ক্যাটেগরিঃ চারপাশে, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

হালে আমাদের স্থানীয় আন্তর্জালিক সমাজে হলুদ নিয়ে হট্টগোল চলছে। হলুদ নিয়ে হরেক রকম নাক সিটকানো কথা আমাদের সমাজেও প্রচলিত আছে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যারা পাপী হয়ে যায় তাদের বলা হয় হলুদ সাংবাদিক। আর যাদের নির্দিষ্ট কোন আদর্শ নেই, সুবিধাবাদী, সব মহলেই যারা সমান তাল দিয়ে চলে তাদের বলা হয় হলুদের গুড়া, মানে সব তরকারিতেই খাটে। হলুদের আবার মনোজাগতিক অর্থও আছে। রঙটা নাকি আভিজাত্য, বুদ্ধিমত্তা, সুখ ও আশাবাদের প্রতীক। পৃথিবীর বিভিন্ন রাজন্যবর্গ এবং প্রতিভাবান ব্যক্তিদের পছন্দের রঙও নাকি হলুদ। রঙের বিজ্ঞানে হলুদের গুরুত্ব অনেক। তাছাড়া এটা একটা নিরপেক্ষ রঙ। বর্ণান্ধ ব্যক্তিরা খুব সহজেই এই হলুদকে দেখতে পায়, দেখে শান্তি পায়, জীবন সম্পর্কে আশাবাদী হয়ে উঠে।

গত দু’দিন আগে আমাদের এই দরিদ্র রাষ্ট্রের একটি অভিজাত অংশে হলুদের ছড়াছড়ি দেখা গেছে। হলুদ খবর হয়ে এসেছে মিডিয়ায়। হট্টগোলের শুরু সেখান থেকেই। হলুদ টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে আমাদের সমাজের অভিজাতদের গুটি কয়েক সন্তান রাজপথে গাড়ি থামিয়ে লাল লাল ফুল বিক্রি করছে। হলুদ শার্ট গায়ে জড়িয়ে রাজপথে নেমে আসার দৃশ্য এই বঙ্গভূমিতেই যে প্রথম ঘটলো তা নয়। আমাদের নিকটতম একটি রাষ্ট্র থাইল্যান্ডেও এমন শার্ট পড়ে একবার রাজপথ দখল করেছিল সে দেশের জনতার একটি অংশ। সে ২০০৮ সালের কথা। থাকসিন বিরোধী সেই জনতা রাজপথে নেমেছিল তার সরকারের বিদায় ঘন্টা বাজাতে। সেবার সে আন্দোলনের নাম দেয়া হয়েছিল ইয়েলো শার্ট মুভমেন্ট। ধার ছিল সে আন্দোলনের। থাকসিন বিরোধী জনতার এই যে হলুদ প্রেম তারও একটা রাজনৈতিক অর্থ ও তাৎপর্য ছিল। হলুদ হলো থাই রাজা ভূমিবলের রঙ, মানে রাজতন্ত্রের প্রতীক। থাইল্যান্ডে সপ্তাহের প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা রঙ আছে। রাজা ভূমিবল জন্মে ছিলেন সোমবারে আর থাইল্যান্ডের সংস্কৃতিতে সোমবারের রঙ হলো হলুদ। এ জন্যই রাজার সব পোশাক, অনুষ্ঠান ও আরো অনেক কিছুতে প্রাধান্য থাকে হলুদের। থাকসিন বিরোধী আন্দোলনের নাটের গুরু যেহেতু ছিল সেনাবাহিনী তাই তারা জনতার কেবলা ঘুরিয়ে দিয়েছিল রাজার দিকে। অনেকটা আমাদের মঈনের মত। গুপ্ত থেকে রক্ত চোষা- এই আরকি।

তো, আমাদের এই বঙ্গদেশের অভিজাত সন্তানেরা ঠিক কোন কারণে যে হলুদ শার্টকে বেছে নিল তা আমার জানা নেই। তবে যে কারণেই নিক না কেন এতে তাদের সব উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে তারা অভিজাত, প্রমাণ হয়েছে তারা আশাবাদী, প্রমাণ হয়েছে তারা উন্নত-মেধাবী। তারা হয়তো এও প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তারা পরিবর্তন প্রত্যাশী।

