ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

ঢাকা, জুন ১০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরবিদায় নিলেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া।

সর্বস্তরের জনসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শুক্রবার সকালে শিল্পীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়।

বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সর্বস্তরের মানুষ শিল্পীকে শেষ বিদায় জানান।

সকাল থেকেই কিবরিয়ার ছাত্র, সহকর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতারা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত এ বিদায় অনুষ্ঠানে ভিড় করতে থাকেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ স ম আরেফিন সিদ্দিকী, জাপানের রাষ্ট্রদূত তামোসু সিনোসুকা, সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, কিবরিয়ার ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে আসেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার বিশেষ সহকারী আব্দুস সোবহান গোলাপ ও এপিএস সাইফুজ্জামান শিখর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ প্রয়াত এই শিল্পীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়।

মোহাম্মদ কিবরিয়া নিভৃতচারী এবং প্রচারবিমুখ ছিলেন উল্লেখ করে শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, “উনি ১৯৫১ সালে ঢাকা আর্ট কলেজে যোগদান করার পরপরই আমাদের পরিচয়। একসঙ্গে অনেক ছবি এঁকেছি আমরা। উনি শিল্পকে নিজের জীবনে ধারণ করেছিলেন কিন্তু আমাদের শিল্প আমাদের জীবনে ছিলো না।”

তিনি জানান, প্রথম জীবনে কিবরিয়ার ছবি ‘রিয়েলেস্টিক’ হলেও জাপান থেকে ফিরে এসে তিনি ‘বিমূর্ত’ চিত্রকলার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

“এরপর কিবরিয়ার ছবি বাংলাদেশের চিত্রকলায় এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়। এই সূত্রেই ‘কিবরিয়া স্কুল’ বলে চিত্রকলায় একটা ফর্ম তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক স্বনামধন্য শিল্পীর জীবনে এই ঘটনা বিরল।”

শিল্পী হাশেম খান বলেন, “উনি নিভৃতচারী ছিলেন সত্য, কিন্তু মানুষ গড়েছেন। তার বিমূর্ত শিল্প বুঝে ওঠা আমাদের মতো শিল্পীদের জন্য, শিল্প বোদ্ধাদের জন্য সহজ। কিন্তু সাধারণ দর্শকের কাছেও তার শিল্প দুর্বোধ্য ছিলো না। এখানেই তার শিল্পী জীবনের সার্থকতা।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান শিল্পী হামিদুজ্জামান খান বলেন, “উনি ছিলেন আমার সরাসরি শিক্ষক। আমাদের সময়ে এস এম সুলতান, জয়নুল আবেদীনের পর তাকেই আমরা আধুনিক হিসেবে জানতাম।”

তিনি বলেন, “শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন বিশেষভাবে কিবরিয়া স্যারের প্রশংসা করতেন। বাংলাদেশে মডার্ন আর্ট বা বিমূর্ত চিত্রকলার পথিকৃৎ ছিলেন উনি। এটা শুধু আমাদের কথা নয়, কিবরিয়া স্যার সম্পর্কে এটা জয়নুল আবেদীনের মন্তব্য।”

১৯২৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় জন্মগ্রহনকারী কিবরিয়া ‘৪৭ এর দেশভাগের পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের হাত ধরে ঢাকায় আসেন বলে জানান শিল্পী মনিরুজ্জামান। এর আগে কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে তিনি ডিপ্লোমা করেন। প্রথম কিছুদিন ঢাকায় নবাবপুর স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরে ঢাকা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন সেখানে।

ঢাকা নিউমার্কেটের পেছনে বর্তমান শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসে শিল্পী কিবরিয়ার সঙ্গে সাত বছর একসঙ্গে থেকেছেন চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার সাথে উনার সম্পর্ক ছিলো কখনো ছাত্র-শিক্ষকের, কখনো বন্ধু, কখনো বড়ভাই আবার কখনো বা পিতার মতো। আমি আজ আমার পিতাকে হারিয়েছি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের এমিরেটাস অধ্যাপক মোহাম্মদ কিবরিয়ার মরদেহ শহীদ মিনার থেকে বেলা ১২টার দিকে চারুকলা অনুষদের সামনে আনা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জুমা নামাজে জানাজা শেষে তাকে মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

একুশে এবং স্বাধীনতা পদকসহ দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। চন্দ্রালোকে ঘোড়া, ডুবসাঁতার, শশ্মানের পথে প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ৩১ মে ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি হন এই শিল্পী। ৭ জুন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

আগামী ১৫ জুন বিকাল ৫টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া স্মরণে নাগরিক শোকসভার আয়োজন করা হবে বলে জানান সমরজিৎ রায় চৌধুরী।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএমআর/কেএমএস/১৬৫১ ঘ.