ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

ঢাকা, মে ৩১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে আদালতের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার আর সুযোগ নেই।

সংবিধান সংশোধন কমিটির সঙ্গে বৈঠকের একদিন পর মঙ্গলবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলন তিনি এ কথা বলেন। গণভবনে বিকাল সোয়া ৪টায় শুরু হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা চলে এই সংবাদ সম্মেলন।

লিখিত বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কোনো সুযোগ সাংবিধানিকভাবে কারো নেই। অষ্টম সংশোধনী বাতিলের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। সংসদে আইন পাশ করেও সেই সংশোধনী টেকেনি। এ অবস্থায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি রাখার কোনো সুযোগ নেই।”

এর আগে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সংবিধান সংশোধনে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির দুই সদস্য সাংবাদিকদের জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার বিষয়ে কোনো সুপারিশ তারা করছেন না।

অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলে আসছে, আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে না হলে তারা তাতে অংশ নেবে না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে নিজেদের অধীনে নির্বাচন দিয়ে পরের মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করতে চায় বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।

এ ধরনের অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমার ঘাড়ে চাপানোর দূরভিসন্ধি কাদের? তারা কি কোর্টের রায় পড়েননি। আদালতের রায় মানতে হবে। আদালতের রায় মানতে আমরা বাধ্য।”

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা না থাকলে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে রাষ্ট্র কীভাবে চলবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ওয়েস্ট মিনিস্টার টাইপ অব ডেমোক্রেসিতে যেভাবে হয়, সেভাবেই হবে। নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। সরকার তো নির্বাচন করবে না।”

যুক্তরাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রের মডেলই ওয়েস্টমিনিস্টার সরকার ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট ভবন ওয়েস্টমিনিস্টর প্যালেসের নাম অনুসারে এই নামকরণ। এ ব্যবস্থায় অর্ন্তবর্তীকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেশ পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।

‘নো বলিনি’

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের দাবিতেই ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়। এরপর প্রতিটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে এ ব্যবস্থাতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। গত ১০ মে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তবে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে আগামী দুটি নির্বাচন এ ব্যবস্থায় করা যেতে পারে বলে মত দেয় আদালত।

এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমি ‘নো’ বলিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কী ‘লুপ হোল’ আছে, তা ঠিক করারই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কোর্ট না করেছে।”

প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেমন হবে সে বিষয়ে তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটিকে জানিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে তার পরে।

আগামী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা নিয়ে আদালতের পর্যবক্ষেণের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ করে রায় ঘোষণা করেছে এবং একটা পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। একটা ম্যান্ডেটরি, আর একটা ম্যান্ডেটরি নয়। আর আদালত এও বলেছে- জুডিশিয়ারিকে এর সঙ্গে জড়ানো যাবে না।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না করলে সহিংসতা দেখা দিতে পারে- এমন আশঙ্কার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে সংঘাত হয়নি?”

সংবিধান সংশোধনের জন্য গত বছরের ২১ জুলাই সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটির সদস্যরা নিজেরা পর্যালোচনা করার পর এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল. সাবেক প্রধান বিচারপতি, আইনজ্ঞ, বিশিষ্টজন ও সম্পাদকদের মতামত নেয়। এ সময় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ভবিষ্যত নিয়েও আলোচনা হয়।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা গত ২৭ এপ্রিল বিশেষ কমিটির ওই বৈঠকে অংশ নিয়ে দলের মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকের পর গণভবনে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে তিন মাসের মধ্যেই নির্বাচন করতে হবে। এর মধ্যে নির্বাচন করতে না পারলে পূর্ববর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে।

নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গ

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার দৃঢ় আশা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা চাই- নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে। কমিশনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না।”

সরকার ইলেকট্রনিক ভোটিং পদ্ধতি চায় জানিয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, “ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ে তাদের (বিএনপি) আপত্তি কেনো? তারা খায়রুল হকের অধীনেও নির্বাচনে যাবেন না। কার অধীনে নির্বাচনে যাবেন? উনি (খালেদা জিয়া) বলেছিলেন, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। উনাকে জিজ্ঞেস করেন- উনি কোন পাগলের অধীনে নির্বাচন চান।”

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের গত সরকারের সময় যে নির্বাচন কমিশন করেছিলাম, তখন তো নির্বাচন কমিশন নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। সবার মতামতের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেওয়া হবে।”

বর্তমান সরকারের সময়ে উপ-নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “সরকার কোনো নির্বাচনেই প্রভাব বিস্তার করেনি। আমরা প্রমাণ করেছি, সরকার যদি আন্তরিক হয়, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, তাহলে দলীয় সরকারের আমলেও অবাধ, সুষ্ঠূ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।”

‘বিচিত্র অভিজ্ঞতা’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা বিচিত্র।”

এ প্রসঙ্গে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তখনকার সেনা প্রধানের ‘ক্যু’, বিচারপতি লতিফুর রহমান শপথ নেওয়ার পরপরই ১৩ জন সচিবের চাকরিচ্যুতি এবং শেষবার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়া এবং পরবর্তীতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়গুলো উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।

তিনি বলেন, “আমরা বারবার তেলেসমাতি দেখেছি। আমরা আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন চাই না, যেখানে এক কোটি ৩০ লাখ ভুয়া ভোটার ছিলো। এই রকম তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমরা চাই না।”

‘খালেদা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন’

বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বিদেশ সফরে গিয়ে ‘অসত্য’ তথ্য তুলে ধরে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেস- এমন অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, “আড়াই বছর পর বিরোধীদলীয় নেতার মনে হয়েছে ২০০৮ সালে নির্বাচন সঠিক হয়নি। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন, “আমরা স্পষ্টভাবে জানতে চাই- কী ভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হলো? দেশবাসীকে তা জানাতে হবে।”

বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, “তারা কোন মধ্যবর্তী নির্বাচন চান- তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেনি। উনি (খালেদা জিয়া) কী নিজেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত? উনারা কী এজেন্ডা দেবেন? উনারা যে নির্বাচনে জিতবেন- তার গ্যারান্টি কি ?”

‘নির্বাচনে জিতে আসুন’

সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি একটা কথা বলে নিতে চাই। অনেকের রাজনীতি করার মতো মানসিকতা নেই। কিন্তু, ক্ষমতায় যাওয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা আছে।”

ডান হাতের তালু কিছুটা তুলে ধরে হাসিনা বলেন, “গণতান্ত্রিক অবস্থায় তাদের মূল্য নেই।”

হাতের তালু আরেকটু তুলে ধরে তিনি বলেন, “অগণতান্ত্রিক অবস্থায় তাদের মূল্য বেড়ে যায়। এ জন্য, গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি তাদের অন্তর্জালা বেশি।”

এই শ্রেণীর মানুষ মুখে গণতান্ত্রিক, আর কাজে অগণতান্ত্রিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনা পরামর্শ দেন, “তাদের বলবো- এলাকায় যান। নির্বাচনে জিতে তারপর ক্ষমতায় আসুন।”

চতুর্থ সংবাদ সম্মেলন

দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নিয়ে মোট চারটি সংবাদ সম্মেলন করলেন হাসিনা। অন্য দুটি সংবাদ সম্মেলন তিনি করেন ২০১০ সালে ভারত সফর থেকে ফিরে ১৬ জানুয়ারি এবং ওই বছরের শেষ দিকে রাশিয়া থেকে ফিরে ৫ ডিসেম্বর।

শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক তুরস্ক ও ফ্রান্স সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলন ডাকা হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক।

অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শিরিন শারমিন চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসইউএম/জেকে/২১৪৮ ঘ.