ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

বেশ কিছু দিন ধরে ব্লগার নামধারী একটি শ্রেণি দেশের স্বনামধন্য লেখক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিয়ে খিস্তি-খেউর শুরু করে দিয়েছে। আপাদমস্তক অপদার্থের এই দল তাঁর মতের বিরোধীতা করতে গিয়ে হাতে তুলে নিয়েছে ব্যক্তিগত কুৎসা রটাবার সস্তা হাতিয়ার। শ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তিত্বকে ঘায়েল করতে ওরা টেনে এনেছে তার কন্যার বেশভুষাকে। ওরা শুরু করেছিল ব্যক্তি জাফর ইকবালকে দিয়ে, টেনে এনেছে তার মেয়ে ও বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদকে এবং এর পরে যে আর কত কী আনবে তার ইয়ত্তা নেই। যেন চরিত্র হননের উৎসবে মেতেছে ওরা। ওরা কারা তা সবাই জানে। ওরা প্রতিক্রিয়াশীল সেই চক্র যারা অন্ধাকারের পুজারী; শেকল পড়া সংস্কৃতির বাহক; যারা ধর্মকে মূলধন করে এদেশের মানুষের আবেগকে কিনে নেবার পায়তারা করছে। ওদের পড়ানো সেই শিকল কেউ ভাঙ্গতে চাইলেই ওরা ফেটে পড়ে ক্রোধে, প্রতিহিংসায়। নিজের নেক আমলের ঠিক নেই অথচ অন্যকে সবক দেয় বায়বীয় ঈমানের। ধর্মের আবির্ভাবের সাথে সাথে যে কপট শ্রেণিটির উদয় হয়েছিল ওরা তাদেরই বংশবদ। ওরা হন্তারক, হননেই ওদের আনন্দ। ওরা হনন করে চিন্তা, স্বাধীনতা ও মানুষের বিশ্বাসকে।

এসবই ওদের ধার করা অভ্যাস। ওরা এই অভ্যাসের দাস। অতীতে ওদের এই পঙ্কিল অভ্যাসের শিকার হয়েছে হাজারো মন, মগজ ও কলম। ধর্মের নাম করে ওরা বলি দিয়েছে মানবতার মুক্তির হাজারো অগ্রনায়ককে। এতে ওরা সাময়ীক তৃপ্তি পেয়েছে ঠিকই কিন্তু হননের সেই পুরোনো নেশা মাথাচারা দিয়ে উঠেছে বার বার; যুগের পর যুগ। এই নেশা পৃথিবীর প্রতিটি জনপদেই এক ও অভিন্ন। আমাদের এই দেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই সব প্রতিক্রিয়াশীলরা অতীতে বলি দিয়েছে বাংলার সক্রেটিস কবি হেনরি ভিভিয়ান ডি রোজিও কে, শিখা সাহিত্য আন্দোলনকে, ওদের ভাষায় ‘বেজন্মা’ কবি নজরুল ইসলামকে, আহম্মদ ছফা ও সর্বশেষ হুমায়ূন আজাদকে।

কিন্তু এতেও সেই হননের অভ্যাসে ভাটা পড়েনি। অনেক আগে থেকেই ওরা পিছু নিয়েছে এ সময়ের বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের অগ্রনায়ক মুহম্মদ জাফর ইকবালের। ওদের চোখে তিনি একজন পাপাচারী ও ধর্মদ্বেষী। তাঁর সবচেয়ে বড় দোষ তিনি শিকল পড়েননি, এ সময়ের তরুণদেরও পড়তে দিতে চাননা এবং যারা ইতোমধ্যেই পড়ে ফেলেছে তাদের শিকলও তিনি ছিড়ে ফেলতে চান, তাদের মুক্ত করতে চান। আর এ কারণেই কুলাঙ্গারদের এই পথ বেছে নেয়া। ওরা এক ঢিলে দুটি নয় মারতে চাইছে তিনটি পাখিকে- মুহম্মদ জাফর ইকবাল নামক একজন আলোকবর্তিকা, ক্রমবিকাশমান মুক্তচিন্তার ধারা ও দেশের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। অথচ ওরা বরাবরের মতই ভুলে গেছে জাফর ইকবাল একজন ব্যক্তি মাত্র, মুক্ত চিন্তার একজন প্রতিনিধি মাত্র। তারও কিছু ক্রটি থাকতে পারে। মানব সমাজে তিনি ফেরেস্তা নন, তিনিও একজন মানুষ। কিন্তু তার চরিত্র হনন করলেই কিংবা তাকে স্তব্ধ করে দিলেই চিন্তার অপমৃত্যু হবে না। ওরা জানেই না, হয়তো ওদের সেই বোধ শক্তিই নেই যে চিন্তা সর্বভেদী, অবিনাশী, নিরন্তর। চিন্তা যেমন পাতাল ফুরে উঠে আসতে পারে মানব জমিনে তেমনি আসমান ফুরে আঘাত করতে পারে প্রভুদের ভুবনেও। চিন্তার তরঙ্গ বয়ে চলে এক কাল থেকে আরেক কালে; সর্বকালে। সুতরাং ওরা ব্যর্থ হবে।

অনেকে আবেগের অতিশয় প্রয়োগে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে পরামর্শ দিয়েছেন দেশ ছেড়ে চলে যাবার। সাময়িক দেশত্যাগ অনৈতিক কিংবা অবৈধ কিছু নয়। ইসলামেও তো এর নজির আছে। স্বয়ং আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ পয়গম্বর সহ অনেক নবী-পয়গম্বরকেও হিজরত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই হিজরত ছিল শারীরীক, আদর্শিক নয়। তেমনি মুহম্মদ জাফর ইকবালও চাইলে প্রয়োজনে অন্য দেশে চলে যেতে পারেন, ভিন দেশে যাওয়া তার জন্য নতুন কিছু হবে না নিশ্চই। কিন্তু চলে যাওয়া বলতে যদি বুঝানো হয় থকমে যাওয়া, মুক্ত চিন্তাকে বিসর্জন দেয়া তবে সে ভাবনায় গুড়ে বালি । কারণ জাফর ইকবালরা দেহের মায়া ছাড়তে পারেন কিন্তু চিন্তাকে বিসর্জন দেন না। নিজ চিন্তা থেকে পলায়নপরতা তাদের কাজ নয়। তারা লিখছেন এবং লিখবেন। কী বদলালো সেটা তার দেখার কাজ নয়, এটা দেখবে সময় বা ভবিষ্যত। সময়ই সবচেয়ে বড় বিচারক।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল, দখিনা হাওয়ার সাথে কিছু মরা পাতা এসে মুখে আছড়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। লিখে যান, থামবেন না।