ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

আজকে লণ্ডন প্রবাসী আশরাফ সাহেব, যিনি কিনা আবার বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, বলেছেন জিয়া-এরশাদের প্রজন্ম হলো নষ্ট প্রজন্ম। এর মানে বলতে চাইছেন এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মানে ৮০-৯০ দশকের তরুণ-তরূণীরা নষ্ট প্রজন্ম, শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরাই নাকি সঠিকপ্রজন্ম। এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এখন প্রায়ই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমার্থকে পরিনিত করা হয়েছে। এখন নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতে উজ্জীবিত করতে হবে মানে আগামীতে ভোট আসলে যেন নৌকাতেই সিল মারতে হবে। যুগ যুগ ধরে এইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথামালার ঝুড়িতে উজ্জীবিত হয়ে নৌকাতেই সিল মারতে হবে। আর এর বিরুদ্ধাচারনকে রাজাকারের সমার্থকের মহড়ার নাটক মঞ্চয়ানের জন্য আমাদের নিরপেক্ষতার রোল মডেল বুদ্ধিজীবিরা একের পর এক বিভিন্ন ট্রায়াল দিবেন, আর নতুন প্রজন্মের পণ্যেরা সেই ঢাক-ঢোল নিয়ে বইমেলা, ফাল্গুন মেলা, বৈশাখী মেলাতে বাজাইতে থাকবে, আর নানা রং-এ সাজবেন আমাদের অবলা নারীরা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞাটি এখন সোজা কথায় আওয়ামী লীগের সমালোচনা না করাকে বুঝানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি আর সম্প্রতি জংগীবাদের ধুয়া তুলে আওয়ামী লীগ যুগ যুগ ধরে সামাজ্রবাদ শক্তির সহায়তায় ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের সার্বভৌমত্ব বা স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে কিনা এই নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। দেশে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশকে দলীয় লোকেরা মারধর, শেয়ার বাজারে পরিকল্পিত উপায়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগের টাকা আত্মসাৎ করা ইত্যাদি ইস্যুতে থাকতে হবে নীরব, নতুবা বুঝবেন আপনি নষ্ট প্রজন্মের কীট। আর এখন ব্লগীয় যুগে একশ্রেনীর মুক্ত চিন্তার অধিকারী জ্ঞানী ব্লগাররা একজোট হয়ে সরকারের সমালোচকদেরকে রাজাকার তকমা লাগাইতে দেরী করেন না কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার বিরোধী শক্তির বলে তাদেরকে ব্যানও করা হয়।

জরুরী আইনের অধীনে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ভিত্তিতে অখন্ড পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারনে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের শুরু হয়। অনেক দেশেই স্বাধীনতার সংগ্রামে সশস্ত্র যুদ্ধ হতে দেখা গেছে এবং সেই ক্ষেত্রে সেই দেশের একটি অংশ সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিতে দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য আওয়ামী লীগের কোন প্রস্তুতি ছিল না। বরং মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন বাংগালী সামরিক, আধা-সামারিক, পুলিশ মানে যাদের হাতে সামরিক-অস্ত্র ছিলো তাঁরই মূলতঃ পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের মোকাবেলা বা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না।

