ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদার দাস মোদির দু’দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ হলো। “পূর্বদর্শণ” নীতি ও প্রতিবেশিদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীন সফর শেষ করে বাংলাদেশ সফর করেন।

বাংলাদেশে ‘খালি হাতে’ যাবেন না বিধায় সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী দেশটি সফর করতে সময় নেন নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় একবছর। মোদি তাঁর প্রায় সবগুলো সফরে নাকি অনেক চমউক দেখিয়েছেন। বাংলাদেশও কিছু একটা চমকের আশা করছিল। আসলে চমকের কথা উভয়দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে বলা না হলেও মিডিয়াতেই ছিল এ নিয়ে মাতামাতি।

মোদি বাংলাদেশে একেবারে খালি হাতে আসেন নি। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের হাসিনা-মনমোহন স্থল সীমান্ত প্রটোকল চুক্তি ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় সর্বসম্মতিতে অনুমোদন করিয়ে এসেছেন। দীর্ঘ ৪১ বছর পর ভারতের এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। যদিও এই বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস ভারতের সাবেক সরকারের সময় প্রবল বিরোধিতা করে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ১০ হাজার একর বেশী জমি পাবে বিধায়। অথচ, তাদের মাথায় একবারও মনে হয়নি যে বাংলাদেশ এ অতিরিক্ত জমির জন্যে এ চুক্তি করে নি, করেছে কয়েক লক্ষ মানুষকে অমানবিক জীবন, পরিচয়হীনতা থেকে মুক্তি দিতে। এ মানুষদেরকে দিতে চেয়েছে মুক্তি। অথচ, বাংলাদেশকে অতিরিক্ত জমি দেয়া যাবে বিধায় ৪১ বছর আটকে রাখল এ সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ স্থল সীমান্ত চুক্তি বাংলাদেশের কাছে ভারতের নিকট থেকে অতিরিক্ত কিছু জমি পাওয়াটা মুখ্য ছিল না, ছিল মানবতা, ছিল ছিটবাসির মুক্তি। আর ভারতের কাছে এটা ছিল বাংলাদেশের কাছে ভারতের জমি হারানো।

মোদি অনেক কষ্টে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে রাজি করিয়েছেন তাঁর সফরসঙ্গী হওয়ার জন্যে। মমতা রাজি হয়েছেন তিস্তা নিয়ে কথা না বলার শর্তে। ভারতের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কোন ইস্যু নিয়ে মোদির সাথে মমতার ৩৪ মিনিটের বৈঠকে কথা হয়নি, হয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে। মমতাকে মনমোহন সিং আনতে পারেন নি, মোদি পেরেছেন। এটাই কি মোদির দেয়া চমক? এ চমক তো আমরা চাইনি।

মোদির সফরে বাংলাদেশের সাথে প্রায় ২২টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমজোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। এগুলোর মধ্যে বানিজ্য চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবহারের চুক্তি, চট্টগ্রাম ও মঙলা বন্দর ব্যবহার, চার দেশের মধ্যেকার সড়ক পরিবহন প্রটোকল চুক্তি, ২০০ কোটি টাকার ক্রেডিট লাইন চুক্তি স্বাক্ষর ও সীমান্ত চুক্তির অনুমোদনের অনুপত্র হস্তান্তর।

বাংলাদেশের জন্যে জীবনমরন সমস্যা পানি নিয়ে চুক্তি হয়নি, তবে বরাবরের মতো আশ্বাস পাওয়া গেছে। তিস্তা বা অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে যথারীতি ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

১২৫ কোটি মানুষের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন পেশাদার রাজনীতিক। তিনি বাকপটুতা আর মাথায় হাত বুলিয়ে বাংলাদেশ থেকে তাদের প্রয়োজনের সবকিছুই আদায় করে নিলেন, দিলেন না কিছুই না।

২০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন যা দিয়ে সড়ক ও রেলপথ সংস্কারের জন্যে ব্যয় করতে হবে যাতে ভারতের ট্রান্সশিপমেন্টে কোন ব্যাঘাত না ঘটে।

বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যে ভিসা ব্যবস্থা সহজিকরণ করা হয়নি। যদি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, পাখি, বাতাস ও পানি প্রবাহের জন্যে কোন প্রকার ভিসার প্রয়োজন হয়না।

বাংলাদেশে যে ভারতীয়রা চাকুরি ও ব্যবসা করছেন তারা বৈধপথে ২ বিলিয়ন ডলার ও হুন্ডি করে এর দ্বিগুণ রেমিট্যান্স ভারতে পাঠানো হচ্ছে। আমরা জানি না, কি পরিমান ভারতীয় এদেশে চাকুরি করছেন। বাংলাদেশিরা কি ভারতে চাকুরি করছে? করলেও কতজন করছেন বা তারা কত টাকার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন আমরা জানি না।

মোদি ভারতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাদেশের মহাজোট সরকার কিছুটা অস্বস্থিতে ছিল ভারতের সমর্থণ নিয়ে। কিন্তু ভারত তাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে যথারীতি সমর্থণ দিয়ে যায়। আওয়ামি লীগের অস্বস্থি দুর হয়। এ অস্বস্থি পুরোপুরি দুর করার লক্ষ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সর্ব্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। আর এতে করেই ভারত তাদের সমস্ত চাওয়া খুব সহজেই আদায় করে নেয়।

কথা হচ্ছিল মোদির চমক নিয়ে। তিনি বাংলাদেশে আসার পূর্বে খুব ভাল মতো স্টাডি করে এসেছেন। ক্রিকেট, প্রমীলা ক্রিকেটার সালমা, এভারেস্ট জয়ী বাংলাদেশের দু’নারী, কিছু বাংলা বাক্য ভাল করেই রপ্ত করে এসেছেন।

এর পরও মোদি তাঁর সফরে বাংলাদেশের মন জয় করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মহান নেতা জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন ও বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলার কথা বলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমিত্বকে সম্মান করেছেন।

এম এস আলম
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
৭ জুন, ২০১৫