ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

RANGPUR-PHOTO

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা প্রস্তাবিত ৮ম জাতীয় বেতন কাঠামো বাতিল, পুনঃনির্ধারণ এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ঘোষণার দাবিতে কর্মবিরতি এবং অবস্থান ধর্মঘট করছেন! আমিও চাই উনাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো হউক; কেননা বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে উন্নত শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। তবে বাংলাদেশের শিক্ষকদের অনেক দুর্বলতার দিক আছে, সেগুলাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রমোশনের জন্য চাকুরীকালিন সময়কেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সময়ের সাথে যে আপনার দক্ষতার উন্নতি নাকি অবনতি হয়েছে এর তেমন একটা মূল্যায়ন করা হয় না। একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন তিনভাবে হতে পারে – উনার প্রকাশিত জার্নাল, কনফারেন্স আর্টিকেল, রিপোর্ট বা বই; উনার অধীনে সমাপ্ত প্রজেক্ট এবং সর্বোপরি ছাত্রদের সরাসরি মূল্যায়ন। বাংলাদেশের শিক্ষকদেরকে ছাত্ররা মূল্যায়ন করতে পারে না, এই ধারা এখনও প্রচলিত নয়। প্রথমে একজন শিক্ষকের পাবলিকেশন এবং পদোন্নতি নিয়ে আলোচনা করবো, পরে প্রজেক্ট নিয়ে!

বাংলাদেশে সাধারণত, আপনি যদি ২ বছর লেকচারার থাকেন আর একটা মাস্টার্স ডিগ্রী থাকে তাহলেই সহকারী অধ্যাপক হয়ে গেলেন। একটা PhD থাকলেই সহযোগী অধ্যাপক। এরপর নিজেদের জার্নালে ছাপানো গোটা পাঁচেক ক্লাস রিপোর্টের চেয়েও নিম্নমানের আর্টিকেল থাকলেই সরাসরি অধ্যাপক!

যেখানে বাংলাদেশের বাইরে সাধারণত নুন্যতম PhD ডিগ্রী এবং যথেষ্ট পরিমাণ ISI জার্নাল আর্টিকেল পাব্লিকেশান থাকলেই কেবল আপনি প্রভাষক পদে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে পারবেন। ISI জার্নালগুলো (এদেরকে recognized বা refereed জার্নালও বলা হয়ে থাকে) হল একমাত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক জার্নাল; বাকিসব জার্নালের লেখাকে উন্নত-বিশ্বে ডাস্টবিনের ময়লার সাথে তুলনা করা হয়! সত্য কথা বলতে গেলে বাংলাদেশের ৮৫% শিক্ষকই এইসব জার্নাল সম্পর্কে একদমই অজ্ঞ। সেই সুবাদে আমরা ছাত্ররাও অন্ধকারে থাকি। বাংলাদেশের বহু বহু প্রফেসর শুধুমাত্র নিজের ডিপার্টমেন্টের, নিজেদের রিভিউ করা এবং নিজেদের ছাপানো জার্নালের উপর ভিত্তি করেই প্রফেসর হয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং-এর প্রায় ৬০% নির্ভর করে শুধুমাত্র শিক্ষকদের গবেষণাপত্রের মানদণ্ডের উপর। আন্তর্জাতিকভাবে এইসব আর্টিকেলের citation, impact point ইত্যাদির ভিত্তিতেই একজন শিক্ষকের এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু যুগের পর যুগ এভাবে জাতীয় জার্নালে আর্টিকেল ছাপানোর ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের এবং শিক্ষকদের র‍্যাঙ্কিং বলে আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। Scopus, ResearchGate, Google Scholar, Thomson Reuters, ORCID ইত্যাদি অনেক নামীদামী সার্চ-ইঞ্জিনের মাধ্যমে আপনি এখনই খুঁজে দেখতে পারেন!

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রমোশনের সাথে পাবলিকেশনের কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে; আবার ক্ষেত্র-বিশেষে আপনার কোন আর্টিকেল পাব্লিকেশান না থাকলেও আপনি একজন প্রফেসর হয়ে যেতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ (BUET), এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (CUET) নীতিমালা তুলে ধরলাম। বুয়েটের ছাত্র ছিলাম আর চুয়েটের শিক্ষক, এই সুবাদে আজকে লিখছি!

