ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

দেখতে দেখতে আবার এলো ইজতিমা। লক্ষ লক্ষ মুসুল্লি জমায়েত হতে শুরু করেছে টঙ্গির তুরাগতীরে। দিন কয়েক পরই এই জমায়েত পরিণত হবে তিন দিনের অনুষ্ঠানে, সাধুবাক্যের আনুষ্ঠানিকতায়। ধর্মভীরু বাঙালী ও ভিনদেশী মুসুল্লির অংশগ্রহণে মুখর হয়ে উঠবে সংকীর্ণ তুরাগের বিস্তৃতির্ণ তীর। আমাদের দেশে পাড়া-মহল্লায় বেশ জোরেসোরেই চলছে ইজতিমার দাওয়াতি কাজ। মসজিদে মসজিদে অতিথি হয়ে আসছে একের পর এক দাওয়াতি দল। শুধু দেশীয়দের দলই নয়, আসছে বিদেশীদের দলও। তারা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন এবং দাওয়াত দিচ্ছেন। দাওয়াত দিতে গিয়ে তারা কী বলেন তা বোধ হয় আর বলার প্রয়োজন নেই। আমাদের পাঠ্য বইয়ের মত দাওয়াতের বয়ানও মুখস্ত বিদ্যায় পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে তাবলিগের মুসুল্লিরা একই বচন আওরিয়ে যাচ্ছেন আমাদের মাঝে। আমি অন্তত গত দশ বছরে তাদের বয়ানে কোন ভিন্নতা খুঁজে পাইনি।

তবে এই দাওয়াত বা প্রচারণার মধ্যে একটা অদ্ভুত ও আপত্তিকর বিষয় লক্ষ্য করা যায়, বিশেষকরে দেশীয় দাওয়াতিদের মধ্যে। সাধারণ মানুষকে তারা ইজতিমার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বেশ জোর গলায় বলে থাকেন, ইজতিমা হলো দ্বিতীয় হজ্ব। অর্থাৎ ইজতিমায় গেলে হজ্বের মত সোয়াব পাওয়া যাবে। অনেক দাওয়াতিকে বলতে শুনেছি, পরপর তিনবার ইজতিমা করলে একটি হজ্বের সোয়াব পাওয়া যাবে। কী অদ্ভুত! হজ্ব হলো কোরানে বর্ণিত একটি ফরজ ইবাদত আর ইজতিমা হলো ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য একটি মিশন মাত্র। যার আনুষ্ঠানিক উৎপত্তি মাত্র কয়েক দশক আগে ১৯২৬ সালে, ভারতে দেওবন্দী আন্দোলনের ফসল হিসেবে। এই তাবলীগ জামাতের জনক কোন নবী নন বরং মওলানা ইলিয়াস নামক একজন ভারতীয় মুসলমান। অনেকে হয়তো বলবেন, মহানবী নিজেও ইসলাম ধর্ম গ্রহণের দাওয়াত দিতেন এবং তার সাহাবীরাও একই কাজই করতেন। কিন্তু এই যুক্তি দিয়েই কী প্রমাণ করা যাবে যে তিনটি ইজতিমায় অংশ নেবার মূল্য একটি হজ্বের সমান। মোটেই নয়। ইসলামের কোন ইবাদত ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নত-নফল তা নির্ধারিত হয়ে গেছে শেষ নবীর নবুয়াতের সময়েই। পরবর্তী সময়ে যে ইবাদতধর্মী কর্মকান্ডগুলো মুসলমানরা পরিচালনা করে আসছে তাকে কোন ক্ষমতা বলে আমরা অন্য একটি ফরজ ইবাদতের সাথে তুলোনা করি তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। তাছাড়া মওলানা ইলিয়াস সুরা আল ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতটিকে তাবলীগি কর্মকান্ডের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করলেও এ আয়াত তাবলীগ জামাতকে ইবাদতের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা দেয়না।

হতে পারে ইজতিমা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গণজমায়েত। হজ্বের পরে এই ইজতিমাতেই সর্বাধিক মুসলমানের আগমন ঘটে। কিন্তু এটা কোন বিধিবদ্ধ ইবাদত হতে পারে কি? কোন মুসলমান যদি ইজতিমাতে অংশ না নেয় তবে এর জন্য পরকালে তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে কি? মোটেই নয়। ইজতিমা ধর্মবাণী শিক্ষার জন্য এবং ধর্মপ্রচারের একটি অনুষ্ঠান মাত্র। এর কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। অথচ এই অনুষ্ঠানে অংশনেবার জন্য তাবলীগ জামাতের লোকেরা যেভাবে ইচ্ছাকৃত ভ্রান্তির আশ্রয় নিচ্ছেন তা অবশ্যই নিন্দনীয়। ধর্ম প্রচারকে মন্দ বলার সুযোগ নেই তবে এ কাজে ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়া মোটেই ধার্মীকের কাজ নয়।

তাই তাবলীগ জামাত ও তাদের সমর্থকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে এই ছলচাতুরী থেকে নিজেদের নিবৃত রাখুন। আর ‘অন্য কেউ বলতে পারে, আমি তো বলিনা’ জাতীয় কথা বলে এই বিভ্রান্তিকে বৈধতা দেবার চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন।