ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ইন্টারনেট এখন একটি জগত; শুধু জগত বললেও ভুল হবে- এ এক মহাজগত। বাস্তব জগতে ইন্টারনেট নামক এই মহাজগতের প্রভাব এখন কম তো নয়ই বরং খুব বেশি। এ জগতেও রয়েছে ভাল-মন্দের মিশেল। বাস্তব জগতে যেমন আছে অপরাধ তেমনি ইন্টারনেটও এখন হয়ে পড়েছে নানান অপরাধের অভয়াশ্রম। এই ভার্চুয়াল জগতের অপরাধ মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ত্রিমাত্রিক বাস্তব জগতেও। পর্ণোগ্রাফি, ব্ল্যাকমেইলিংসহ নানা অপরাধের মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই ইন্টারনেট। কিন্তু এই অপরাধমূলক তৎপরতা আর ব্লগিং নামক বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা এক জিনিস নয়। ব্লগ যেহেতু ইন্টারনেট ভিত্তিক প্রকাশ মাধ্যম তাই এর মাধ্যমেও প্রকাশ পেতে পারে বিভিন্ন নেতিবাচক তৎপরতা। এর মধ্যে থাকতে পারে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা, অন্যের বিরুদ্ধে মানহানীকর সংবাদ পরিবেশন করা কিংবা দেশ বিরোধী প্রচারণা। শুধু ব্লগেই নয় আমাদের দেশে এ ধরণের তৎপরতা অহরহ ঘটছে। সুতরাং এইসব নেতিবাচক তৎপরতাকে সাধারণ আইনেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্লগিং হলো একটি সমাজের উদীয়মান প্রজন্মের নিখাদ মত প্রকাশ ও একান্ত চিন্তার বহিঃপ্রকাশের সংস্কৃতি। প্রচলিত প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রবীনদের আধিক্যের কারণে নবীনদের ঠাই না হওয়ায় মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য তারা বেছে নিয়েছে ব্লগিংকে। ব্লগিং এর মাধ্যমেই তারা প্রকাশ করছে নিজেদের আবেগ-অনুভূতি, ভাললাগা-মন্দলাগা সবকিছু। তাদের অনুভূতির এই প্রকাশ নিছক বালখিল্যতা নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের চেতনাসমৃদ্ধ নাগরিক হিসেবেই তারা নিজেদের চিন্তাকে প্রকাশ করছে। হতে পারে সবার চিন্তা সমান গোছালো নয় কিংবা আবেগের আধিক্যের কারণে কিছুটা অমার্জিত। আর নবীনদের এই অমার্জিত মতপ্রকাশ অবশ্যই মার্জনার দাবি রাখে। তবে এটাও অনস্বীকার্য যে, কেউ কেউ বেশ সচেতনভাবেই ব্লগিংকে স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ভার্চুয়াল জগত তো বাস্তব জগতেরই ছায়া মাত্র। এখানে যারা বিচরণ করে তারা এই আদমজগতেরই পাপী সন্তান। কিন্তু এদেরকে প্রতিরোধ করার নাম করে ব্লগিং নামক বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির উপর নিপীড়নমূলক আইনের বোঝা চাপিয়ে দেয়া মোটেই যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু ইদানিং সাইবার আইনকে প্রসংগ করে ব্লগিং নামক একটি অসাধারণ সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। সাইবার ক্রাইম নিয়ে আলোচনা এখন পরিণত হয়েছে ‘ব্লগে সাইবার ক্রাইম’ শীর্ষক আলোচনাতে। পুরো ঘটনার রূপান্তর প্রক্রিয়া এমনভাবে ঘটছে যেন ব্লগই সাইবার ক্রাইমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম; ব্লগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই হয়তো সব সাইবার অপরাধ বন্ধ হয়ে যাবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফের মত ব্লগ পরিচালনার কর্ণধাররাও এটা ভাবতে শুরু করেছেন যে ব্লগ সাইটগুলো পর্ণোগ্রাফির অভয়াশ্রম হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ব্লগারের স্বাধীন চিন্তা যেন একেকটি নগ্ন ছবি!

ব্লগিং নিয়ে বিডিনিউজ২৪.কম এর সম্পাদক প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেছিলেন। তিনি মূলত সংযমের কথাই বলেছেন। আমিও মনে করি সব ক্ষেত্রেই সংযমের প্রয়োজন আছে। তবে সংযম শুধু আইন দিয়ে হয়না এখানে আত্মসংযমও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ব্লগিং যত বিকশিত হবে ব্লগাররাও তত আত্মসংযমী হবে। কিন্তু মত প্রকাশের বেলায় আইন করে সংযম শিক্ষা দিতে গেলে সেটা অধিকার হরণ হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর নবীনদের চিন্তার অধিকার হরণ করা হলে তার প্রতিক্রিয়া নিশ্চই সুখকর হবে না। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা করবো, বিডিব্লগ সাইবার আইন নিয়ে কোন প্রচারণায় এমনভাবে অংশ নেবেনা যা ব্লগারদের কাছে তাদের অধিকার হরণের অংশীদারিত্ব বলে মনে হয়। আমরা চাই, বিডিব্লগ সাইবার আইন নিয়ে আরও সাবাধানী ভূমিকা রাখুক, যাতে একটি প্রগতিশীল ব্লগ সাইটের ঘাড়ে ব্লগারদের অধিকার হরণের দায় এসে না পড়ে।