ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সরকারবিরোধী দলসমূহ, কিছু প্রিন্ট মিডিয়া, টেলিমিডিয়ায় টকশোজীবি থেকে শুরু করে সর্বত্রই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক সফর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্জন বা বিসর্জন, ভারত কতটুকু লাভবান হলো, আমাদের কুটনৈতিক পরিপক্কতা, ট্রানজিট বা ভূটান-নেপালসহ চারদেশের মধ্যেকার ট্রানজিট, বানিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সর্বপোরি একসাথে এগিয়ে চলার অঙ্গীকার নিয়ে যে যৌথ ঘোষণা, সেগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। দেশের প্রধানমন্ত্রীর অন্যদেশ সফর বা অন্য কোন দেশ বিশেষ করে শক্তিধর দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের বাংলাদেশ সফর নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। এটা দোষের কিছু নয়।

বর্তমান বিশ্বে কোন দেশই একা চলতে পারে না। সাম্প্রতিক কালে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ উত্তর কোরিয়া। গণতন্ত্রহীনতা, দারিদ্রতা, নিঃসঙ্গতা, বন্ধুহীনতা ও অর্থনৈতিক অসহযোগিতার কারণে উত্তর কোরিয়া বড় কষ্টে আছে। বাংলাদেশের সে রকম কোন অবস্থানের বালাই নেই। চারিদিকেই আমাদের অনেক বন্ধুপ্রতিম দেশ রয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহযোগিতা, দেশের ভৌত-অবকাঠামো নির্মানে বিভিন্ন দাতা সংস্থা অর্থকরির পাশাপাশি কারিগরি পরামর্শ করছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নের সূচকে রয়েছে উন্নতির লক্ষণ যা জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাসমূহের বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে আসছে। নারীশিক্ষা, শিশু মৃত্যূর হার কমে আসা ইত্যাদি সূচকে ভারতকে অনেক আগেই পেছনে ফেলেছি, পাকিস্থানকে ধর্তব্যেই আনছি না।

আমাদের অনেক অনেক অগ্রগতির মাঝেও গণতন্ত্র নিয়ে সবসময় একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। নির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ, নির্বাচন কাঠামোর হতদরিদ্র অবস্থা, সংসদে বিরোধীদলের অনুপস্থিতি, সংসদকে পাশ কাটিয়ে দেশ পরিচালনা করা বা রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে ভিন্নমতের সহাবন্থান সহ্য না করা আমাদের রয়েছে যথেষ্ট দুর্নাম। সরকার কখনোই বিরোধী দলগুলোকে সহ্য করতে পারছে না, বিরোধী দল কর্তৃক সরকারকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া, সবকিছুকেই রাজনীতিকরণ জন্ম থেকেই দেখে আসছি। রাজনৈতিক হত্যাকান্ড নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ নিত্তনৈমিত্ত্বিক ব্যাপার। সরকারকে ঘায়েল করা বা বিরোধী দলকে নির্মূল করাই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। সরকারের নিকট রয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচি দমনের হাতিয়ার বা প্রশাসন। বিরোধীদলগুলো রাজনৈতিক কর্মসূচীতে সাফল্য পায় না বিধায় হয়ে উঠে ধংসাত্মক। মামলা হয় নেতাদের নামে, বিভিন্ন মামলার অভিযোগে কর্মিদের পাঠানো হয় জেলহাজতে। রাজপথ হয়ে পড়ে বিরোধীদলহীন। এমতাবস্থায়, বিরোধীরা বিদেশী কূটনীতিক, জাতিসংঘের কাছে আশ্রয় খোঁজ করে। অথচ, এ বিরোধীরা যখন ক্ষমতায় ছিল, একইভাবে করেছে বিরোধী দমন, নিপিড়ন।

