেদের গল্প বা কাহিনী পড়ে আমার ধারণা হয়েছে তিনি খুব হালকা করে সমাজের ভারকে তুলে ধরতে পারেন। হারিয়ে যাওয়া যে ভারটুকু আমরা উপলব্ধি করতে পারিনা আমার বিশ্বাস সে ভার বহন করেন তিনি নিজে। সমাজের ভারকে নিজের কাধে তুলে নেবার এই বিরল ক্ষমতাই বোধ হয় তাকে নিয়ে গেছে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

সুইডেনের নোবেল কমিটি যে বিচারে কোন লেখককে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন বিভিন্ন সময়ে তাদের বিবৃতিতে সেই বিচার বোধ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। হুমায়ূন আহমেদও তাদের এই বিচার বোধের বাইরের কোন লেখক নন। আমাদের অনেক দেশীয় পাঠকের ধারণা হুমায়ূন আহমেদের গল্প-উপন্যাসে মজা আছে কিন্তু শিক্ষণীয় কিছু নেই। তার লেখা সমাজকে তুলে ধরে না বরং পাঠককে চটুল আনন্দে মসগুল রাখে। পাঠক মনে এমন ধারণার বাস্তব সম্মত কারণ যে নেই তাও নয়। কিন্তু আসলেই কী হুমায়ূন আহমেদের লেখায় একেবারেই শিক্ষনীয় কিছুই নেই? আমার ধারণা আছে। সমাজের, মানব জীবনের সরল ও বাঁকা পথগুলোকে নির্ভার করে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই তো বড় শিক্ষা। হুমায়ূন আহমেদের লেখায় যে শিক্ষা রয়েছে তা চোখ দিয়ে নয় গ্রহণ করতে হয় হৃদয় দিয়ে।

সুতারাং লেখক শাখাওয়াৎ নয়ন যে বিষয়ে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন তা একেবারে অমূলক নয়। হুমায়ূন আহমেদ নোবেল পুরস্কার পাক এমন প্রত্যাশা তিনি জাগিয়ে তুলার চেষ্টা করতেই পারেন। তার এই প্রচেষ্টার সাথে যুক্ত হতে পারেন অনেক পাঠক ও সংগঠন। কিন্তু মনে রাখা উচিত, আমাদের দেশে নোবেল পুরস্কার পাবার মত আরো কয়েকজন জীবিত লেখক রয়েছেন। নোবেল পুরস্কারের প্রসংগ আসলে খুব সহজেই চলে আসবে আল মাহমুদ কিংবা সৈয়দ শামসুল হক এর নাম। তাছাড়া নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন পাঠাবার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সাধারণ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোন লেখকের পক্ষে প্রস্তাব পাঠাতে পারেন না কিংবা পাঠালেও তা গৃহীত হয়না। নীতিমালা অনুযায়ী, নোবেল কমিটির কোন সদস্য, কোন সাহিত্য সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান এর সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের কোন বিশিষ্ট অধ্যাপক কিংবা নোবেল জয়ী কোন সাহিত্যিকই পারেন পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পাঠাতে। আমাদের দেশে বাংলা একাডেমী ইচ্ছা করলেই পারে এ ধরণের কোন উদ্যোগের চালক হতে। সে ক্ষেত্রে যে হুমায়ূন আহমেদের নামই প্রস্তাব করতে হবে এমন কোন কথা নেই। বাংলা সাহিত্যকে দ্বিতীয়বারের মত নোবেল কমিটির দৃষ্টিগোচর করাই মূল লক্ষ্য।

তাই সাধুবাদ জানাই শাখাওয়াৎ নয়নকে। তার উদ্যেগ গতি পাক এ প্রত্যাশা রইলো।