সমাজের সবচেয়ে সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের এই সন্তানেরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাজপথে নেমেছে তা মহৎ, আমার সহমত। রাজপথে যে শিশুরা জীবিকার জন্য জান-প্রাণ নিয়ে খাটে তাদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে ও দারিদ্র দূর করতে তাদের এই প্রচেষ্ট। এমন কাজ আমাদের সমাজের আরো অনেক সংগঠনও করে থাকে। ব্লগারদের মধ্যেও এই প্রবণতা আছে। অসুস্থ্য কোন শিশুর জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে অনেক ব্লগারকেও এই কাজ করতে দেখা গেছে। সে কর্মচিত্র ব্লগেও শোভা পেয়েছে। এটা ভাল। কিন্তু আমাদের এই হলুদ সন্তানেরা যে কাজটা করছে তা নিয়ে অনেক বক্র মত লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে বলেছে, এভাবে রাস্তায় ফ্যাশনেবল ভিক্ষা করার চেয়ে ওদের বাপের কাছে হাত পাতলেই তো চলে। যাদের দৈনিক পকেট খরচ হাজার হাজার টাকা তাদের আবার পথিকের পকেটে হাত দেবার প্রয়োজন কী? নিজেরটা দিয়ে দিলেও তো এর চেয়ে অনেক টাকা ওঠে। এ কথা সত্য। তবে চেয়ে নেবার মধ্যে একটা আনন্দ আছে, ওরা হয়তো সে আনন্দটুকুই পেতে চাইছে। ভাল। বেঁচে থাকতে হলে আনন্দের প্রয়োজন আছে।

কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। সমস্যা হলো এদের পরিচয়। এরা কারা? এরা তারাই যাদের কারণে সমাজ আজ ভারসাম্যহীন। ওদের সামনেই একদল না খেয়ে শুকিয়ে মরে আর ওরা দামি তরলে নিজেদের পাকস্থলী সিক্ত করে। ওরা সমাজের সেই অংশ যাদের কোন সংস্কৃতি নেই। ওরা অন্যের সংস্কৃতির ভাড়া খাটে। একটি সমাজে ভিনদেশী সংস্কৃতি যে পথ দিয়ে বিনাবাধায় প্রবেশ করে সে পথের নাম হলো অভিজাত মহল। একটি সমাজ যাদের দ্বারা বেশি পঙ্কিল হয় তাদের নামও অভিজাত মহল। একটি সমাজ যাদের দ্বারা শোষিত হয় তাদের নামও অভিজাত মহল। এই অভিজাত মহল নেবার বেলায় নিয়েছে বিদেশী সংস্কৃতি, উন্নত শিক্ষা আর রাষ্ট্রের সবটুকু স্বীকৃতি। কিন্তু দেবার বেলায় দিয়েছে মধ্যরাতের বেহায়াপনা, ইয়াবার সুরসুরি আর অসহায়দের লাথি। তাই এই মহলের ছেলে মেয়েরাই যখন পথে নেমেছে ভিক্ষা করতে তাও আবার এমন মানুষদের জন্য যাদের আজকের এই দুরাবস্থার জন্য দায়ি তাদের অভিজাত নামক একটি ক্ষুদ্র সমাজ।

এ এক সাম্রাজ্যবাদী আচরণ। প্রথমে দংশন পরে বিষ মোচন। কিন্তু পিতার দোষে সন্তানদের দোষী করা যায় না। তাই এই সব অভিজাত সন্তানদের এই কর্মকে ততক্ষণ সমর্থন করা যায় যতক্ষণ প্রমাণিত না হয় যে এদের উদ্দেশ্য অসৎ, লোক দেখানো এবং হীন স্বার্থ সিদ্ধিমূলক। এই কাজের মাধ্যমে তারা যদি প্রমাণ করতে পারে গায়ে হলুদ শার্ট জড়ালেও তাদের মানসিকতা এখনো হলুদ (সংকীর্ণ অভিজাত) হয়ে যায়নি তবে- অভিনন্দন। কিন্তু দুদিনের এই মহত্ত্ব প্রদর্শন শেষে তারা যদি আবারো ফিরে যায় সেই পুরনো বিনাশী বৃত্তে, যে বৃত্ত সমাজকে গিলে ফেলতে চায় আভিজাত্যে তবে আমরা ওদের প্রতি রয়ে যাবো নিস্পৃহ।

নোটাবিনি: আমার প্রিয় রঙগুলোর মধ্যে হলুদ একটি।

***
ফিচার ছবি: জাগো ফাউন্ডেশনের ফেসবুক পাতা থেকে সংগৃহিত