ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

লংমার্চ আদোতে কী তা দেখিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। ফারাক্কা অভিমুখে তার সেই বিখ্যাত লংমার্চ আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখনো উজ্জ্বল। হালে সেই লংমার্চ পরিণত হয়েছে রোডমার্চে। পায়ে হাটার সাধ ও সাধ্য এখনকার রাজনীতিবিদদের আর নেই, তাই গাড়িই তাদের ভরসা। আমার ভুল না হলে, আমাদের দেশে রোডমার্চের ধারণাটা বিরোধী দল বিএনপিরই সৃষ্টি। দলটি সর্বপ্রথম রোডমার্চ করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের করা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তির বিরুদ্ধে। সন্তু লারমার সাথে সম্পাদিত শান্তি চুক্তিতে যে জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষিত হয়েছে তা নয়; তবে সে সময় লোকে বলতো, এ চান্সে শেখ হাসিনা যাতে নোবেল শান্তি পুরস্কারটা না পান সে জন্যই বিরোধী দলের এই রোডমার্চ। চুক্তিকে বিতর্কীত করে তুলা- এই আর কি।

এ আমলেও কয়েক দফা রোডমার্চ সম্পন্ন করেছে বিএনপি। সামনে আরেকটি আছে। উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া যখন রোডমার্চ শুরু করেছিলেন তখন সে যাত্রায় অংশ নিয়েছিল ৩ হাজারের মত গাড়ি। একটি রোডমার্চে গাড়ির এই সংখ্যার বিশেষণ ‘বিপুল’-ই হবে। সবাই তাই বলেছে, বিপুল সংখ্যক গাড়ি। বিএনপি যখন সরকারের ‘দুঃশাসনের’ বিরুদ্ধে রোডমার্চ শুরু করলো তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ বলে বসলেন, সবগুলোর গাড়ির নাম্বার টুকে রাখা হবে। যারা যারা গাড়ি দিয়েছে তাদের আয়ের উৎস খতিয়ে দেখা হবে। এ ধরণের বক্তব্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আসা কতটা বুদ্ধিমত্তার কাজ হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। জনগণের মধ্যেও এই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক। তারা এই মন্তব্যকে খুব একটা সহজভাবে নেয়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল কর্মসূচী দেবেই; মাঠ দখলে প্রচেষ্টা তাদের মধ্যে থাকবেই। কিন্তু সেটাকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে হাস্যকর কিংবা হালকা মন্তব্য ভারী পদাধিকারীর কাছ থেকে না আসাই ভাল।

আজ শনিবার আরো একটি রোডমার্চ শুরু হয়েছে দেশে- আয়োজক মহাজোট সরকারের অংশীদার ও রাজনৈতিক মিত্র জাতীয় পার্টি। এ রোডমার্চ নিয়েও শুনা যাচ্ছে অনেক ধরণের কথা। টিপাইমুখ ইস্যু নিয়ে এই রোডমার্চ হলেও জাতীয় উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে অনেকের মনে। এর কারণও স্পষ্ট। সাবেক স্বৈরাচার লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ (মুনতাসির মামুনের ভাষায় ‘লেজেহুমো এরশাদ’) একজন ভারতপন্থী ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত। ভারতপন্থী না হলেও ভারত বিদ্বেষী তিনি নন। কয়েক দিন আগেই তিনি ভারত ঘুরে এসেছেন। উদ্দেশ্য ছিল, আগামী নির্বাচনে তার পক্ষে বিদেশী সমর্থন অর্জন করা। একই উদ্দেশ্যে ভারত ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি ইসলামী ও মুসলিম রাষ্ট্রও ভ্রমণ করেছেন তিনি। ভারত থেকে ফিরেই তিনি কেন টিপাইমুখ অভিমুখে কর্মসূচী ঘোষণা করলেন তা নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে প্রশ্ন। তিনি কি দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নাকি আগামী নির্বাচনে বিএনপির অনুপস্থিতির সুযোগে একক ভাবে অংশ নিয়ে জাতীয়তাবাদী ভোটে ভাগ বসানোর পায়তারা করছেন। টিপাইমুখ অভিমুখী এই লংমার্চের উদ্দেশ্য কী ভারত সরকারকে চাপে রাখা নাকি ভারতেরই পরামর্শে ভবিষ্যত রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা। ভারত কী তবে এদেশে বিকল্প জাতীয়তাবাদী শক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে? নাকি ভারতের প্রত্যাশিত সমর্থন পাননি বলেই এরশাদের এমন ভারত বিরোধী কর্মসূচী? এসব নিয়ে শুধু সচেতন নাগরিক সমাজই নন ভাবছে জনতাও।

তো, আজকের এই লংমার্চ এর আয়োজক মহাজোট সরকারের অংশীদার রাজনৈতিক দল। সরকারে থেকে সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে আজকের যে কর্মসূচী তারা শুরু করলো এর প্রতিক্রিয়ায় কী বলবেন প্রধানমন্ত্রী। মিডিয়া তথ্য মতে, দুই হাজারের উপরে গাড়ি অংশ নিয়েছে আজকের লংমার্চে। এই লংমার্চ বা রোডমার্চ যেহেতু সরকার সমর্থিত নয় বরং এক অর্থে সরকারের বিরুদ্ধে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কী এইসব গাড়ির নাম্বারও টুকে রাখবেন? যেমনটা তিনি রাখতে চেয়েছিলেন বিএনপির মার্চে অংশ নেয়া গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে। নাকি ভারত বিরোধী কর্মসূচী হওয়ার কারণে গাড়ির নাম্বার টুকে রাখবে ভারতী দূতাবাস! বলা যায়না, আজকের সংগ্রহীত এই তথ্য কাজে লেগে যেতে পারে ভবিষ্যতে। কারণ বাংলাদেশের পক্ষে অদূর ভবিষ্যতে ভারতের রাজনৈতিক রাডারের বাইরে বেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।