ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

ঢাকা, মে ১৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- গ্রামীণ ব্যাংকে চেয়ারম্যান নিয়োগের দায়িত্ব ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের হাতে দেওয়ার ‘অনুরোধ’ জানিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকে সংযুক্ত রাখার সরকারি প্রস্তাবের কথা প্রকাশের পরদিন শনিবার এ ‘অনুরোধ’ জানালেন ইউনূস।

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে থেকে বৃহস্পতিবার ‘ইস্তফা ঘোষণা’ করেন তিনি। ওই পদ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইউনূসকে অব্যাহতি আদেশ দেওয়ার দুই মাস ১১ দিন পর ওই ‘ঘোষণা’ দেন তিনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একজন সম্মানিত সদস্য (এমিরিটাস) হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকে সম্পৃক্ত রাখার প্রস্তাব করা হবে বলে শুক্রবার জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তবে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মচারীদের দাবি অনুযায়ী ইউনূসকে যে চেয়ারম্যান করা হচ্ছে না, সেটি আবারও উল্লেখ করেন তিনি।

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ থেকে অবসর নিয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেতে অর্থমন্ত্রীকে গত বছর প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারি পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণে গেলে এতে ‘রাজনীতি ঢুকে পড়বে’ বলেও শনিবার মন্তব্য করেন মুহাম্মদ ইউনূস।

গ্রামীণ ব্যাংককে তারা [গ্রামীণ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা] সবসময় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে- এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, গ্রামীণ ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে সেভাবেই চলা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিদায় নেওয়ার সময় শনিবার সহকর্মীদের
উদ্দেশ্যে দেওয়া চিঠিতে ইউনূস এসব কথা বলেছেন। ব্যাংকটির মহাব্যবস্থাপক (তথ্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়) জান্নাত-ই-কাওনাইনের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ইউনূসের এ বক্তব্য জানানো হয়েছে।

অনুমতি না নিয়ে পদে থাকার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২ মার্চ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে নোবেলজয়ী ইউনূসকে অব্যাহতি দেয়। এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়েও হারতে হয় তাকে।

গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ‘ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রচার হয়। এতে গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিল গ্রামীণ কল্যাণ নামে সহযোগী একটি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের অভিযোগ ওঠে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে।

ওই প্রামাণ্যচিত্রের ভিত্তিতে বাংলাদেশে প্রথম সংবাদ প্রকাশ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। পরবর্তীতে বিষয়টি দেশ বিদেশের গণমাধ্যমসহ সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে আশ্বাস দেন। এরপরই গ্রামীণ ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম তদন্তে সরকার একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে।

রকারি মালিকানা নিয়ে কমিটি যা বলেছিল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. একে মনোয়ার উদ্দিন আহমদকে প্রধান করে গত জানুয়ারি মাসে গ্রামীন ব্যাংকের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- মহসীন রশীদ, আর এম দেবনাথ, মো. নজরুল হুদা বেগম রোকেয়া দীন।

কমিটি গত ২৫ এপ্রিল সরকারকে প্রতিবেদন হয়। এতে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারি মালিকানার অংশ পূর্বাবস্থায় ফেরানো এবং ব্যাংকটিকে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির অধীনে আনার সুপারিশ করা হয়।

কমিটি বলেছে, এটি একটি সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ। এটি কোনো বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) নয় কিংবা প্রচলিত অর্থে কোনো ব্যাংক বা ব্যাংক-কোম্পানী বা তফসিলী ব্যাংকও নয়।

“এর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এনজিও এর কার্যক্রমের সঙ্গে মিল থাকলেও আইন অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানে সরকারের ২৫% মালিকানা রয়েছে। কিন্তু, সরকার এ সুযোগ না নিয়ে নিজেকে প্রান্তিক অবস্থানে (৩.২৯%) নিয়ে গেছে। সরকারকে অবশ্যই এটি ঠিক করতে হবে।”

কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাবে শঙ্কা ইউনূসের

বিদায়ী চিঠিতে [গ্রামীণ ব্যাংকের] সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান ইউনূস।

এরপর পর্যালোচনা কমিটির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “রিভিয়্যু কমিটির প্রতিবেদন সম্বন্ধে এখানে বিস্তারিত আলাপ করবো না। শুধু একটি বিষয় তোমাদের সামনে আনতে চাই।

“এই প্রতিবেদনে গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে আমি শঙ্কিত হয়েছি।”

‘গরীব মহিলার মালিকানায় গরীব মহিলার ব্যাংককে’ অন্য কোনো রূপে রূপান্তরিত করার কোনো চেষ্টা হবে না বলে আশা প্রকাশ করে ইউনূস বলেন, “এটা যদি করা হয় এটা একটা ভুল কাজ হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের অমঙ্গল হবে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারী পরিচালনায় বা নিয়ন্ত্রণে এই ব্যাংককে নিয়ে গেলে এর মধ্যে রাজনীতি ঢুকে পড়বে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য, বিশেষ করে গরীবের মালিকানার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা হবে মস্ত বড় দুঃসংবাদ।

“আমরা বরাবর গ্রামীণ ব্যাংককে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে এসেছি। গ্রামীণ ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে সেভাবেই চলা নিশ্চিত করতে হবে” উল্লেখ করে ইউনূস বলেন, “আমি দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি গ্রামীণ ব্যাংককে রাজনীতি থেকে দূরে রাখুন, বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ বোর্ডের হাতে ছেড়ে দিন (বর্তমানে সরকার কর্তৃক চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়)।”

গ্রামীন ব্যাংকের মালিকানার ৯৬.৫ শতাংশ বর্তমানে গরীব মহিলার হাতে- এ তথ্য উল্লেখ করে ইউনূস দাবি করেন, “আইন সংশোধন করে এই মালিকানা স্থায়ী করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় এবং নিয়ন্ত্রণে তাদের নিরঙ্কুশ অধিকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এর কোন ব্যত্যয় হলে গ্রামীণ ব্যাংক আর গ্রামীণ ব্যাংক থাকবে না- এটা হাজারটা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হারিয়ে যাবে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/পিডি/১৮৪১ ঘ.