BUET

[১] প্রভাষক হওয়ার যোগ্যতাঃ শুধুমাত্র স্নাতকে ফার্স্ট ক্লাস, ভাল ফলাফল বা CGPA (অফটপিক-এই রীতিও অনেক ক্ষেত্রেই ভঙ্গ করা হয়। রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তি পরিচয়ে অনেকেই প্রভাষক হতে পারেন)।

[২] সহকারী প্রভাষক হওয়ার যোগ্যতাঃ একটা মাস্টার্স এবং ২ বছরের প্রভাষক হিসাবে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা।

[৩] সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতাঃ একটি PhD, মাত্র একটি ISI, মাত্র ২টি জাতীয় জার্নালএবং মোট ৩ বছর সহকারী অধ্যাপক হিসাবে চাকরীর অভিজ্ঞতা।

[৪] অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতাঃ সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে ২-৩ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, সর্বমোট মাত্র ৩টি ISI এবং ৩টি জাতীয় জার্নালে আর্টিকেল থাকলেই আপনি একজন প্রফেসর হয়ে যেতে পারবেন।

মোদ্দা কথা, বুয়েটে লেকচারার হিসাবে যোগদানের পরে বা আগে একটি মাস্টার্স, একটি PhD এবং মোট ১০টি আর্টিকেল (৪টি ISI) পাবলিশ করতে পারলেই আপনি মাত্র ১০ বছরেই একজন পরিপূর্ণ অধ্যাপক (Professor) হওয়ার মর্যাদা অর্জন করবেন! এভাবে অনেকেই এখন বুয়েটের অধ্যাপক আছেন!!

CUET

[১] প্রভাষক হওয়ার যোগ্যতাঃ স্নাতকে প্রথম শ্রেণী।

[২] সহকারী প্রভাষক হওয়ার যোগ্যতাঃ মাস্টার্স এবং ২ বছরের প্রভাষক হিসাবে অভিজ্ঞতা।

[৩] সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতাঃ একটি PhD, তিন বছর সহকারী প্রভাষকের অভিজ্ঞতা এবং মাত্র ২টি প্রকাশনা (ISI না হলেও চলবে)।

[৪] অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতাঃ সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে ২-৩ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং মাত্র ৫টি প্রকাশনা প্রকাশনা (ISI না হলেও চলবে)।

অর্থাৎ, চুয়েটে আপনি একটি মাস্টার্স, একটি PhD, এবং মাত্র ৭টি যেকোনো ধরণের প্রকাশনা থাকলেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় একজন প্রফেসর হতে পারবেন। এহেন যোগ্যতা নিয়ে উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হওয়াও বেশ কঠিন কাজ, আর প্রফেসর? কথাটা নির্মম হলেও ১০০% সত্য!

এবার বাস্তব কাহিনী বলি। আমি তখন (২০১৩ সালে) অস্ট্রেলিয়ার Monash বিশ্ববিদ্যালয়ে PhD গবেষণারত, বিভাগ – Centre for Geography & Environmental Science। ঐটা তখন বিভাগ ছিল, এখন সেন্টার করে দিয়েছে (মনে হয় অর্থের অভাবে)। ঐ বিভাগে গিয়ে খুব অবাক হলাম, মাত্র একজন প্রফেসর আছেন; আর বিভাগীয় প্রধান এখন সহযোগী অধ্যাপক। অস্ট্রেলিয়াতে একজন অধ্যাপক হওয়া খুবই কঠিন কাজ, অনেকেই শেষ পর্যন্ত হতে পারেন না। এখানে শিক্ষকেরা দশকের পর দশক ISI পাব্লিকেশান, মিলিয়ন ডলার প্রজেক্ট এবং ক্লাস করিয়েও প্রমোশন পান না।

শুধু বুয়েট সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৪৭ জন প্রফেসর আছেন; আর আমি বর্তমানে University College London (UCL)-এ PhD করছি, যার সিভিল বিভাগে মাত্র ১২ জন প্রফেসর আছেন! প্রসঙ্গত বলে রাখি, UCL এই বছর ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক অফিসিয়াল জরিপে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সেরা গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করেছে এবং যা বিশ্বের অল-টাইম সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বলেই বসলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের করাপ্ট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার। প্রত্যেকেই এখানে সহজেই অধ্যাপক হয়ে যান। সহযোগী অধ্যাপকদের তাঁরা খেয়াল খুশিমতো পদোন্নতি দেন। দেখা গেছে, নিচে ১০ জন প্রভাষক; কিন্তু ওপরে এক হাজার অধ্যাপক। এটা কিছু হলো? শুধু ওপরে পদোন্নতি হবে, এটা ঠিক না।’