কাজেই বাংলাদেশের জনগণ নিজেরাই সরকার গঠন করবে, সরকার আধিপত্যবাদ শক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে দেশের জনগনের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ কররে, একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গড়ে তুলবে – এইটা ছিলো ৭১-এর জনগোষ্ঠির প্রত্যাশা, বংশ পরস্পরায় কোন নেতা বা দলের আনুগত্যের জন্য ৭১-এর জনগোষ্ঠি ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে তুলেনি। ৭১-এর জনগোষ্ঠির যে প্রত্যাশা ছিল, তা হলো গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে বিশ্ববুকে বেচে থাকা, যাতে শহীদদের রক্তের অবমাননা না হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কিছু রাজনৈতিক দল অবস্থান নিয়েছিলো এবং নানা অপকর্ম এবং অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল। এই অংশটিই সেই সময়ে রাজাকার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার যে, রাজাকারদের দুটো অবস্থান, ১টি হল তাদের রাজনৈতিক আদর্শগত অবস্থান আর আরেকটি হলো তাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে এইসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটি উল্লেখ করেছে। পরবর্তীতে আইন মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে এসে এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটি হয়ে গেলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচারের ইস্যু। এতে কি আওয়ামী ভাষাগত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতে ফাটল ধরেছে? না ফাটল ধরে নি। কারন আওয়ামী বুদ্ধিজীবি, সমর্থকেরা থেকেছে নীরব। এই সব আওয়ামী বুদ্ধিজীবিরা যেসব কারনে আগে (বিএনপির ক্ষমতায় থাকলে) সরব ছিলেন এখন সেই একই কারনে উনারা থাকেন নীরব, কারন পাছে না জানি সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। খবরে প্রকাশ ইদানিংকালে হিন্দু দেবদেবীদের প্রচুর মূর্তি হারিয়ে যাচ্ছে অথচ পুলিশ নাকি এর কোন সুরাহা করতে পারছে না। মূর্তি হারিয়ে গেলেও দেবদেবীর পুজারীরা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসাবেই ব্যাপক সমাদৃত এবং সংগত কারনেই এই ভোটব্যাংকের সন্মানিত সদস্যেরা আশরাফের নষ্ট প্রজন্মের অংশ নয়। এই সন্মানিত সদস্যেরা মূলতঃ পরিচিত হন অসাম্প্রদায়িক, বাংগালী সংস্কৃতির ধারক হিসাবে। আর যারাই ইসলাম নামটি মুখে নিয়েছেন তাকে সাম্প্রদায়িক, রাজাকার বা জংগীবাদ নানাভাবে হেয় করা চেতনাধারীদের একটি খেলা, এই খেলায় নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত হবার জন্য আশরাফ সাহেব উদ্দাত্ত আহবান জানিয়েছেন।

একদা আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট তালেবানেরা আজকের আমেরিকার চোখে জংগী, আর জংগীবাদের ধোয়া তুলে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট বিভিন্ন দেশে আমেরিকা তাদের লোকদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে নিজদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। সম্প্রতি মিশরের নারী-পুরুষেরা যে গনতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে তা বিশ্ব ইতিহাসের এক অন্যন্য ঘটনা। এই বিপ্লবে মুসলিম নারীদেরকেও দেখা গেছে, কিন্তু পশ্চিমা-ইউরোপ শক্তিগুলো নারী সম্পর্কিত বিষয়ে মুসলিম সমাজকে বিশ্রীভাবে তুলে ধরে। মিশরের জনগোষ্ঠির এই গনঅভ্যুত্থানে বিশ্বরাজনীতির মেরুকরন হোক এটাই সকলের প্রত্যাশা।

আর আমাদের বর্তমান জনগোষ্ঠির প্রত্যাশাঃ

১, বাক-স্বাধীনতার অধিকার
২, বহুমত, বহুদলের গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা
৩, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গনতন্ত্রের চর্চা এবং এদের অর্থায়নে স্বচ্ছতা
৪, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে প্রচুর অর্থায়ন
৫, বেকারত্ব দুরীকরনের স্বার্থে কোটামুক্ত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কর্ম সংস্থান বৃদ্ধি
৬, সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার (নারীদের বরাদ্দকৃত সুবিধা তুলে নেওয়া)
৭, সড়ক-নৌ দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সচেতনা বৃদ্ধি
৮, পুজিবাদী অর্থনীতি থেকে বের হয়ে সামাজিক অর্থনীতির নীতিগত দর্শন খুজে বের করা
৯, শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করা
১০, সকলেই আমরা মানুষ, এই মানবিক বোধের দৃষ্টিভংগী গড়ে তোলার দর্শন গড়ে তোলার শিক্ষা নীতি, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি সৃষ্টি করা

——————————-
‘আহা আজি এ বসন্তে,
এত ফুল ফোটে এত বাঁশি বাজে,
এত পাখি গায়… সবাইকে ফাল্গুনের শুভেচ্ছা

১ ফাল্গুন ১৪১৭
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ইং