ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

ব্লগিং সম্পর্কে আমার যে ধারণা তার সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে ৬ বছর আগে, ২০০৬ সালে। সে ধারণা বাংলার নয়, ইংরেজির। ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে সে সময় আমি পরিচিত হয়েছিলাম ব্লগস্পট নামক বিখ্যাত ফ্রি ব্লগ সাইটের সাথে। আগ্রহ নিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম নিজের কথা ও কবিতাগুলো প্রকাশের উদ্দেশ্যে। সে সময় বেশ ঝোক ছিল ইংরেজি কবিতার প্রতি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আমার একটি করে ইংরেজি কবিতা ছাপা হতো ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট এর শুক্রবারের সাময়িকীতে। কোন একটি শুক্রবারে যখন দেখলাম শুধুমাত্র আমার কবিতা নিয়েই সাজানো হয়েছে পত্রিকাটির উইকেন্ড ম্যাগাজিনের সাহিত্য পাতা, বেশ আনন্দিত হয়েছিলাম। তখন থেকেই ইচ্ছা জেগেছিল কবিতাগুলো নিজের ব্লগ পেইজে জমিয়ে রাখার। সে ইচ্ছা থেকেই ব্লগস্পটে আমার প্রবেশ এবং ক্ষণকালের বিচরণ। কিন্তু আমার যেমন স্বভাব! ধরে রাখিনি কবিতা চর্চা এবং সেই সাথে ব্লগস্পটের পেইজটিও। তবে ইন্টারনেট নামক বিশাল জগতে এখনো স্বনামে সার্চ করলে খুঁজে পাওয়া যায় সেই পুরোনো পাতা কিংবা আমার স্বল্পকালীন কবিতার খাতা। তবে যে সত্য না বললেই নয়, আমার এই ব্লগ পাতার আমি ছাড়া অন্য কোন পাঠক কখনোই ছিলনা।

ইংরেজি ব্লগ-এ ঘুরাফেরা করতে গিয়েই এক সময় জানতে পারি বাংলা ব্লগিং এর কথা। অনুসন্ধানে যে নামটি সবার আগে আমার দৃষ্টিতে টোকা দিয়েছিল সে সামহোয়ার ইন ব্লগ। প্রথম পরিচয়েই জেনেছিলাম, এটিই বাংলা ভাষায় সর্ববৃহৎ ব্লগ সাইট। এটা ২০০৬ এর ২ বছর পরের কথা। সামুর সাথে পরিচিত হবার পর রেজিস্ট্রেশন করতে বিলম্ব করিনি। সে সময় একটি ধারণা পেয়েছিলাম, সামুর অনেক ব্লগারকেই প্রথম পাতায় প্রবেশাধিকার পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে মাসের পর মাস কিংবা বছর। তবে বেশ অবাক হলাম যখন মাত্র ৭ দিনের মাথায় আমাকে সেই কাঙ্খিত প্রবেশাধিকার দেয়া হলো। ব্লগ স্পট থেকে যখন সামুতে এলাম তখন কবিতা ছেড়ে আমি অনুবাদে ঝুঁকেছি। বেশ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা ইতোমধ্যেই ছাপতে শুরু করেছে আমার অনূদিত গল্প ও কবিতাগুলো। তাই বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিলাম তখন। পত্রিকায় ছাপা হওয়া অনুবাদগুলোই পোস্ট করে দিতাম ব্লগে। ব্লগ পোস্ট হিসেবে অনুবাদকেই বেছে নিয়েছিলাম আরো একটি কারণে, সামুর ব্লগারদের গালিগালাজ। শুরুতে বিভিন্নজনের পোস্ট পড়ে গালিগালাজের যে নমুনা দেখেছিলাম তাতে আমার মত নিরিহ মানুষের ভয় না পেয়ে উপায় ছিল না। তাই সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছি রাজনৈতিক লেখা প্রকাশের প্রবণতাকে। তবে সামুতে অনুবাদের মধ্যেই আবদ্ধ থাকিনি সব সময়। একবার কোন এক বিশেষ ব্যক্তির কার্টুন প্রকাশের কারণে আমাকে ব্যান করা হয়েছিল সামুতে। অবশ্য তিনদিন বাদেই তা উঠে যায়। এই ব্যান হবার অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছিলাম, আমরা বাঙালী কিংবা মুসলিমরা এখনো কতটুকু অসহিষ্ণু ও লঘু আবেগের অধিকারী।