বিএনপি এবার অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আগের পাপ মোচনের লক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেখা করতে সামর্থ্য হয়। ২০১২ সালে শিবিরের হরতালের অজুহাতে বিএনপি নেতা বেগম খালেদা জিয়া ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সাথে দেখা করেন নি। রাজনৈতিক অপরিপক্কতা দেখিয়ে জামায়াত-শিবিরকে খুশি করতে চেয়েছেন। রাজনৈতিক দৈন্যতায় শিবিরের হরতালকে গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। তাঁদের কাছে ভারতের মতো শক্তিশালি একটি দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতি হয়েছেন অবজ্ঞার পাত্র। পুরো ভারত ক্ষেপে যায়। ভারতের রাজনীতি তো আর দলকেন্দ্রিক নয় যে কংগ্রেসের মনোনীত রাষ্ট্রপতিকে বিএনপি অবজ্ঞা করবে আর ভারতের বিরোধীদল বিজেপি খুশিতে বাকবাকুম করবে। বিএনপি’র দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসসহ পুরো ভারতবাসি। এছাড়া, বিএনপি’র ভারতবিরোধী অবস্থান ও তৎপড়তার কথা যদিও বিএনপি এখন স্বীকারই করছে না। তারা এখন আগের সেই ভূল থেকে বেড়িয়ে আসতে চায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে বিশ মিনিটের একটি স্লট বরাদ্দ পায় ভারতীয় পক্ষ থেকে।

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল মোদির সফরের দ্বিতীয় দিনে হোটেল সোনারগাঁও-এ সাক্ষাৎ করেন। হাতে ছিল দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত একটি তালিকা। বৈঠক শেষে প্রেসব্রিফিং এ বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে ‘গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি’র কথা মোদি বলা হয়েছে এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ভারতকে গঠনমূলক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করেছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি কি বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র’ ফিরিয়ে আনতে পারবে? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ভারত কতটুকু কি করতে পারে? ভারতের অনুরোধই বা বর্তমান সরকার কেন মেনে নেবে? গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা কি শুধু ভারতের উপর বা বিদেশী কূটনৈতিকদের, বা যুক্তরাষ্ট্র সরকার, বা পশ্চিমা দেশসমুহের তৎপরতার নির্ভর করে? জাতিসংঘই বা কতটুকু করতে পারে? লক্ষ্য করুন, গত বিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে শক্তিধর দেশসমূহের হুমকি, ধামকি কোন কিছুই মায়ানমারকে টলাতে পারেনি। বছরের পর বছর তথাকথিত শান্তিবাদি নেত্রী অং সং সুচিকে বন্দি করে রেখেছিল। কেউই মায়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে পারেনি। সে তুলনায় বাংলাদেশে এগিয়েই আছে।

দেশে গণতন্ত্র আসা মানে কি নিজেদের ক্ষমতায় দেখা? আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলসগুলোর কাছে গণতন্ত্র হলো নিজেকে ও নিজদলকে ক্ষমতায় দেখা। নিজেদের দল ক্ষমতায় নেই তো দেশে কোন গণতন্ত্র নেই। মানবাধিকার হরণ হওয়া, দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে যাওয়া (নিজেরা ক্ষমতায় থাকাকালিন কোন দুর্নীতি হয়নি), স্বজনপ্রীতিতে দেশ শেষ হয়ে যায়। এজন্যেই দেশে গণতন্ত্র আনতে হবে। মানে নিজেদেরকে ক্ষমতায় আনা। নির্বাচনে হেরে যাওয়া মানে কারচুপি ও কয়েকদিন পর গণতন্ত্রের হাওয়া হয়ে যাওয়া। গণতন্ত্রের অদ্ভুত সব ডেফিনেশন।

দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাদেরই বা কি ভূমিকা ছিল যখন তাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন। গণতান্ত্রিক যাত্রার শুরু থেকেই আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোই ভঙ্গুর। স্থানীয় সরকারেরর দুর্বল ব্যাবস্থা, স্বনিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কাঠামো নেই, গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি (গণতন্ত্র মানেই নিজের জয়, অন্যের পরাজয়), স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচারবিভাগ ও প্রশাসন, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতার পরিবর্তন না হলে দেশে গণতন্ত্র কিভাবে আসবে। এটা তো কোন নামফলক নয় যে ফ্রেমে বসিয়ে দেয়া হবে। মোদি কি করে এখানে গণতন্ত্র এনে দেবে?

তবে মোদি বিএনপি নেতাকে বলেছেন, ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চায়, তবে সন্ত্রাস ও মৌলবাদিদের উত্থান দেখতে চায় না। এখানে উল্লেখ্য, মোদি নিজে একজন হিন্দু মৌলবাদির প্রবক্তা।

এম এস আলম
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।
১০ জুন ২০১৫