একটি বিভাগে এতোগুলো প্রফেসর থাকা শুধু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই সম্ভব। কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হওয়া অনেক বেশি সহজ। যার উদাহরণ আমি টেনে ধরেছি বুয়েট এবং চুয়েটকে দিয়ে। আমি মনে করি, অতি-শীঘ্রই শিক্ষকদের প্রমোশনের বিষয়টি যুগোপযোগী করা উচিত! কমপক্ষে ২৫টি ISI জার্নাল না থাকলে এবং PhD স্টুডেন্ট তত্ত্বাবধানের অভিজ্ঞতা না থাকলে উনার প্রফেসর হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে আধুনিক যুগে প্রশ্ন থেকেই যায়!

এটা সঠিক যে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি হয়ে থাকে; যে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু শিক্ষকরা এই নীতিমালা আধুনিকায়নের জন্য আন্দোলন করেন না, নীরবেই খুশি মনে প্রফেসর হয়ে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র বেতন বাড়ানোর আন্দোলনের দিকেই নজর দিলে হবে না, এর সাথে সাথে যথাযথ আন্তর্জাতিক মানের পাঠদান এবং গবেষণা হচ্ছে কিনা এটাও খতিয়ে দেখতে হবে।

বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি হল – বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে আসতে হবে। এর জন্য আমাদেরকে জানতে হবে যে কিভাবে এইসব র‍্যাঙ্কিং হয়ে থাকে? উদাহরণস্বরূপ “QS World University Rankings” নিয়ে আলোচনা করলাম। মোট ৬টি সূচকের উপর ভিত্তি করে এই র‍্যাঙ্কিং করা হয়ে থাকে

[১] ২০% নির্ভর করে শিক্ষকদের বিগত ৫ বছরের প্রকাশনাগুলো কতবার দৃষ্টান্তরুপ উল্লেখ (citation) করা হয়েছে বা রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইহা অনেকটা কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ মানপত্র। অর্থাৎ আপনি যদি ISI পাবলিকেশন না করেন তাহলে আপনার citation শূন্য। আবার শুধু ISI জার্নাল লিখলেও হবে না, কেউ যদি আপনার ঐ আর্টিকেল বা বই রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখ না করে, তবেও আপনার পয়েন্ট শূন্য। Citation পাওয়া খুবই কঠিন একটি কাজ!

[২] ৪০% নির্ভর করে বিদ্যালয়-সংক্রান্ত সুখ্যাতির উপর। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে উন্নতমানের গবেষণা কাজ হচ্ছে। আপনার citation কম মানেই আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা বিভাগে উন্নত মানের গবেষণা হচ্ছে না।

[৩] ২০% ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের উপর নির্ভর করে। এখানে প্রতিটি ছাত্রের বিপরীতে কতজন শিক্ষক আছেন এবং ছাত্রদের যথাযথ তত্ত্বাবধানের কথা বিবেচনা করা হয়।

[৪] ১০% নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের সুনামের উপর। ইহা নির্ভর করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতো ভাল গ্র্যাজুয়েট বের করছে।

[৫] ৫% নির্ভর করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন আন্তর্জাতিক শিক্ষক আছেন।

[৬] বাকি ৫% নির্ভর করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন আন্তর্জাতিক ছাত্র আছেন।

তো পর্যালোচনা করলে ইহাই বলতে হবে যে কেবলমাত্র মানসম্মত শিক্ষকের উপর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং বহুলাংশে নির্ভর করে। সকল শিক্ষক যদি নিয়মিত গবেষণা করেন এবং ঐ গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশ করেন তবেই ৬০% পয়েন্ট পাওয়া সম্ভব। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। এছাড়া ভালমানের গবেষণা হলে অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ভাল হবে, আপনি PhD স্টুডেন্ট পাবেন এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও ছাত্রদেরকে আকর্ষণ করা যাবে। সেজন্য যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষকরা এভাবে জাতীয় জার্নালে নিম্নমানের জার্নাল প্রকাশনা চালিয়ে যাবেন, ততদিন পর্যন্ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাঙ্কিং ভাল হবে না। ইহা একটি সামগ্রিক এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একটি বিভাগের সকল শিক্ষক যদি বছরের পর বছর ISI জার্নাল প্রকাশ করতে থাকেন, তবেই এক সময় আমরা র‍্যাঙ্কিং-এ উপরের সারিতে উঠে আসবো।

