ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

অবশেষে দেশবাসী দম নেবার ফুরসত পেল। টানা দিনদিনের হরতালে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল তা আপাতত কিছুটা প্রশমিত। যদিও আগামী রবিবার থেকে কঠোর আন্দোলনের হুমকী আছে। বেগম খালেদা জিয়া কঠোর আন্দোলন বলতে যে কী বুঝিয়েছেন তা সবারই বোধগম্য। বর্তমানে এই অভাগা দেশে হরতাল ছাড়া আর কোন কঠোর আন্দোলন আছে কিনা তা আমার জানা নেই, বোধকরি জানা নেই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোরও। আমাদের এই জানার অক্ষমতাকে হরতাল বিলাস ছাড়া আর কিইবা বলা যায়। তাই ধারণা করা যায়, শনিবারের পর থেকে লাগাতার হরতালসহ আরো নতুন কিছু যন্ত্রণা দেশবাসী উপভোগ করতে যাচ্ছে।

গত তিনদিনের হরতালে যা হবার তাই হয়েছে। পাঁচটি তাজা প্রাণ মর্তচ্যুত হয়েছে, পাঁচটি পরিবারে হাহাকার শুরু হয়েছে, শত শত আহত কর্মীদের সংসার থেকে সুখ বিদায় নিয়েছে, অর্থনীতির চাকা থমকে গেছে, আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য ঈশ্বরের আরশকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই ঘটনাগুলো ডাউনওয়ার্ড। তবে আপওয়ার্ডও আছে, সেটা পরে বলছি। কিন্তু এই যে উত্থান-পতন কিংবা আসা-যাওয়া- যাই বলিনা কেন, এসবের কারণে ইলিয়াস আলী ফিরেনি, তার পরিবারের কান্নাও থামেনি। ফেরেনি ড্রাইভার আনসারও। অনেকে বলেন, একজন ইলিয়াস আলীর জীবনের যে মূল্য ঠিক একই মূল্য তার ড্রাইভার আনসার এবং দগ্ধ হওয়া বাসড্রাইভারেরও। এই কথার সাথে আমার কিছুটা ভিন্নমত আছে। হ্যাঁ, জীবনের মূল্য সব পরিবারের কাছেই সমান কিন্তু দেশে আজ যা ঘটছে তা তো শুধু জীবনের মূল্য বিচারে নয়, যে বিচারবোধে দেশবাসীকে দগ্ধ করা হচ্ছে তা রাজনৈতিক। কারণ একজন আনসার আলী যতটুকু রাজনৈতিক মূল্য তার চেয়ে ঠের বেশি মূল্য ইলিয়াস আলীর। রাজনীতিতে কিংবা জাতীয় পরিমন্ডলে কিংবা বিএনপির সংসারে ইলিয়াস আলির যে সম্ভাবন জেগে উঠেছিল সে সম্ভাবনা জেগে উঠেনি আনসার আলী কিংবা ঐ বাস ড্রাইভারের ক্ষেত্রে। সম্ভাবনা বরাবরই মূল্যবান। আর এই মূল্যেরই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে পুরো দেশকে। আমি এবং আমরা নিশ্চিত, মূল্য দেবার এই ধারা সহসাই থামবে না বরং চলবে অবিরাম। এই অবিরাম চলার মধ্য দিয়ে আমাদের মত আম পাবলিকের কি হলো তাকে কি আসে যায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইলিয়াস আলীর মূল্য বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে করে তুলছে মহামূল্যবান। এটাই সেই আপওয়ার্ড। গত কয়েক দিনে বেগম খালেদা জিয়া যেমন বিপুল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেছেন তেমনি স্তিমিত বিএনপিও রাজনীতির ময়দানে হাসিল করেছে দৃশ্যগত ক্ষমতা। বিএনপি প্রমাণ করতে পেরেছে হরতাল দিয়ে দেশের বারোটা বাজাবার যথেষ্ট সক্ষমতা তাদের আছে।

কিন্তু এত কিছুর পরও সরকারের যে ভূমিকা তা কিছুটা হলেও সন্দেহজনক এবং হতাশাজনক তো বটেই। ইলিয়াস আলীর মত হটফিগার কিংবা দৈবক্রমে হটফিগার যখন নিখোঁজ হয়ে যায় তখন সেটা নিয়েও তামাশা আমাদেরকে ভাবিত করে। এমন হতো না যদি তামাশা করতো সরকারের গুণধর আইনপ্রতিমন্ত্রী কিংবা অতিবুদ্ধিজীবী মাহবুবুল আলম হানিফ। দুঃখের বিষয় তামাশা এসেছে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। যিনি ইলিয়াস আলীর গুম হওয়াকে কখনো হারিয়ে যাওয়া, কখনো লুকিয়ে থাকা কিংবা কখনো দলীয় কলহের শিকার বলে মন্তব্য করেছেন। বাঙালী রসিক কিন্তু এত রসিকথা ভাল না। প্রধামন্ত্রী যদি জানেনই ইলিয়াস আলীকে কারা গুম করেছে তবে এতো দিনেও তার সরকার কেন হদিস দিতে পারেনি। কেন প্রমাণ করতে পারেনি ইলিয়াস আলীকে ইস্যু করে বিরোধী দল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করছে। ঘটনার ৭ দিন পরও অভিযুক্ত র‌্যাব এমন কোন চিহ্ন দেখাতে পারেনি যাতে বুঝা যায় তদন্তের অগ্রগতি হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় র‌্যাব এমনভাবে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দেয় যেন সে মহাবীর আলেকজান্ডার। অথচ এই ইস্যুতে- করছি, হচ্ছে, হবে ছাড়া আর কিছুই এই বাহিনী বলতে পারেনি। বরং হাস্যকর ভূমিকাও তারা ইতোমধ্যে পালন করেছে। একজন অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য তার স্ত্রীকে নিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। ভাবখানা এমন যে, আপনি আমাদের সাথে থাকলে আপনার স্বামীকে পাব, তা না হলে আমাদের আর করার কিছুই নেই।

কিন্তু এসব ভাড়ামী মেনে নেওয়া যায় না। নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে নাগরিকদের সাথে এমন তামাশা অগ্রহণযোগ্য। তারা ভাড়ামী করবে আর সেই অপরাধে জনগণকে হরতাল গিলতে হবে তা হতে পারেনা। তাই সরকার এবং র‌্যাবেকে বলবো, ইলিয়াস আলীকে আর নিখোঁজের তালিকায় না রেখে হয় জীবিত না হয় মৃত ঘোষণা করুণ। এতে অন্তত এক পশলা হরতাল হয়ে পরে সব থেমে যাবে। কারণ মরা মানুষকে নিয়ে কেউ আর বেশিদূর এগুবে না। কিন্তু এই বিরতিহীন গুড়ি গুড়ি হরতাল আমাদের শ্বাসরোধ করে ফেলেছে। আমরা এর থেকে মুক্তি চাই।