ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

সকাল বেলায় মেজাজটা খারাপ হল সিনথিয়ার ডাকে,অবাকও হলাম এই সকাল নয়টার সময় আমাকে ডাকছে কেন ভেবে । ড্রইং রুমে দেখি একটা লোক বসে আছে, দেখে বোঝা যাচ্ছে গ্রাম থেকে এসেছে । তো আমাকে যেতে হবে তার সাথে তার কোন এক কাজে, বেচারা ঢাকা শহর ভাল চেনে না । বান্ধবীকে নিয়ে দেখা জটিল স্বপ্নটা ভেঙ্গে দেয়ার জন্য প্রথমে একটু রাগ হলেও এখন মায়াই লাগল লোকটার জন্য। যাক নাস্তা করে বেরলাম ভায়ের সাথে আমার বাইকটা নিয়ে।

পথে কথা হল ওনার সাথে, আসগর নাম ভায়ের। উনি যাবেন গুলিস্তানের একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে, ওনার কাছ থেকে মালয়শিয়া পাঠানোর জন্য দু বছর আগে টাকা নিলেও এখনও ওনাকে বিদেশে পাঠায়নি বা টাকাও ফেরত দিচ্ছে না । গ্রাম থেকে বহুবার এসে ঘুরে গেছেন কিন্তু টাকা ফেরত পান নি। বিদেশ যাবার জন্য ফসলের জমি বিক্রি করে একবন্ধুর পরিচিত এই আদম ব্যাপারিকে টাকা দিয়েছিলেন উন্নত জীবনের আশায়, ভাবতে পারেননি এই একটি সিদ্ধান্ত তাদের পুরো পরিবারটিকে ভিক্ষুকে পরিনত করবে। মানুশ তাকে আদম আর কদম বলে গালাগালি করে, বললেন আসগর ভাই। খারাপ লাগল ভাইএর কথাগুলা শুনে।

রাস্তায় থেমে চা আর সিগ্রেট খাচ্ছিলাম । আসগর ভাই বলল তার ভাগ্নিটার চা খাবার খুব শখ, মাত্র দেড় বছরের পিচ্চি একটা। কথা প্রসঙ্গে বলল তার সব থেকে আদরের ছোট বোনটাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে ওর স্বামী, মাত্র কিছু টাকা যৌতুকের জন্য। যৌতুকের জন্য যখন চাপ দিচ্ছিল ওর স্বামী, আসগর ভাই এসে এই ট্রাভেল এজেন্সির মালিক আদম ব্যাপারীটাকে সে কথা বলে অনেক অনুনয় করেছিলেন অন্তত কিছু টাকা দেবার জন্য। লোকটা টাকা তো দেয়ই নি বরং আসগর ভাই কে বলেছে তার বোনকে যদি স্বামী বের করে দেয় তো আদম ব্যাপারীর কাছে নিয়ে আসতে, ও নাকি পালবে আসগর ভাইএর বোনকে। বোকা আসগর ভাই কাঁদছিল এসব কথা বলতে বলতে। আরও বলল কিভাবে তার বাবা বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা গিয়েছে, কিভাবে ঈদের দিনে ছেড়া শাড়ি সেলাই করে পরে ঈদ করে তার মা।

গ্রাম্য সরল লোক পেলে আমি খুব সহজেই তাদের সাথে মিশে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে পারি, অন্য ধরনের কোন জীবনের পটভূমি খুঁজে ফিরি হয়ত। কিন্তু এই আসগর ভাইএর সাথে কথা বলে আমি কোন মজা পেলাম না বরং একটা পুঞ্জিভূত রাগ যেন ফেনিয়ে উঠছিল বুকের ভেতরে । কিছু একটা করতে চাচ্ছিলাম আসগর ভাইএর জন্য, কিন্তু আমি তো কখনো কাউকে একটা চড়ও মারি নাই। এইসব আদম ব্যাপারীদের নাকি পোষা গুন্ডা বাহিনী থাকে শুনেছি, ভাবতেই শিউরে উঠে চুপসে গেলাম । আসগর ভাইএর ওপরও রাগ হল কোন ডকুমেন্ট ছাড়া টাকা দিয়েছে বলে। নিজের প্রতিবাদ জানানোর অক্ষমতাটাও পোড়াচ্ছিল আমাকে।

হঠাৎ মনে হল নটরডেমে পড়াকালীন এক ক্লাসমেট ইমন এর কথা, ব্যাটা খুব ডাকাবুকো ছিল কিন্তু আমাকে ভালবাসত খুব, আমি ওর টাইপের ছিলাম না কিন্তু ওর ভক্ত টাইপের ছিলাম আর ক্যান্টিনে টেবিল টেনিসের সাথে ওর পেটিসের সঙ্গী, বিল সহ বরাবর আমিই ছিলাম । বহু বছর যোগাযোগ নাই যদিও কিন্তু ওর বাসা কলেজের পাশের কলোনিতেই ছিল, আমি যেতাম ওর বাসায় । দেখেছি চট করে রেগে যেত ও আর ধুম ধাম দিয়ে দিত কারও সাথে লেগে গেলে। আমি যদিও মানা করতাম ওকে মারামারি করতে, কিন্তু মনে মনে ওর সাহসএর প্রশংসা না করে পারতাম না। হুন্ডাটা ঘুরিয়ে সোজা ওর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। ব্যাটা ঘুমাচ্ছিল, উঠে এসে হাগ করে ব্যাপক গালাগালি করল এতদিন পরে যোগাযোগ করার জন্য। এর পর খুলে বললাম আসগর ভায়ের সব ঘটনা। ও বলল নো চিন্তা, ডু ফুর্তি, এমন আদম ব্যাপারী বহুত দেখসি। দেখবি কেমন বাবা বাবা বলে টাকা দিয়ে দেয়। টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখলাম একটা পিস্তল কোমরে গুজল, আমাদের বল্ল চল। আমার রক্ত হিম হলেও আজগর ভায়ের সামনে মনভাব প্রকাশ করলাম না। হুন্ডা স্টার্ট দিয়ে সোজা আদম ব্যাপারীর অফিস।

অফিসে ঢুকে দেখি ব্যাটা চর্ব্য চোষ্য সহযোগে ব্রেকফাস্ট করছে ।আসগর ভাইকে দেখেই ধমকে উঠলো, কি মিয়া আপনাকে না বলেছি ছয় মাস পরে আসতে, এখনি এসে হাজির হলেন, ব্যাপার কি। ইমন কোমর থেকে মেশিনটা বের করে আদম ব্যাপারীর থোতনার তলায় চেপে ধরে বলল, ব্যাপার তোরে আমি বুঝাইতেসি চান্দু। আমার নাম ইমন, আসগর ভায়ের থাইকা যা টাকা নিছস, ৫০,০০০ টাকা এক্সট্রা লাগায়া এক্ষন দিবি না গুলি করুম মাদার**দ, বলেই মেশিনটার বাঁট দিয়ে দিল ব্যাপারীর চাঁদিতে এক বাড়ি। বেচারা আদম ব্যাপারী বলল আপনাকে চিনছি ইমন ভাই, ফোন করে দিলেই আসগর ভাইয়ের টাকা দিয়ে দিতাম ভাই।

এর পরের ঘটনা সামান্য। ইমনকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি বাসায় চলে এলাম, আসগর ভাই টাকা নিয়ে বাড়ি চলে গেল। আমি শুধু কয়টা দিন দ্বিধায় কাটালাম, চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে রংবাজিকে পেশা হিসাবে নিব কিনা, মানুষের উপকার তো করা যাবে।