প্রফেসর হওয়ার নীতিমালা যদি এতো সহজ হয়ে থাকে যে জাতীয় জার্নাল দিয়েই পদোন্নতি সম্ভব তাহলে কেন কেউ কষ্ট করে ISI প্রকাশনা করতে যাবে? তবুও অতি-সাম্প্রতিককালে কিছু নবাগত তরুণ শিক্ষক ISI পাব্লিকেশান নিয়ে কাজ করছেন, আর হাতেগোনা কিছু প্রফেসর আন্তর্জাতিক মানের কাজ করেন। এভাবে দশকের পর দশক ধরে আমাদের ঘুণে ধরা নীতিমালা এবং শিক্ষকদের অবহেলার কারণে আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং-এ নাই!

একটা উদাহরণ দেই – ২০১২ সালে আমার পরিচিত একজন বড়ভাই মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। উনার কাছ থেকে জানতে পারি যে উনাকে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭টি ISI জার্নাল পাবলিশ করতে হবে, নাহলে চাকরী থাকবেনা। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে এহেন চাপ আছেই, PhD স্টুডেন্টদেরকেই প্রতি বছর একাধিক পাবলিকেশন করতে হয়, আর প্রফেসরদের কথা বাদই দিলাম। ক্লাসে যতই লেকচার দেন না কেন, প্রকাশনা ছাড়া গতি নাই!

এবার আসা যাক, কেন এতো প্রকাশনা দরকার? আমি বুয়েটেই দেখেছি যে অনেক প্রফেসর প্রায় ২০-৩০ বছর ধরে একই লেকচার-নোট ক্লাসে দিয়ে যাচ্ছেন। আমার বড় ভাই, তার বড় ভাই, তার বড় ভাই — এভাবে যুগের পর যুগ! ভাবতেই অবাক লাগে। এগুলো হল আধুনিক গবেষণার অভাব। আপনি যদি আজকে একটি আর্টিকেল লিখতে যান, কিন্তু এটা নিয়ে আগেই কাজ হয়ে গেছে কিংবা আপনার প্রযুক্তি আধুনিক নয়, তবে আপনার আর আর্টিকেল প্রকাশ করা হবে না, উহা আশার গুঁড়ে-বালি। বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার ঝড়ের বেগে পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতি বছর সফটওয়্যার নতুন ভার্সন পাচ্ছে, নতুন নতুন প্যাকেজ এবং টুল বের হচ্ছে, এর সাথে তাল মিলাতে না পারলে আপনি হারিয়ে যাবেন। একজন শিক্ষক যদি উনার ফিল্ডের নতুন নতুন আর্টিকেল, বই, রিপোর্ট ইত্যাদি না পড়েন, কিংবা নতুন প্রযুক্তির সাথে তাল মিলাতে না পারেন তবে ISI পাব্লিকেশান তো বহু দূরের কথা, ঠিকমতো ক্লাস নোটই আপডেট করতে পারবেন না।

আবার অনেক শিক্ষক ঠিকমতো ক্লাস নেন না, কিংবা ক্লাসে আসেন না, বা ক্লাসে আসলেও গল্প করেন, পাঠদান করান না। বুয়েটেই দেখেছি! কিভাবে ক্লাস নিবেন, উনি তো সেই ১৫-৩০ বছর আগে PhD করেছেন, এর পর আর আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে উনার কোন সম্পর্ক নাই। ক্লাসে পড়ানোরও কিছু নাই, সেই মান্ধাতার আমলের ক্লাস নোট যা সেমিস্টার শুরুর আগেই অনেক ছাত্ররা মুখস্ত করে ফেলেছে! ইহাই প্রকৃত বাস্তবতা। আবার ক্লাসের ছাত্রদের কর্তৃক শিক্ষক-মূল্যায়ন করার উপায় নাই; যা বাইরের দেশে অবধারিত। ছাত্রদেরকে মূল্যায়ন করতে দিলে তো ঐসব প্রফেসরদের চাকরী থাকবে না!

