ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, জুন ৩০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের সময়ে সংবিধানে যুক্ত হওয়া বিছমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখেই পঞ্চদশ সংশোধনী অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্যান্য ধর্মের সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার বিধান।

অবশ্য বিছমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখার বিষয়ে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির দুই সদস্য আপত্তি জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে সংশোধনী প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়ে সর্বোচ্চ আদালতও বলেছিল, সংবিধানকে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে পরিবর্তনের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে।

সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতার পর সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া চলাকালে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদে অনুপস্থিত ছিল।

সংশোধিত সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হলেও অন্যান্য ধর্ম পেয়েছে সমমর্যাদা ও অধিকার। ২ক) অনুচ্ছেদে এ সম্পর্কিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে।’

বাম দল ও সুশীল সমাজের একটি অংশের দাবি থাকলেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি সংশোধিত সংবিধানে। অবশ্য সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি নষ্ট করার উদ্দেশ্য বা জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে কোনো সংগঠন করা যাবে না বলে এতে উল্লেখ করা রয়েছে।

অনুচ্ছেদ ৩৮ এ বলা হয়েছে, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে গঠিত কোনো সংগঠনও কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না।

পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রতিক্রিয়ায় দেশের প্রথম সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেন, “কিছু কিছু বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, যা স্ব-বিরোধী। যেমন বাহাত্তরের সংবিধানে উল্লেখ ছিলো- ধর্মকে রাজনীতিতে আনা যাবে না। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে না। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর যা বাতিল হয়ে গিয়েছিলো। এখন সেই বিষয়গুলো চলে এসেছে। যা স্ব-বিরোধী।”

১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান এক সামরিক আদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধান সংশোধন করে প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ যোগ করেন। এরপর ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সংসদ ওই প্রস্তাবনাটি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, যা পঞ্চম সংশোধনী হিসাবে পরিচিত। এর ফলে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিবর্তন হয়।

এরপর এইচএম এরশাদের সময়ে ১৯৮৮ সালের ৯ জুন সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।

আওয়ামী লীগ এ দুটি সংশোধনীর বিরোধিতা করে আসছিল। ২০১০ সালের ২৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। একইসঙ্গে সংবিধানকে পঞ্চম সংশোধনীর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধনে গত বছরের ২১ জুলাই সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটিকে দেওয়া মতামতে রাষ্ট্রধর্ম রাখার বিরোধিতা করে আইনজীবী, সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্টজন ও সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ বলেন, সংশোধিত সংবিধানেও বিষয়টি রাখা হলে তা হবে বাহাত্তরের সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ।

বিভিন্ন মহলের সঙ্গে দীর্ঘ মতবিনিময়ের পর গত ৮ জুন কমিটি সংসদে প্রতিবেদন আকারে সুপারিশ উপস্থাপন করে। বিছমিল্লাহ রাখা, রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিশেষ কমিটির সদস্য রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর নোট অব ডিসেন্টও যুক্ত করা হয় ওই প্রতিবেদেনে।

অবশ্য প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ইসলামী দলগুলো বলে আসছিল, বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়া হলে তারা তা মেনে নেবে না।

২০ জুন মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিল আকারে উপস্থাপন ও পর্যালোচনা শেষে আইনটি পাস করার জন্য বৃহস্পতিবার সংসদে তোলা হয়।

অবশ্য পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সংযুক্ত বিবৃতিতে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্বীকার করেছেন যে, ‘সময়ের প্রয়োজনে আপামর জনগণের বৃহৎ কল্যাণার্থে’ সংবিধানে বিছমিল্ল¬াহ, রাষ্ট্রধর্ম এবং অনুচ্ছেদ ৩৮ সহ (ধর্মভিত্তিক রাজনীতি) অনেক বিষয়ে ‘ক¤েপ্রামাইজ’ করতে হয়েছে।

রাষ্ট্রধর্মসহ বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ধারা রেখে সংবিধান সংশোধনীর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ক্ষমতাসীন মহাজোটের সাতটিসহ দশটি দল একই দিনে সকালে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করে। তবে শাহবাগ মোড়েই তাদের আটকে দেয় পুলিশ।

সব সংশোধনী প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার পর বিকেলে বিভক্তি ভোটে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধন বিল পাস করে সংসদ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএইচসি/এসইউএম/এএল/জেকে/১৭২০ ঘ.