ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নয় বছরের শাসনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পূর্বে ঢাকা শহরের কয়েকটি রাস্তার পাশে দেয়াল জুড়ে ‘চিকা’ মারার কথা এখনো মনে আছে। এক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দেয়াল লিখন ছিল অনেকটা এরকম “অমুক নেতার আশ্বাসবাণী, সবার জন্যে কাচ্চি বিরিয়ানি”। এরপর দু’যুগেরও বেশী সময় পার হয়ে গেছে। বড় দু’টি রাজনৈতিক দল পালাবদল করে বারবার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সকলের জন্যে কাচ্চি বিরিয়ানির ব্যবস্থা হয়নি। এমনকি কি সকলের জন্যে নিশ্চিৎ রুটি, রুজি, চিকিৎসাহ্ বা বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়নি তথাকথিত গণতন্ত্রের অভিযাত্রায়। জনগণের গণতন্ত্র কখনোই কায়েম না হলেও ‘নিজস্ব ফরমায়েশি গণতন্ত্র’ কার্যকর হয়েছে যা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীদের সকল সুখের ব্যবস্থা হলেও জনগণের কার্যত পরিবর্তণ আশানুরূপ নয়।

চারবছর আগে ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহনের বাংলাদেশ সফরের সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতারও আসার কথা ছিল। দু’টি অমিমাংশিত বিষয়

যাহোক, যে প্রসঙ্গে ছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে একুশে’র অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন।

বিমানবন্দরে নেমে প্রথম কথাতেই ‘জয়বাংলা’ বলে চিড়া ভিজাতে চেয়েছেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে ‘বৈঠকি বাংলা’য় দু’ দেশের সংস্কৃতি কর্মি, শিক্ষাবিদদের সাথে অত্যাবশ্যক প্রসঙ্গ তিস্তার পানি আলোচনায় আসে। মমতা তাঁর বাকপটুতায় ‘আস্থা’ রাখার কথা বলেন। তিনি গত চার বছরের নিরাশা ঘুচিয়ে নতুন দিনের লক্ষ্যে ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করতে চান। তিনি অবশ্য স্থল সীমানা মিমাংসা করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ১৯৭৪ সালে দু’দেশের মধ্যেকার চুক্তি (মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নামে পরিচিত) অনুযায়ি আমরা সেসময় বেড়ুবাড়ি ভারতকে হস্তান্তর করছিলাম। কিন্তু ভারত ৪০ বছর পার করেও স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত করেনি। চার বছর পূর্বে মনমোহনের সফরের সময় বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাধে সে চুক্তি বাস্তবায়নের একটি সমযোতা হয়েছিল যা মমতা ও বিজেপির ভোটের রাজনীতির কারণে আটকে যায়। যার বাস্তবায়ন আরো চার বছর আগে হওয়ার কথা ছিল তা এখনো হয়নি। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অবশ্য বিভিন্ন সময় বাংলাদেশকে আশ্বস্থ করার চেষ্টা করেছেন তা বাস্তবায়িত হবে বলে।

কিন্তু, মমতার চার বছর পূর্বের কর্মকান্ড আমরা ভূলি করে? ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহনের সাথে ঢাকা এসে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি করার কথা দিয়েও মমতা আসেননি যা আমাদের ন্যায্য অধিকারকে ভূলুন্ঠিত করেছে।

ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান ও মমতার সারদা কেলেঙ্কারির কারণে বোধ করি মমতার দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই। এর বাইরে আবার তৃণমূল কংগ্রেসের এক এমপি ভোটের রাজনীতির কারণে জামায়াতের সাথে আর্থিক সম্পর্ক স্থাপন করে যা মমতাকে আরো বেকায়দায় ফেলে দেয়। তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের জঙ্গীরা পশ্চিমবঙ্গের ভূখন্ডে বোমা তৈরী করছে যার দায় মমতা কখনোই এড়াতে পারেন না।

গত ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তা দিয়ে আমরা আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার কিউসিক পানি পেতাম যা দিয়ে ১ লক্ষ ১৫ হাজার একর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছিল। ২০১৪ সাল থেকে পানির পরিমান অর্ধেকে নেমে আসে এবং এ বছর তা প্রায় শুন্যের কোঠায়। চাষাবাদের জমির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫ হাজার একর এবং তা পরে কমিয়ে আনা হয় মাত্র ১৫ হাজার একর জমিতে। যে যন্ত্রের মাধ্যমে পানির পরিমান মাপা হয় পানি সে যন্ত্রের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এ শুকনো মৌসুমে।

জাতিসঙ্ঘ ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিকভাবে প্রবাহিত নদী নিয়ে একটি আইন পাশ করেছে যার নির্যাসটুকু হলো, উজানে বাঁধ দিয়ে পানি নিজেদের প্রয়োজনে ধরে রাখার অধিকার পেলেও কোন ভাবেই অন্যত্র সরিয়ে বা অন্য নদীতে প্রবাহিত করাতে পারবে না। এটা করা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সামিল যা পশ্চিম বঙ্গের মমতা করছে।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শালিশীর মাধ্যমে মায়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করে সাগর বিজয় করছে। আমাদের তিস্তার পানি আমরা অধিকারের বলে পেতে চাই। মমতার আশ্বাসবাণী শুনতে চাই না। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে।

এম এস আলম, লন্ডন

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