UCL-এর এক প্রফেসর সেদিন গল্পে গল্পে বললেন – উনি একবার মাত্র একটা ক্লাস নেন নাই কোন এক সেমিস্টারে। ঐ ক্লাসের একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছিলেন টাকা ফেরত চেয়ে। কারণ বিদেশে সবাইকেই টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হয়। তাই একজন শিক্ষকের পক্ষে ক্লাস ফাঁকি দেয়া তো দূরের কথা, লেকচার আধুনিক এবং মানসম্মত না হলেও মহাবিপদ অপেক্ষামান। এহেন কোন জবাবদিহিতার সুযোগ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু অনুপস্থিতই নয় বরং অকল্পনীয়!

এইসব কারণে প্রতিটি শিক্ষকের প্রতি বছর একাধিক ISI পাব্লিকেশান বাধ্যতামূলক করা উচিত। একজন শিক্ষকের কাজ শুধুমাত্র ক্লাসে লেকচার দেয়া নয়, ঐ লেকচার আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে উপস্থাপন করছে কিনা ইহা নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি। আধুনিক গবেষণাবিহীন শিক্ষক তাই মৃত-শিক্ষকের সমতুল্য। এছাড়াও অনেক শিক্ষক ছাত্রদেরকে ‘Recommendation Letter’ দিতেও নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন এবং ফলে অনেকেই দুর্ভোগের শিকার হন। ‘Recommendation Letter’ দেয়া একজন শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব যা ভুলে গেলে চলবে না। এছাড়াও শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি, ছাত্রদের আক্রমণাত্মক আচরণ, হলুদ দল, সবুজ দল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা আজকে নাই বা করলাম!

এবার আসা যাক, প্রজেক্ট কিংবা কনসালটেন্সির বিষয়ে। প্রজেক্ট এবং কনসালটেন্সিও একজন শিক্ষকের নিয়মিত করা উচিত। এতে করে বাস্তব জগতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং বাস্তবসম্মত জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয়। আমার ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক প্রজেক্ট করতে পারেন, কিন্তু এই প্রজেক্ট করার জন্য উনি যতটুকু সময় ব্যয় করবেন, তার ভিত্তিতে উনার শিক্ষকতার মূল বেতন থেকে টাকা কেটে নেয়া হয়। অর্থাৎ ১০% সময় কোন প্রজেক্টে দিলে, বেতন থেকে ১০% সময় এবং টাকা কর্তন করা হয়। ঐ টাকা দিয়ে আরেকজন শিক্ষককে ১০% সময়ের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। এভাবে বিদেশে প্রজেক্ট কিংবা কনসালটেন্সি করতে হয়। বাংলাদেশে এহেন কোন নিয়ম নাই। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক একাধারে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন, অন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন, নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং বাইরের অফিসের প্রজেক্ট এবং কনসালটেন্সি করে থাকেন। এসকল বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার! আর এটাও মনে রাখতে হবে যে গবেষণার টাকা কিন্তু শুধু সরকারই নয় বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং NGO থেকে নিয়ে আসার চেষ্টা কিন্তু শিক্ষকদেরকেই করতে হয়। ইংল্যান্ডের সরকার কিন্তু বিনা কারণে কাউকে টাকা দিয়ে বলে না যে প্রজেক্ট করুন। এদেশে প্রজেক্ট প্রপসাল কল করা হয় মিলিয়ন পাউন্ডের; এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রপসাল সাবমিট করেন এবং একটি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একটি বিভাগ সরকারি প্রজেক্ট পেয়ে থাকেন। যার প্রপসাল ভাল হবে, সেই প্রজেক্ট পাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে প্রজেক্ট পাওয়ার জন্য এরকম প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার।

অতি-নিম্নমানের বেতন স্কেল ছাড়াও শিক্ষকদেরকে আরও অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যেমনঃ