এরই এক পর্যায়ে আমার ব্লগিং এর সীমানা সামু থেকে প্রসারিত হয় প্রথমআলো ব্লগ ও পরে সোনার বাংলাদেশ ব্লগে। প্রথম আলো ব্লগে যে সময় রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম ঠিক সে সময় থেকে নিয়মিত হতে পারেনি। নিয়মিত হয়েছিলাম অনেক পরে। বিলম্বে শুরু করলেও এই ব্লগে আমি লিখে আনন্দ পেয়েছি, সহযোগিতা পেয়েছি- ব্লগারের, সঞ্চালকের। সোনার বাংলাদেশ ব্লগ যখন যাত্রা শুরু করে তখন বেশ আগ্রহ নিয়ে সেখানে রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম এর কিছু নতুনত্বের কারণে। শুরুতে ব্লগটি বেশ আকর্ষণীয় হলেও শেষ পর্যন্ত এই ব্লগে প্রাধান্য বিস্তার করে বিশেষ মাতাদর্শের ব্লগাররা। বিশেষকরে, জাতিরজনক ইস্যুটি নিয়ে এই ব্লগের ভূমিকা ছিল অগ্রহণযোগ্য। ফলে ধীরে ধীরে আমার ব্লগিংও সীমিত হতে থাকে এখানে। তাছাড়া ব্লগটিতে মৌলবাদী ভাবনার অবাধ বিস্তার আমাকে ব্লগটির প্রতি অনাগ্রহী করে তোলে প্রচন্ডভাবে। কিন্তু ব্লগিং অভ্যাসটা ততো দিনে আমার মধ্যে গেথে গিয়েছিল বেশ পাকাপোক্তভাবে। তাই একটি বিশেষ ভাবনা থেকেই স্থির করি নতুন নামে নতুন করে ব্লগিং চালিয়ে যাবার। এই ভাবনা থেকেই ২০১০ এর ডিসেম্বর থেকে পুরোনো নাম পরিত্যাগ করে বেছে নেই নতুন নাম- বাসন্ত বিষুব। বাসন্ত বিষুব শব্দটির সাথে কম-বেশি সবাই পরিচিত। সৌরচক্রের দুটি অবস্থানে পৃথিবী অর্জন করে অভিন্ন দুটি গুণ- সমান দৈর্ঘ্যরে দিন-রাত্রি। একটি ২১শে মার্চ ও আরেকটি ২৩শে সেপ্টেম্বর। এই দুটি দিনেই পৃথিবীতে দিনরাত্রি সমান। ২১শে মার্চ বসন্তে হওয়ায় এর নাম বাসন্ত বিষুব ও ২৩শে সেপ্টেম্বর শরতে হওয়ায় এর নাম শারদ বিষুব। বিশেষ কারণে বাসন্ত বিষুবটাই আমার কাছে প্রিয় আর এজন্যই এই নামটিই বেছে নেয়া।

কিন্তু এর বিড়ম্বনা ছিল অনেক। অনেক ব্লগার আমার লেখা ও নামের কারণে আমাকে সাব্যস্ত করেছে হিন্দু হিসেবে, কখনো ওপারের লোক হিসেবে আবার কখনো দালাল হিসেবে। ফলে এই নিকে আমার ব্লগিং শুরু হয় অবাধ গালিগালাজ খেতে খেতে। বাসন্ত বিষুব নামটি না নিলে আমি হয়তো জানতেই পারতাম না ভদ্রতার আড়ালে আমাদের ভন্ডামী, গোড়ামী ও সংকীর্ণতা ঠিক কোন পর্যায়ে আছে বা পৌঁছে গেছে। তবে যাই হোক, যে ব্লগে বাসন্ত বিষুব নামের উৎপত্তি সেই ব্লগে এখন আর নিয়মিত না হলেও নিয়মিত আছি বিডিনিউজ২৪.কম ব্লগে। নিয়মিত থাকবো যতদিন সম্ভব। কারণ সময় বদলায় এবং বদলে দেয় সবকিছুকে।

এই লেখাটি না লিখলেও চলতো, তবুও লিখলাম। ব্লগার হিসেবে সাধারণ হলেও মনের কথা লিখতে তো আর বাধা নেই! আর এই লেখাটির জন্য আজকের দিনটিকে বেছে নিলাম আরো একটি কারণে-

আজ ২১শে মার্চ। আজ বাসন্ত বিষুব, আজ দিনরাত্রি সমান।