[১] শিক্ষকরা গবেষণার করার সময় পান না নানাবিধ দাপ্তরিক কাজ এবং অতিরিক্ত ক্লাসের চাপের কারণে। বেশিরভাগ শিক্ষকদেরকে দিনে গড়ে ২-৩ টি ক্লাস নিতে হয়। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য ফাইল এবং দাপ্তরিক কাজ। প্রয়োজনীয় লোকবল এবং শিক্ষকের অভাবেই এহেন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের মতো দেশে মাথা পিছু ছাত্রের বিপরীতে শিক্ষকের সংকট রয়ে গেছে চরম মাত্রায়। তাই সরকারের উচিত হবে এই বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়ার। শিক্ষকদের প্রতিদিনের সময়কে ৫০% ক্লাস এবং ৫০% গবেষণায় বরাদ্দ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

[২] সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করেন না শিক্ষকদের গবেষণা খাতে। ইহাও একটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষকদের গবেষণার প্রতি অনাগ্রহের। উন্নত মানের গবেষণা এবং প্রকাশনার জন্য দরকার আছে যথেষ্ট সংখ্যক PhD স্টুডেন্ট, রিসার্চ স্টুডেন্ট এবং অর্থের। এদিকেও খেয়াল দিতে হবে মাননীয় সরকারকে। 

এবার মূল কথায় ফিরে আসি – বিগত কিছুদিন যাবত বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বেতন পুনঃনির্ধারণ এবং মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে লিপ্ত থেকে আংশিক/পরিপূর্ণ কর্মবিরতিতে আছেন! প্রশ্ন থেকে যায় – উনাদের এই আন্দোলন কি যৌক্তিক নাকি অযৌক্তিক? সার্বিক বিবেচনায় বলব যে শিক্ষকদের বর্তমান আন্দোলন অবশ্যই যৌক্তিক! আমি চাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা এবং আরও উন্নত মানের বেতন কাঠামো দাঁড় করানো হোক; নাহলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগের সাথে তাল মিলাতে না পেরে একদম ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এখানে একটা তবে আছে –

শিক্ষকদেরকে নিয়মিত ক্লাস নিয়ে হবে, ক্লাস নোট আপ-টু-ডেট রাখতে হবে, নিয়মিত ISI পাব্লিকেশান করতে হবে, বই লিখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক র‍্যাঙ্কিং উপরের সারিতে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে, ছাত্রদের দেখভাল করতে হবে, ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক মূল্যায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে, উন্নত মানের গবেষণায় লিপ্ত থাকতে হবে এবং নিজের আত্ম-সম্মান নিয়ে চলতে হবে!

আর সরকারের উচিত হবে – শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো করা, শিক্ষকদের সর্বাধুনিক (cutting edge) ট্রেনিং দিতে, নিয়মিত গবেষণার জন্য ফান্ড দিতে এবং অন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ফান্ড দেয়ার জন্য চাপ দিতে, এবং বর্তমান শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতির নীতিমালাকে পরিবর্তিত করে যুগোপযোগী করতে।

শুধুমাত্র মাসিক বেতন আন্তর্জাতিক মানের করাই সমাধান নয়, বরং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং পিছিয়ে/এগিয়ে যাচ্ছে কিনা উহাও খেয়াল রাখতে হবে। ইহা একটি দ্বিমুখী প্রতিযোগিতার মতো হতে হবে – মাত্র গোটা দশেক আর্টিকেল প্রকাশ করে প্রফেসর হওয়ার দিন শেষ করতে হবে; বরং প্রতিটা ISI পাবলিকেশনের জন্য আলাদা বোনাস রাখতে হবে এবং র‍্যাঙ্কিং-এ আসার জন্য বিশেষ বিশেষ বোনাস থাকতে হবে। আমার লেখায় আমি বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এবং এই সমস্যা সমাধানে কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছি। উদাহরণগুলো সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের জন্য প্রযোজ্য নয়। সরকার এবং শিক্ষক সমাজ উভয়েরই দায়বদ্ধতা রয়েছে একটি আধুনিক এবং যুগোপযোগী শিক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তোলার – শিক্ষক করবেন গবেষণা এবং পাঠদান; এবং সরকার শিক্ষকদের মর্যাদার দেখভাল করবেন! আমি মনে করি, এভাবে পরস্পরের দিকে আঙ্গুল তুলে দোষারোপ করাটা সমাধান নয়; বরং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের দিকে নজর দিলেই সকলের এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের উপকার হবে!